লামায় প্রায় উজাড় ডেসটিনির বাগান, জামতলীতে পাহারা দিচ্ছে পুলিশ

Send
মো. নজরুল ইসলাম (টিটু), বান্দরবান ও জসিম উদ্দিন মজুমদার, খাগড়াছড়ি
প্রকাশিত : ১৯:২৮, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:০১, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২০

উজাড় হওয়া বান্দরবানের লামার বাগান।

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতিতে ভাগ্যবদলের স্বপ্ন দেখিয়ে সারাদেশ ও প্রবাসে লাখ লাখ বাংলাদেশি গ্রাহকের কাছে গাছ বিক্রি করেছিল ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড। এই বিতর্কিত সংস্থাটির ‘ডেসটিনি ট্রি প্লানটেশন প্রকল্পে’ পাঁচ কোটির বেশি গাছ লাগানোর কথা থাকলেও লাগানো হয়েছিল মাত্র ৪০-৫০ হাজার গাছ। সারাদেশে এর প্রকল্প করার কথা থাকলেও বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালীতে প্রকল্পের নামে সরকারের কাছে লিজ নেওয়া ১২৫ একর এলাকাজুড়ে ও খাগড়াছড়ির জামতলী এলাকায়  ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড এর চেয়ারম্যানের সংস্থা ও নিজের নামে কেনা প্রায় ৭০ একর জায়গার ওপরে মোটে দুটো বাগান রয়েছে ডেসটিনির। তবে নজরদারি না থাকায় এরইমধ্যে বান্দরবানের প্রকল্প হিসেবে ঘোষিত বাগানটি উজাড় হতে হতে নিঃশেষ প্রায়। আর খাগড়াছড়ির বাগানটি এখনও পুলিশ প্রহরায় থাকলেও এগুলো এমএলএম প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সম্পত্তি–আইনের খাতায় এমন ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এখান থেকেও কেটে নেওয়া হয়েছে অসংখ্য গাছ। ফলে বিপুল বিনিয়োগ করলেও মামলার রায় যাই হোক না কেন ডেসটিনি ট্রি প্লানটেশন প্রকল্পের গ্রাহকদের কিছুই ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।  

ডেসটিনির ফেসবুক পেজে রফিকুল আমীন ও মোহাম্মদ হোসেনকে এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে এখনও উল্লেখ করা রয়েছে।

ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশন প্রকল্প আকৃষ্ট করেছিল সব পর্যায়ের ক্রেতাকে

একটি চারাগাছের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ হিসেবে সামান্য মূল্য দিয়ে কয়েক বছর পর লাখ টাকা দামের গাছ পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ‘ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশন প্রকল্পে’ স্বপ্নবাজ সাধারণ মানুষদের আকৃষ্ট করেছিল ডেসিটিনি গ্রুপ। ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড নামের এই এমএলএম কোম্পানির বিশেষ প্রকল্প ছিল এটি। মাল্টি লেভেল মার্কেটিং পদ্ধতিতে তাদের এই স্বপ্ন দেখানোর কৌশলটি পৌঁছে গিয়েছিল প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বাংলাদেশিদের কাছে। ডেসটিনি গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর রফিকুল আমীন কানাডার দ্বৈত নাগরিক হওয়ার সুযোগ নিয়ে যুক্তরাজ্যে রেজিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে ‘ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশন লিমিটেড’ নামে এই প্রকল্পটি নিবন্ধ করিয়েছিলেন। ফলে প্রবাসী ও বিদেশিদের কাছেও এই প্রকল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তখন প্রশ্ন ছিল না। আবার প্রকল্পের মূল বাগানটি বান্দরবানের একেবারে শেষ প্রান্তে হওয়ায় বেশিরভাগ গ্রাহকের পক্ষে ওই এলাকায় যাওয়া সম্ভবও হয়নি। তথ্যপ্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতা থাকায় তাৎক্ষণিক সব তথ্য জানা না গেলেও পরবর্তীতে সব কিছুই গণমাধ্যমে উঠে আসে। এরপর দুর্নীতি দমন কমিশন নড়েচড়ে বসে। তুমুল আলোচিত  এই দুর্নীতির মামলাটি এখনও আদালতে বিচারাধীন।  

ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন ও ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীন 

যেভাবে মামলা:

ডেসটিনির বাগানে লাগানোর কথা ছিল এক কোটির বেশি গাছ। লাগানো হয়েছিল মোটে ৪০-৫০ হাজার। গাছ লাগানোর কথা বলে গ্রাহকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মাতের ঘটনায়  ২০১২ সালের ৩১ জুলাই রাজধানীর কলাবাগান থানায় মাল্টি লেভেল মার্কিটিং (এমএলএম) কোম্পানি ডেসটিনি গ্রুপের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে দুদক।  মামলায় তদন্ত শেষে ২০১৪ সালের ৫ মে দুদক আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এর মধ্যে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির মামলায় ১৯ জন এবং  ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশন লিমিটেডে দুর্নীতির মামলায় ৪৬ জনকে আসামি করা হয়।

এক সময় এমন বিজ্ঞাপন ছাপানো হতো পত্রিকায়।

২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট দুটি মামলায় ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে আসামিদের বিচার শুরু করেন। তবে এ অভিযোগ গঠন হওয়ার আগেই ট্রি প্লান্টেশনের অর্থ আত্মসাৎ মামলায় পাসপোর্ট জমা দেওয়ার শর্তে হাইকোর্ট থেকে জামিন পান রফিকুল আমীন ও মোহাম্মদ হোসেন।  পরে হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে দুদক। হাইকোর্টের ওই অন্তর্বর্তীকালীন জামিন আদেশে বলা হয়েছিল, ‘ যে ৩৫ লাখ গাছ লাগিয়েছেন সেগুলো কেটে বিক্রি করে এক সপ্তাহের মধ্যে টাকা নিয়ে আসুন ।’ আদালতের এই সিদ্ধান্তের ভেতরে ছিল দুর্নীতি পরায়ণদের প্রতি কঠিন পরিহাস। বাস্তবে মাত্র ৪০-৫০ হাজার গাছ লাগালেও আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে এক কোটির বদলে ৩৫ লাখ গাছ লাগানোর দাবি করেছিল। এভাবে  আদালতে গাছ লাগানোর একটা গাণিতিক সংখ্যা দিয়ে পার পেতে চেয়েছিলেন রফিকুল আমীন, কিন্তু নিজের বিছানো জালে ধরা পড়েন নিজেই।

সে সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী ও আদালত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাস্তবে অত গাছ বাগানে ছিলও না, তাই বিচারকের নির্দেশগাছ বিক্রির টাকায় রফিকুল আমীনদের জামিনও হয়নি। তারা এখনও বিচারাধীন মামলার আসামি হিসেবে কারাগারে বন্দি রয়েছেন।

ডেসটিনির লামার বাগানে গেলে পাওয়া যায় এমন করে কাটা গাছের গুঁড়ি। অনেক জায়গায় গর্ত দেখে বোঝা যায় গুঁড়িও তুলে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা।

যেভাবে গাছকাটার শুরু:

তবে সে সময়ে জামিন না হলেও বাগানের ওপর শোধ ঠিকই নিয়েছেন ডেসটিনি গ্রুপের  রফিকুল আমীন। আদালতের আদেশের সুযোগ নিয়ে তার মামলার খরচ পরিচালনা ও বাগান কর্মীদের বকেয়া পড়া বেতন পরিশোধের জন্য বাগানের রাবার গাছগুলো কাটার নির্দেশ দেন তিনি। ১২৫ একরের ডেসটিনি ট্রি প্লানটেশন প্রকল্পে প্রকাশ্যে গাছকাটা এভাবেই শুরু। এরপর কখনও ডেসটিনির পক্ষের নির্দেশে, আবার  কখনও বাগানকর্মীদের ম্যানেজ করে চোরাকারবারিদের কোপে উজাড় হতে হতে নিতান্তই সামান্যের পযায়ে এসে ঠেকেছে ডেসটিনির সেই বাগান। অথচ কোটি গ্রাহকের কাছে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে বিক্রি করা হয়েছিল এ বাগানের প্রতিটি গাছ। বর্তমানে এ বাগানে চার-পাঁচ হাজার গাছ আছে কিনা তাতেও সন্দেহ পোষণ করেছেন বর্তমানে ‘দায়িত্ব পালন না করা’ বাগানরক্ষকরাই।

ডেসটিনির বাগানের ভেতরের চিত্র এখন এমন। গাছ কেটে নেওয়া বাগানে এখন আছে শুধুই অপুষ্ট কিছু গাছ।

সরেজমিন বাগান দর্শন

স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় ১৫ বছর আগে বান্দরবানের লামার ফাঁসিয়াখালীতে সরকারের রাবার বাগান প্রকল্প এলাকা থেকে বিশেষ কৌশলে ১২৫ একর জায়গা বাগান করার জন্য দীর্ঘসময়ের জন্য লিজ নেয় ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশন প্রকল্প। এই বিশাল জায়গাজুড়ে রাবার, সেগুন, বেলজিয়াম, নারকেল ও কাঁঠালসহ নানা প্রজাতির পুরাতন ও নতুন গাছ ছিল। গাছের সংখ্যাও আনুমানিক ৪০-৫০ হাজার ছিল তখন। যেহেতু বিশাল ফাঁকা জায়গা ছিল তাই  এটা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও ছিল। তবে বাগানের কথা বলে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলেও  সাজানো বাগান করার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষর তেমন মনোযোগ ছিল না। লোকবল থাকলেও অসংখ্য গাছ ছিল আঁকা বাঁকা, একটা আরেকটার সঙ্গে লাগায়ো। তবে সেই বাগানও এখন প্রায় পুরোটাই উজাড় হয়ে গেছে। 

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানি ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড এর লোগো।

সরেজমিন বাগান পরিদর্শন করে দেখা গেছে, আলোচিত এই বাগান এখন প্রায় উজাড়। অসংখ্য গাছের গুঁড়ি পড়ে আছে, গাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে আগেই। অনেক স্থানের গর্ত দেখে বোঝা যায় গুঁড়িও তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাগানে এখন যারা নাম মাত্র দায়িত্বে আছেন তাদের দাবি, এখন এ বাগানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ৪ থেকে পাঁচ হাজার গাছও নেই। এখন বাগানে যেসব গাছের দেখা মেলে তার সিংহভাগই অপুষ্ট এবং ছোট ছোট। এসব গাছের বেশিরভাগই গত ৪/৫ বছরের মধ্যে লাগানো। পুরনো গাছগুলো সব কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

কেটে  ফেলা কয়েকটি গাছের গুঁড়ি। দেখে বোঝা যায় এসব গাছ কাঠের উপযোগীও হয়নি। তার আগেই পড়েছে গাছখেকো দুর্বৃত্তদের কোপ। 

কারা গাছ কাটছে?

ডেসটিনির চেয়ারম্যান ও পরিচালকরা বর্তমানে কারাগারে এবং গ্রুপটির ব্যবসায়িক কাজ আদালতের নির্দেশে বন্ধ । ফলে এই বাগান প্রকল্পটি এখন ডেসটিনি গ্রুপ সংশ্লিষ্ট কারও মনোযোগে নেই। বাগান দেখভালের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে বাগানের সুপারভাইজার ও কর্মচারীরা। তবে ২০১২ সাল থেকেই তাদের বেতন বন্ধ। এ কারণে কর্মীদের মধ্যে ছিল তীব্র অসন্তোষে। ২০১৬ সালে ‘৩৫ লাখ গাছ কেটে আদালতে টাকা জমা দেওয়ার সেই নির্দেশের’ পর বাস্তবে সেটা সম্ভব করতে না পারলেও মামলার খরচ পরিচালনা এবং বাগানের কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করার জন্য রফিকুল আমীন যে নির্দেশনা পাঠিয়েছিলেন তাতে এক ধাক্কায় উজাড় হয়ে যায় বাগানের রাবার গাছগুলো। এর অনেকগুলোই প্রাকৃতিভাবে সৃজিত ও ডেসটিনির জায়গা লিজ নেওয়ার আগে থেকেই ছিল।

ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশন প্রকল্পের লোগো

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাগান সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি সূত্র জানান, রফিকুল আমীনের নির্দেশনার পর গাছরক্ষার পাশাপাশি ‘প্রয়োজনে’ গাছ কাটার নতুন বাস্তবতা তৈরি হয় বাগানরক্ষক ও কর্মীদের মধ্যে। ডেসটিনি সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তা, প্রতারক ও প্রভাবশালীদের কখনও চাপে, কখনও লোভে, কখনও সত্যি সত্যিই হামলাকারীদের দ্বারা সর্বস্বান্ত হতে থাকে ডেসটিনির বাগান।  ২০১৬ সালের সেই গাছ কেটে বিক্রি করার ধারাবাহিকতা এখনও সেখানে বিদ্যমান।  লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় এখানে প্রশাসন, গাছ প্রকল্পের গ্রাহক থেকে শুরু করে দায়িত্বশীল কারও মনোযোগ নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিভিন্ন সূত্রের খবর, বাগান পাহারাদারদের বেতনভাতা পরিশোধ না হওয়ায় বাগানের দেখাশোনার  দায়িত্ব অনেকে ছেড়ে দিলেও বেঁচে থাকার জন্যও কারও কারও অবলম্বন হয়ে যায় এ বাগানের গাছ।

২০১৯ সালে বাগানের অবস্থা যেমন ছিল। (একটি অনলাইনে প্রকাশিত সৌজন্য ছবি)

তবে পাহারাদাররা অবশ্য এ তথ্য মানতে রাজি নন। তাদের দাবি তারা তো এখন আর এই দায়িত্বেই নেই। যে দুয়েকজন এখনও আছেন তাদের দায়সারা চৌকিদারির ফাঁক ফোকড়ের সুযোগে এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের জবরদখল, চুরি ইত্যাদি কারণে  এই বাগান থেকে বছরের পর বছর ধরে উজাড় হচ্ছে সব ধরনের গাছ। এমনকি এই করোনাকালেও সুযোগ বুঝে প্রচুর গাছ কেটে নিয়ে গেছে গাছচোর সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটগুলোর একটির নাম ‘চকরিয়া সিন্ডিকেট’। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা লামার ফাঁসিয়াখালীর নিকটবর্তী হওয়ায় ওই এলাকা থেকে এসে রাতের আঁধারে এই বাগানের গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটটি এমন দাবি করেছেন বাগানটির পাহারাদাররা।

দু’বছর আগে এক শীতের সকালে তোলা ডেসটিনির বাগানের ছবি। (সংগৃহীত)

বাগানের গাছ কাটা নিয়ে মামলা

তবে এ বাগানের গাছ চুরির কারণে বেশ কয়েকটি মামলাও হয়েছে। ২০১৮ সালের ৯ ডিসেম্বর গাছ চুরির কারণে একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বাদী হয়ে লামা সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা করেন বাগানের প্রহরী খোদা বকস খান। এ মামলায় ৮/১০ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত ৭০/৮০ জনকে আসামি করা হয়। আদালতের নির্দেশে এদের মধ্যে স্থানীয় মো. আজিজুল হক, মো. বাবুল, মো. রুহুল আমিন, মো. মঞ্জুর, মো. মনসুর, মো. পারভেজ, মো. মনসুর ও মো. নুরুসহ অনেককে আদালতে হাজির করা হয়। তবে মামলাটি এখনও ঝুলে আছে। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে লামা থানায় বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে গাছ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।

করোনার সময়ে গত জুলাইয়ে গিয়ে দেখা গেছে রাতে সাবাড় করার পর বাগানের নিচে পড়ে আছে কাটা গাছের ডাল।

বাগান নিয়ে মন্তব্য

একসময় ডেসটিনির এ বাগান দেখাশোনার কাজ করতেন আবুল কাশেম নামে এক ব্যক্তি। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি যখন দায়িত্বে ছিলাম তখন প্রতিদিনই দেখতাম অনিয়ম চলে। গাছ কেটে পাচার করা হয়। তবে এখন আমি দায়িত্বে নাই। তাই বর্তমানের পরিস্থিতি বলতে পারছি না। অবশ্য, এই আবুল কাশেমের বিরুদ্ধেও গাছ পাচার সিন্ডিকেটে  সেসময়ে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্য এক ব্যক্তি।

লামার স্থানীয় সাংবাদিক কামরুজ্জামান বলেন, ডেসটিনির গাছ যারা পাহারা দেয় তারা নিজেরাই লোভ সামলাতে না পেরে গাছ কেটে পাচার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। যারা দায়িত্বে আছেন এখন তাদের পাহারা দেওয়ার জন্য অন্য লোক নিয়োগ দিতে হবে। তিনি বলেন, প্রতিদিনই  কমবেশি গাছ পাচার হচ্ছে। এখন আগের মতো গাছ নেই বাগানে। বড় বড় গাছগুলো প্রায় উজাড় হয়ে গেছে।

এ ব্যাপারে ডেসটিনির দায়িত্বে থাকা স্টেশন ম্যানেজার কিরন বলেন, ২০১৭ সালের জুন মাসের পর থেকে আমাদের বেতন দিচ্ছে না কেউ। তাই কেউ আর দায়িত্ব পালন করছি না। তিনি বলেন, করোনার সুযোগেও অনেকে ডেসটিনির গাছ কেটে নিয়ে গেছে বলে জানতে পেরেছি। তবে সেখানে আমি যাইনি।

সহকারী পুলিশ সুপার (লামা সার্কেল) মো. রেজওয়ানুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি নতুন ভাবে কোনও মামলা করেনি কেউ। তবে আগে গাছ কাটার ব্যাপারে বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছিল। এরমধ্যে কিছু কিছু মামলাতে আসামিরা জামিনে আছে বলেও জানান তিনি।

অল্প স্বল্প গাছে ঘেরা ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেনের বাগান বাড়ি। এখানেও ঢুকলেই চোখে পড়ে পড়ে আছে কাটা গাছের গুঁড়ি।

টিকে আছে খাগড়াছড়ির বাগান

তবে খাগড়াছড়ির জামতলীতে ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেনের নামে যে বাগানটি করা হয়েছে সেটি এখনও মোটামুটিভাবে টিকে আছে। এ বাগানের জন্য  শুরুতে কোম্পানির নামে জায়গা কেনা হলেও পরে এসব জায়গা নিজের নামে কিনতে থাকেন তিনি। স্থানীয়দর দাবি, এখানে ৬০ থেকে ৭০ একর জায়গা রয়েছে। তবে গাছ লাগানো হয়েছে অল্প এলাকাজুড়ে। এছাড়াও ওই এলাকার জায়গা কেনার সময় বিপুল সংখ্যক গাছ সেখানে আগে থেকেই ছিল। ফলে জায়গার তুলনায় নতুন করে খুব বেশি গাছ লাগাননি তিনি। যদিও বাজারে গ্রাহকদের কাছ থেকে ‘ডেসটিনি ট্রি প্লানটেশন প্রকল্পে’র নামে গাছ বিক্রির যে প্রচারণা চালানো হচ্ছিল তখন তাতে খাগড়াছড়ির এ বাগানটিও দেখানো হতো।

খাগড়াছড়ির বাগানের জায়গা নিজের নামে কেনেন মোহাম্মদ হোসেন

দিঘীনালার জামতলী এলাকার ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ ইউছুফ, মধ্য আশ্রম এলাকার কৃষক আবুল হোসেন, শাহজালাল, রশিক নগর এলাকার গৃহিনী কহিনুর আক্তার, হাছিনা বেগমসহ বিভিন্ন শ্রেণির পেশাজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে জানা যায়, ১/১১ সরকারের সময় ডেসটিনি গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন খাগড়াছড়ি জেলায় তার ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রভাব সম্প্রসারণের চেষ্টা করেন।  কোম্পানির নামে এবং নিজের নামে প্রায় ৬০/৭০ একর সম্পত্তি ক্রয় করেন। সরকারের দ্বারা পুনর্বাসিত বাঙালি লোকজনের হাতে গড়ে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা দিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫ একর করে সম্পত্তি ক্রয় করেন। এভাবেই ওই ৬০ থেকে ৭০ একর সম্পত্তি কেনা হয় তার।

স্থানীয়রা জানান, জনগণের কাছ থেকে গাছ লাগানোর কথা বলে টাকা নিলেও এখানে যা কিছু আছে তার কিছুই ডেসটিনি গ্রুপের বলে স্বীকার করতেন না সংস্থাটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন। এই জায়গাটিকে তিনি ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলতেন এবং সে হিসেবে নিজের জন্য বাংলো বাড়ি হিসেবে বানিয়েছিলেন।

ডেসটিনির টাকায় সংস্থাটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেনের বানানো বাংলোবাড়ি। এটি এখন পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। তবে অভিযোগ আছে, গাছ চুরি হচ্ছে প্রায়ই।

এ বাগানে বাংলো বানান মোহাম্মদ হোসেন

এখানে থাকতো তার দ্বিতীয় স্ত্রী মণি আক্তার। এই স্ত্রীর গর্ভে তিন সন্তানও রয়েছে তার। তবে বাগান দেখাশোনার মূল দায়িত্ব দিয়েছিলেন তার স্ত্রী মণি আক্তারে বড় ভাই হাসান আলীকে। তিনি এখনও জামতলীতে এই বাগানেই থাকেন। ডেসটিনির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেনের নামে মালিকানা থাকায় আদালতের নির্দেশে তার সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির তালিকায় থাকা এই বাগানটি বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। 

এই বাগানে মোহাম্মদ হোসেন সেগুন, মেহগনি, গামারি, বেলজিয়াম, আকাশি, আম, লিচুগাছের বাগান করেছেন। মাছ চাষের জন্য কাটিয়েছেন  দুটি পুকুর। আদর্শ প্রমোদ উদ্যান বানাতে এখানে ২০০৮ সালে মৃত বাহাদুর আলীর ছেলে মোহাম্মদ শাহজাহান হতে ক্রয় করা ৩ একর জায়গা মধ্যে ১০ শতক জায়গার ওপর গড়ে তোলেন ৩ তলা বিশিষ্ট একটি বাংলো। এ বাড়িটি তৈরিতে সেসময়ে তিনি প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা খরচ করেন বলে জানান স্থানীয়রা। এ  বাড়ি তৈরির পর দ্বিতীয় স্ত্রী মণি আক্তারকে এখানে নিয়ে আসেন।  ডেসটিনি চেয়ারম্যানের এ বাগান দেখাশোনার কাজে নিয়োজিত থাকা মনি আক্তারের বড় ভাই হাসান আলী বর্তমানে জামতলীতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তিনি পেশায় সিএনজি চালক এবং স্থানীয় ভিলেজ ডিফেন্স পার্টি (ভিডিপি)তে চাকরি করেন। এ বাগানবাড়িতে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মোহাম্মদ হোসেন কারাগারে থাকলেও তার দ্বিতীয় স্ত্রী মণি আক্তার এখনও এ বাগানে নিয়মিত আসেন এবং এ বাগান বাড়ির  সব খবর রাখেন। যদিও পুলিশের হেফাজতে পুরো সম্পত্তি থাকায় এখান থেকে তিনি কিছু নিতে পারেননি বা বিক্রিও করতে পারেননি। তবে এ সম্পত্তিও পুলিশ প্রহরায় থাকার পরে উজাড় হচ্ছে এমন অভিযোগ রয়েছে।

খাগড়াছড়ির জামতলীতে এই বাগানবাড়ির জায়গা নিজের নামে করার চেষ্টা করেন এমএলএম কোম্পানি ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেন। তবে আয়ের উৎস দেখাতে না পারায় দুদকের মামলায় এখনও কারাগারে তিনি।

বাগানের কিছু জায়গা বেদখল হয়েছে

দিঘীনালার মেরূং ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুসলিম উদ্দিন জানান, দিঘীনালা উপজেলার জামতলী, মধ্য আশ্রম ও রশিকনগর এলাকায় ডেসটিনি গ্রুপ ৭০ একর সম্পত্তি ক্রয় করেছে। বেশিরভাগ সম্পত্তি আঞ্চলিক দলিল (বায়নানামা) মূলে ক্রয় করেছেন। কিছু রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়েছে। ডেসটিনি গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেনের বিরূদ্ধে মামলা হওয়ার পরে রশিক নগর এলাকার চাঁন মিয়া, নুরু মিয়া ও সিরাজ মিয়া তাদের বিক্রয় করা জায়গা পুনরায় দখল করে নিয়েছে। ক্রয়কৃত বেশিরভাগ জায়গায় সেগুন. মেহগনি, গামারিসহ বিভিন্ন ফলদ বাগান করেছিলেন মোহাম্মদ হোসেন। কিছু কিছু জায়গায় আগে থেকেই বিভিন্ন বনজ গাছপালা ছিল। সব জায়গা-বাগান-বাড়ি এখন পুলিশের হেফাজতে। বাড়িটি মাঝে মাঝে চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেনের সম্বন্ধী হাসান আলী সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখাশোনা করেন এবং দ্বিতীয় স্ত্রী ও সন্তানেরা মাঝে-মধ্যে আসেন এবং বাড়ি-ঘর, বাগান-বাগিছা দেখে যান।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ডেসটিনি গ্রুপের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড এখন যেভাবে পরিষ্কার আগে সেভাবে বোঝা যায়নি, কারণ, চেয়ারম্যান যখন তাদের এলাকায় আসতো গরিব, দুঃখী, অসহায় ছাত্রছাত্রী, অসুস্থ লোকজনকে তিনি অনেক দান-খয়রাত করেছেন। সবাই তখন তাকে ভালো মানুষ হিসেবেই ধরে নিয়েছিলেন এবং তিনি থাকলে এলাকার উন্নয়ন হবে বলেই ধরে নিয়েছিল।

জানতে চাইলে দিঘীনালা থানার অফিসার ইনচার্জ উত্তম কুমার দে বলেন, আদালতের নির্দেশে ডেসটিনি গ্রুপের দিঘীনালার রশিকনগর, জামতলী ও মধ্য আশ্রম এলাকার সকল সম্পত্তি পুলিশ দেখ-ভাল করছে। আদালত পরবর্তীতে যে নির্দেশনা দেবেন-সেভাবেই পুলিশ পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে। জায়গা বেদখলের বিষয়ে জানেন না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আদালতের রেকর্ড অনুযায়ী  যে সকল সম্পত্তির বিবরণ আছে–তাই পুলিশ রক্ষণাবেক্ষণ করছে।

 

/টিএন/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ