সাতক্ষীরার সব সম্পদ বেচে ঢাকায় স্থায়ী হন ‘রিজেন্ট’ সাহেদ

Send
আসাদুজ্জামান সরদার, সাতক্ষীরা
প্রকাশিত : ২৩:২৫, জুলাই ০৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৯, জুলাই ০৯, ২০২০

রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো.সাহেদ (ছবি রিজেন্ট গ্রুপের ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত)

রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদের পুরো নাম মো. সাহেদ করিম। করোনা মহামারির সময়ে তার প্রতিষ্ঠিত রিজেন্ট হাসপাতালে যথাযথ মেশিন না বসিয়েই আক্রান্তদের ইচ্ছেমতো সনদ দেওয়ার অভিযোগে দেশ এখন গরম। বিষয়টি হাতেনাতে ধরে র‌্যাব এই হাসপাতালের দুটি শাখাই সিলগালা করেছে। আর এরই ফাঁকে উঠে আসছে সাহেদের প্রতারণা নিয়ে নানা তথ্য। তবে সাতক্ষীরায় তার কোনও প্রতারণার ঘটনা এখনও জানা যায়নি। তার জন্ম সাতক্ষীরায় হলেও এ জেলার খুব কম মানুষই তাকে চেনেন। অবশ্য সাহেদের দাদা ও বাবা-মা ছিলেন এলাকার পরিচিত মুখ। দাদা এসেছেন ভারত থেকে দেশ বিভাগের সময়ে। সাতক্ষীরায় একটা সুপার মার্কেট করেন। মা ছিলেন রাজনীতির পরিচিত মুখ, মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

তবে ১৯৯৯ সালে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর ঢাকায় গিয়ে এলাকায় আর ফিরে আসেননি সাহেদ। পরে ২০১৪-১৫ সালে সাতক্ষীরায় এসে পৈতৃক সব সম্পদ বিক্রি করে ঢাকায় চলে যান। ভারত থেকে আসা বলে এলাকায় নিকট আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই তার। 

সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ডা. আফতাবুজ্জামান তাকে চিনতে পারেন। বলেন, সাহেদের পূর্বপুরুষরা ভারত থেকে জায়গা বিনিময় করে এ দেশে এসেছিল। বর্তমানে তাদের কোনও সম্পত্তি সাতক্ষীরায় নেই।

তিনি আরও বলেন, সাহেদ করিম সাতক্ষীরা শহরের কামালনগরের বাসিন্দা। তার বাবা সিরাজুল করিমের একমাত্র ছেলে। ১৯৯৯ সালে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চবিদ্যালয় থেকে থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর থেকে ঢাকায় চলে যান। তারপরে সাতক্ষীরায় তেমন বেশি যাতায়াত ছিল না। মাঝে মাঝে এসে দু’-একদিন থেকেই চলে যেতেন।

তবে তার বাবা সিরাজুল করিম ও মা শাফিয়া করিম এলাকার সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। সাতক্ষীরাতেই কোটি টাকা সম্পদের মালিক ছিলেন তারা। করিম সুপার মার্কেট নামে তাদের একটা মার্কেট ছিল শহরেই। ২০০৮ সালের দিকে এই সুপার মার্কেট, বাড়িসহ সমুদয় সম্পদ বিক্রি করে দিয়ে স্থায়ীভাবে চলে যান তারা।

তার মা শাফিয়া করিম ছিলেন স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষক এবং আওয়ামী লীগের নেতা। মূলত মায়ের সেই পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে ঢাকার রাজনীতি ও পরিচিত মহলে জায়গা তৈরি করেন সাহেদ। কারণ, স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সাহেদকে কেউ কখনও অংশ নিতে দেখেনি। 

সাহেদের প্রয়াত মা শাফিয়া করিমকে মনে করতে পারেন সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যক্ষ আনিসুর রহিম। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, সাহেদের মা প্রয়াত শাফিয়া করিম আসমানী স্কুলে আমার অধীনে শিক্ষকতা করতেন। শাফিয়া করিম ছিলেন সাতক্ষীরা জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। রাজনীতিতে তাকে সবাই ভালো মানুষ হিসেবেই চিনতো। এলাকাতেও ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিতি আছে তার। 

রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ। (ছবি: বাংলার চোখ এর সৌজন্যে)

সাহেদ তার ছাত্র ছিল জানিয়ে অধ্যক্ষ আনিসুর রহিম বলেন, ‘ওর (সাহেদ) বাবার নাম সিরাজুল করিম। সে আমার স্কুলে কিছু দিন লেখাপড়া করেছিল। তখন ছোট মানুষ ছিল। তবে বেশ চটপটে ছিল।’

অধ্যক্ষ আরও বলেন, ভারত থেকে দেশ বিভাগের সময় সাতক্ষীরা এসে করিম বংশ প্রতিষ্ঠা করেন সাহেদের দাদা আবদুল করিম। ‘৭২ থেকে ‘৭৪ সাল পর্যন্ত যশোর জেলার তথ্য অফিসার ছিলেন তিনি। লেখাপড়া জানা উচ্চ বংশ ছিল তাদের। একসময় তাদের করিম সুপার মার্কেট নামে একটি মার্কেটও ছিল এই শহরে। যদিও পরে বিক্রি করে ঢাকায় চলে যান। সাতক্ষীরায় তাদের কোনও আত্মীয়-স্বজন নেই এবং কোনও সম্পত্তি নেই। যা ছিল সব বিক্রি করে চলে গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাহেদের এক বাল্যবন্ধু বলেন, সাহেদ এসএসসি পাস করে ঢাকায় লেখাপড়া করতে গেলেও কোন পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে সেটা আমরা আর জানি না। এসএসসিতে আমি এবং সাহেদ ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছিলাম। তার আসল নাম মো. সাহেদ করিম। তবে ঢাকায় দাদা-বাবার নামের পদবি ‘করিম’ ফেলে দেয়, মো. সাহেদ হিসেবে পরিচিতি পায়। কেন করেছে তার কারণ জানি না। মাঝেমধ্যে আমার কাছে ফোন করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উইংয়ে আছি বলে পরিচয় দিতো, বলতো কোনও সমস্যা হলে যেন তার সঙ্গে যোগাযোগ করি। কিন্তু বিষয়টি আমার বিশ্বাস হতো না। ছোটবেলা ভালো ছিল। তবে কথা বলায় খুব পটু ছিল। খুব অল্প সময়ে মানুষকে আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা আছে তার। এসএসসি পরীক্ষার ১৫ বছর পরে ২০১৪ সালে আবারও তার সঙ্গে দেখা হয়। তখন এত আলোচিত ছিল না। তবে কয়েক বছর আগে থেকে বিভিন্ন বাজে কর্মকাণ্ডের কারণে ‘চিটার সাহেদ’ বা ‘বাটপার সাহেদ’ নামে বন্ধুমহলে পরিচিতি লাভ করে। এখান থেকে বছর তিনেক আগে হেলিকপ্টারযোগে সাতক্ষীরার নলতায় এসেছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ব্যক্তি বলেন, ওয়েবসাইটে দেখেছি তার রিজেন্ট কোম্পানিটি ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু, সে এসএসসি পাস করেছে ১৯৯৯ সালে। ১৯৮১ সালে তার জন্মই হয়নি। তার বাপ দাদা এমন নামে কোম্পানি খুলেছে সে কথাও শুনিনি। ফলে এত পুরনো একটা কোম্পানির মালিক সাহেদ কী করে হলো সেই প্রশ্নটার উত্তর সাতক্ষীরার কেউ জানেন না। 

সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সাহেদের মা প্রয়াত শাফিয়া করিম ছিলেন সাতক্ষীরা জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ২০১০ সালে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করে গেছেন। তিনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম করতেন। তিনি থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য রক্ত সংগ্রহ করে দান করতেন। সাহেদ এসএসসি পাস করে ঢাকায় চলে গিয়েছিল। তারপর আর কিছু জানি না। এখানে খুব বেশি মানুষের সাথে তার যোগাযোগ ছিল না। পত্রিকায় রিজেন্ট হাসপাতালের ঘটনার পর সাহেদ সম্পর্কে জানলাম।

সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান বলেন, তার (সাহেদ) বিরুদ্ধে আমার থানায় কোনও অভিযোগ নেই। তার জন্মস্থান সাতক্ষীরা শহরের কামালনগর এলাকা হলেও সাতক্ষীরায় তাদের এখন কোনও আত্মীয়-স্বজন নেই এবং কোনও সম্পত্তি নেই। তবে সাহেদের ব্যাপারে সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সার্বক্ষণিক তৎপর আছে।

উল্লেখ্য, গত সোমবার র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়। পরীক্ষা ছাড়াই করোনার সনদ দিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা ও অর্থ হাতিয়ে নিয়ে আসছিল তারা। র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত অন্তত ছয় হাজার ভুয়া করোনা পরীক্ষার সনদ পাওয়ার প্রমাণ পায়। একদিন পর গত মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্দেশে র‌্যাব রিজেন্ট হাসপাতাল ও তার মূল কার্যালয় সিলগালা করে দেয়। রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় নিয়মিত মামলা করা হয়েছে।

/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ