তিস্তা ভেঙেছে ৩০ বছরের রেকর্ড, চরম দুর্ভোগে ৪০ হাজার পানিবন্দি পরিবার

Send
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২৩:১৫, জুলাই ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:৫৯, জুলাই ১৪, ২০২০

 

তিস্তার পানি বেড়ে আদিতমারী উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিততিস্তা নদীর পানি লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে ৩০ বছরের রেকর্ড ভেঙে বিপৎসীমার ৫৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। রবিবার রাতে নদীতে এমন ভয়াবহ পানিবৃদ্ধির ঘটনায় ১৯৯০ সালের পর আবাও বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়েছে নদীবর্তী লালমনিহাট ও নীলফামারী জেলাবাসী। এরমধ্যে পানিবন্দি হয়ে দুঃসহ অবস্থায় পড়েছে ৪০ হাজার পরিবার। যদিও আজ সোমবার (১৩ জুলাই) বিকাল ৬টায় এ রিপোর্ট লেখার সময় পানির এ প্রবাহ নেমে বিপৎসীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে রাতে আবারও পানি বাড়ার আশঙ্কা করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা।

রবিবার (১২ জুলাই) রাত ১২টায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৫৩ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এর আগে রাত ১০টায় একই পয়েন্টে তিস্তার নদীর পানি বিপৎসীমার ৫৩ দশমিক ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এটি ছিল ২০১৯ সালের তুলনায় একই পয়েন্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিপৎসীমা অতিক্রমের রেকর্ড। ২০১৯ সালের ১৩ জুলাই এই তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ৫৩ দশমিক ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। এদিকে বন্যার পানিতে ডুবে হাতীবান্ধা উপজেলায় গড্ডিমারী ইউনিয়নের  আরিফা আক্তার নামে ৮ মাসের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

 জেলায় তীব্র বন্যায় প্রায় ৪০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তবে সরকারি হিসেবে এর পরিমান ২১ হাজার।

আদিতমারী এলাকায় পানিবন্দি হওয়ায় মালামাল সরাচ্ছেন এক ব্যক্তি।

এদিকে তিস্তায় পানি বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করায় পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ রবিবার রাতে বিশেষ সতর্কতা জারি করে। লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতেও মাইকিং করা হয়েছে। এদিকে হাতীবান্ধা-বড়খাতা বাইপাস সড়কে পানির চাপ ঠেকাতে এলাকার লোকজন বালির বস্তা ফেলে রক্ষা করার চেষ্টা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, আদিতমারীতে একটি বালুর বাঁধের ভাঙন ঠেকাতে জিও ব্যাগ ফেলা অব্যাহত আছে।

লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আব্দুল কাদের সাংবাদিকদের জানান, হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুর ১২টায় তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও বিকাল ৬টায় এ রিপোর্ট লেখার সময় বিপৎসীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

জেলার সবকটি নদ-নদীর পানি পানিবৃদ্ধি পেয়ে তীব্র বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। তিস্তার পর ধরলার পানিও অস্বাভাবিক হারে বাড়তে শুরু করেছে। সদর উপজেলার মোগলহাটের শিমুলবাড়ি পয়েন্টে সোমবার দুপুরে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ৬৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ধরলার এমন অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধিতে সদর উপজেলার মোগলহাট, বড়বাড়ী, কুলাঘাট ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল নতুন করে প্লাবিত  হয়েছে।

পারুলিয়া এলাকায় নদীর পানিতে ঘরবাড়ি হারানো একটি পরিবার নৌকায় করে তাদের মালপত্র তুলে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছে।

এদিকে ভারতের গজলডোবা ব্যারেজ থেকে ছেড়ে দেওয়া পানি নিয়ন্ত্রণ করতে জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার দোয়ানীতে অবস্থিত দেশের সর্ব বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি গেট খুলে দেওয়ায় লালমনিরহাটের আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা, পাটগ্রাম ও সদর উপজেলার ২৫টি ইউনিয়নের প্রায় ৪০ হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। বানভাসি এসব মানুষের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে।

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অবিরাম বৃষ্টিতে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের ৭টি ওয়ার্ডের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। শুধু এই ইউনিয়নেই ১০ হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বলে মহিষখোচা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক হোসেন জানিয়েছেন। এসব পানিবন্দি পরিবারগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সরকারিভাবে উপজেলার দুটি ইউনিয়নের পানিবন্দি পরিবারগুলোর জন্য ৩৫ মেট্রিক টন জিআর চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। 

আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মুহাম্মদ মনসুর উদ্দিন বলেন, পানিবন্দি পরিবারগুলোর সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। পানিবন্দি পরিবারগুলোর জন্য সরকারিভাবে ৩৫ মে. টন জিআর চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।  

তিস্তা ব্যারাজ ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান, ব্যারাজের উজান ও ভাটিতে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছে।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফর জানান, পানিবন্দি এলাকার মানুষের জন্য ২৪৩ মেট্রিক টন জিআর চাল ও নগদ সতেরো লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেগুলো বিতরণের কাজ অব্যাহত আছে বলে জানান তিনি।

 

/টিএন/

লাইভ

টপ