রংপুরে একশ’ বছরের মধ্যে ভয়াবহ বর্ষণ, ৬০ মহল্লার ঘরে ঘরে পানি

Send
লিয়াকত আলী বাদল, রংপুর
প্রকাশিত : ২১:৩৫, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৪২, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২০

রংপুর শহরে বৃষ্টিপাতে তৈরি হয়েছে শহরজুড়ে জলাবদ্ধতা। 
বিভাগীয় নগরী রংপুর ও আশপাশের এলাকায় স্মরণকালের ভয়াবহ বৃষ্টি হয়েছে। রবিবারের (২৭ সেপ্টেম্বর) এ বৃষ্টিতে নগরীর অন্তত ৬০টি মহল্লা হাঁটু থেকে কোমর পানি পর্যন্ত তলিয়ে গেছে। বাড়ি-ঘরে পানি প্রবেশ করায় অন্তত এক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ায় বাড়ি ঘর ছেড়ে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। নগরীর বেশিরভাগ রাস্তা-ঘাট তালিয়ে যাওয়ায় মানুষের যাতায়াত ও চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে নগরবাসীর দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, এমন একনাগাড়ে বৃষ্টি গত একশ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

রংপুর আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে,  শনিবার রাত ১০টা থেকে রবিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ১১ ঘণ্টায় ৪শ’৩৩  মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।  গত ৬০ বছরে এমন একটানা বৃষ্টিপাত দেখার কথা স্মরণ করতে পারেননি কোনও বয়োবৃদ্ধও।

সরেজমিন রংপুর নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নগরীর প্রধান সড়কসহ বেশির ভাগ সড়ক ৩/৪ ফুট পানিতে তলিয়ে গেছে। নগরীর বাবু খাঁ ও কামার পাড়া, জুম্মাপাড়া, কেরানিপাড়া , আলমনগর, হনুমান তলা, মুন্সিপাড়া, গনেশপুর, বাবুখাঁ, কামারপাড়া, বাস টার্মিনাল, নগরীর শালবন, মিস্ত্রিপাড়া, কামাল কাছনা, মাহিগঞ্জ, কলাবাড়ি, দর্শনা, মডার্ন মোড়, মুলাটোল, মেডিকেল পাকার মাথা, জলকর, নিউ জুম্মাপাড়া , খটখটিয়াসহ অন্তত ৫০টি মহল্লার প্রধান সড়কঘর তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার বাড়িঘরে ঢুকে গেছে পানি।  ফলে পানিবন্দি হাজার হাজার পরিবারের অনেকে বাড়ি-ঘর ছেড়ে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, নগরীর নিউ ইঞ্জিনিয়ার পাড়ার প্রতিটি বাড়িতে এখন কোমর পরিমাণ পানি। গভীর রাতে ঘরে ঘরে পানি প্রবেশ করায় বেশির ভাগ বাড়ির ঘরের মধ্যে থাকা মূল্যবান আসবাবপত্র টিভি ফ্রিজসহ অন্যান্য সামগ্রী পানির নীচে তলিয়ে গেছে। ওই এলাকার অধিবাসী সেলিম ও আসমা বেগম জানালেন রাত ৩টার দিকে ঘুম থেকে জেগে বাথরুমে যাওয়ার জন্য বিছানা থেকে নেমে দেখেন ঘরের ভেতরে পানি। এরপর পানি বাড়তে শুরু করে। সকাল ৭টার মধ্যে বাড়ির উঠানসহ ঘরের ভেতর কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে। বিছানাপত্র, খাট তলিয়ে যাওয়ায় মানবেতরভাবে দিন কাটাচ্ছেন তারা। সবচেয়ে সমস্যা হয়েছে শিশুদের নিয়ে। ঘরের ভেতরেই পানি ওঠায় সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখতে হচ্ছে তাদের।

রংপর শহরে জলাবদ্ধতা।

ওই এলাকার সালেক মিয়া জানালেন বাসার ভেতরে এক কোমর পানি, ঘরের মধ্যেও কোমর পর্যন্ত পানি। সব আসবাবপত্র তলিয়ে গেছে। এমন অবস্থায় মালামাল নিয়ে অন্যত্র যাওয়াও সম্ভব নয়। ফলে খাটের ওপর স্ত্রী আর দুই সন্তানকে নিয়ে চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটছে তাদের।

 এদিকে পাশের মুন্সিপাড়া মহল্লায় গিয়ে দেখা গেলো একই অবস্থা। এমন কোনও বাড়ি নেই যে বাড়িতে ৩/৪ ফুট পানি প্রবেশ করেনি। মুন্সিপাড়া অধিবাসী জোহরা বেগম ও সালমা দু বোন জানালেন, বাড়ির ভেতরে পানি প্রবেশ করায় আসবাবপত্রসহ বেশির ভাগ মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। রান্নাঘরের মধ্যে হাঁটু পানি থাকায় সেখানে থাকা গ্যাসের চুলা পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে না খেয়ে দিন কাটছে তাদের। জুম্মাপাড়া, কেরানীপাড়া এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন, আকলিমা বেগম, হকসহ অনেকে জানান, রাত থেকে অবিরাম বৃষ্টিতে তাদের বাড়ির ভেতরে পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন তারা।

এদিকে তীব্র বৃষ্টিতে রংপুর নগরীর সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে গেছে। প্রতিটি সড়ক ৩ থেকে ৪ ফুট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় ৫ লাখ নগরবাসী কার্যত বাড়ি থেকে বের হতে পারছেন না। তারা পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতরভাবে দিন কাটাচ্ছেন।

এদিকে নগরীর পাশ দিয়ে প্রবাহিত ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ শ্যামা সুন্দরী খাল তলিয়ে যাওয়ায় আশেপাশের হাজার হাজার বাড়ি ঘর হাঁটু থেকে কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে। এলাকাবাসী জানালেন ৮৮ সালের মহা বন্যার পর এমন অবস্থা তারা আর দেখেননি ।

রংপুর সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র মাহমুদুর রহমান টিটু জানান, রংপুর সিটি করপোরেশনের এলাকা ২ শ’বর্গ কিলোমিটার এলাকা ব্যাপী। বিশাল এই সিটি করপোরেশনের অন্তত ৫০ হাজার হতদরিদ্র মানুষ নগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছে। তিনি জানান, জরুরি ভিত্তিতে পানিবন্দি মানুষদের জন্য খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা প্রয়োজন বলে তিনি জানান।

রংপুরে এমন বৃষ্টি হয়েছে যে নিচু এলাকাগুলোর ঘরে হাঁটু পানি জমে গেছে। আরেকটু পানি বাড়লেই ডুবে যাবে খাট।

রংপুর সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, জরুরি কাজে ঢাকায় এসেছেন। তার নিজের বাড়িও পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনি জানান, আমার ৬০ বছর বয়স। আমি এমন একটানা মুষলধারে বৃষ্টি কখনও দেখিনি। তিনি বলেন, নগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়েছে। এক লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর ভাবে দিন কাটাচ্ছে। বিশেষ করে হত দরিদ্র লাখো পরিবার অনাহারে আছে। তাদের জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য সরবরাহ করার জন্য আমি দাবি জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি। পানিবন্দি মানুষদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে খাবার সরবরাহ করার দাবি জানিয়েছি।

রংপুর আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, রংপুরে গত একশ’বছরে এমন বৃষ্টি হয়নি। এর আগে সর্বোচ্চ ৩৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছিল। শনিবার রাত থেকে রবিবার সকাল ৯ টা পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৪শ ৩৩ মিলিমিটার। তিনি জানান, বৃষ্টি আরও দু’দিন অব্যাহত থাকতে পারে।

 

 

/টিএন/

লাইভ

টপ