আলোচনায় এসআই আকবরের বাড়ি

Send
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ০২:০৯, অক্টোবর ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০৬, অক্টোবর ১৫, ২০২০

এসআই আকবরের গ্রামের বাড়ি

রায়হান উদ্দিন নামের এক যুবককে সিলেটের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে তুলে এনে নির্যাতন করে হত্যার ঘটনায় এখন সংক্ষুব্ধ এখন সারাদেশ। এ নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি এসআই আকবরের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের বগইর গ্রামে। ফলে তার এলাকাতেও আকবর এখন আলোচনার কেন্দ্রে। গ্রামবাসীর আলোচনায় এসেছে তার আলীশান বাড়িও।

জেলার আশুগঞ্জের বগইর গ্রামের জাফর আলী ভূঁইয়ার তিন ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে সবার বড় আকবর। ২০০৫ সালে কনস্টেবল হিসেবে চাকরিতে যোগদান করা আকবর ২০১৪ সালে এসআই পদে পদোন্নতি পান। তার এক ভাই চাকরিসূত্রে থাকে সিঙ্গাপুরে। তবে প্রায়ই দেশে আসে।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিকেলে বগইরে তার গ্রামের বাড়ির অবস্থা পর্যবেক্ষণে যান একদল সাংবাদিক। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ১৫ শতাংশ জায়গার ওপর সুসজ্জিত একটি একতলা ভবন। বাড়ির সামনেই কাজ চলছে সুবিশাল গেইটের। বাড়ির উঠানে বেশ কিছু মানুষের আনাগোনা। তবে ভবনের দরজা-জানালা সব লাগানো।

বাড়ির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে সামনে আসেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে অর্থনীতিতে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ও আকবরের ছোট ভাই আরিফ হোসেন ভূঁইয়া। তিনি দাবি করেন, ‘আমার ভাই  এ ধরনের কাজ করতে পারে বলে বিশ্বাস করি না।’

কবে আকবরের সঙ্গে কথা হয়েছে জানতে চাইলে আরিফ জানান, রবিবার সর্বশেষ বড়ভাই আকবরের সাথে কথা হয় তার। তখন তিনি  আরিফকে বলেছেন, ‘বিপদে আছি। অফিসে ঝামেলা হয়েছে সবাইকে দোয়া করতে বলিস। এরপর থেকে আর যোগাযোগ নেই।’

একসময় গ্রামের পূর্বপাড়াতে থাকতেন তারা। কয়েক বছর আগে ওই বাড়ি বিক্রি করে নতুন এই বাড়িতে উঠেছেন তারা। বাড়ি নির্মাণে খরচ কেমন হলো আর কে টাকা দিলো জানতে চাওয়া হয় আরিফের কাছে।

এসআই আকবরের বাড়ির নির্মীয়মাণ গেট

এমন প্রশ্নে খানিকটা বিব্রত হন আরিফ। তারপর জানান, বাড়ি নির্মাণে বড় ভাই আকবর টাকা দেননি। অবসরপ্রাপ্ত বাবার অবসর ভাতা ও সিঙ্গাপুরে থাকা আরেক ভাই মোবারক হোসেন ভূঁইয়ার টাকায় কয়েক ধাপে এ বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। বাড়ি নির্মাণে ২৫ লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি আরও বলেন, এইটা আমাদের দাদার থেকে পাওয়া সম্পত্তি। আমাদের পাশের আরেকটা পৈত্রিক বাড়ি বিক্রি করে এখানে নতুন করে বাড়ি নির্মাণ করেছি।

আরিফ আর কিছু বলতে চাননি। আকবর সম্পর্কে জানতে কথা বলা হয় স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে। চেষ্টা করলেও কথা বলেননি এসআই আকবরের বাড়ির আর কোনও সদস্য। 

এমন কাজে আকবরের নাম আসাটা তার স্বজন ও প্রতিবেশীদেরও নাড়া দিয়েছে খুব। দূর থেকে ছুটে আসা কয়েকজন আত্মীয় ও এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায়, আকবরের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠায় তারা বেশ স্তম্ভিত। আকবর এমন কাজ করতে পারেন সেটা তারা ভাবতেও পারছেন না। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি তুলেছেন তারা।

মাত্র ১০ হাজার টাকার জন্য রায়হান নামে এক যুবককে নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ ওঠায় এসআই আকবরসহ চারজন এখন সাময়িক বরখাস্ত। তার স্বজনরা তাই সংশয়ে, কনস্টেবল থেকে এসআই হতে আকবরের সময় লেগেছে ৯ বছর। এরপর গত ৫ বছরে ফাঁড়ি আর থানায় ঘুরে পুলিশ হিসেবে দক্ষতা দেখানোর পাশাপাশি ক্ষমতা প্রকাশের সুযোগ এসেছে একজন এসআই হিসেবে আকবরের। এতদিন তার গ্রামে তো নয়ই ডিউটি স্টেশনেও আলোচিত হননি তিনি। তাই বলে পুলিশদের বিরুদ্ধে সাধারণত যেসব অভিযোগ ওঠে সেগুলোর বাইরে কি ছিলেন আকবর? এটা কি তার নামে ওঠা প্রথম অভিযোগের ঘটনা নাকি আগেও এরচেয়ে লঘুস্তরে কিছু হয়েছে যা তারা জানতেন না?   

হাবিবুল্লাহ নামে গ্রামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘এমনিতেই তো কাউকে সাসপেন্ড করার কথা না। নিশ্চয় পেছনে কোনও ঘটনা আছে। তদন্ত করলে সব বের হবে আশা করি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আকবরের যে ভাই সিঙ্গাপুর থাকে সে প্রায়ই দেশে চলে আসে। তার আয়-রোজগার খুব ভালো না বলে জানি।’ এখন যে বাড়ি করা হচ্ছে সেখানে আগে ধানক্ষেত ছিল, আজ সেখানে আলীশান ভবন। তাতেই বোঝা যায় আকবর কেমন।’

গ্রামেরই  আরও কয়েকজন ব্যক্তি এসআইয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ঘটনা তো একটা ঘটেছে। একজন মানুষ মারাও গেছে। সেই ঘটনায় আকবর জড়িত এমন সন্দেহে তাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। মামলাও করা হয়েছে। ফলে এটা তো আর অস্বীকার করা যাবে না। ফলে আমরা ঘটনার বিচার দাবি করি। আকবর জড়িত না হলে মুক্তি পাক। অপরাধী হলে এমন ঘটনায় তো আর তাকে নির্দোষ বলার উপায় নাই।’

আকবরের বন্ধু ও আত্মীয় মো. পারভেজুর রহমান ভূঁইয়া অবশ্য এখনও মনে করেন আকবর নির্দোষ। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আকবরের পক্ষে এমন হত্যাকাণ্ড ঘটানো সম্ভব বলে মনে করি না। আমরা চাই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করা হোক। আকবর একজন সংস্কৃতিমনা মানুষ। তার পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব নয়।’

আমেনা বেগম নামে বগইর গ্রামের এক নারী জানান, আগে গ্রামের পূর্বপড়ায় বাড়ি ছিল আকবরদের। বেশ কয়েক বছর আগে গ্রামের পূর্বপাড়ার সেই বাড়ি তার (আমেনা বেগম) ছেলের কাছে বিক্রি করে দক্ষিণ পাড়ায় এসে নতুন বাড়ি করেন আকবরের বাবা। আকবরকে তারা ভালো ছেলে হিসেবেই চেনেন। তবে বাইরে সে কী করে সেটা জানেন না।

পাশের দুর্গাপুর গ্রামের মুজিবুর রহমান নামে এক ব্যক্তি জানান, ঘটনার খবর পেয়ে তিনি বিস্তারিত জানতে ছুটে আসেন। দু’দিন আগে ইন্টারনেটের মাধ্যমে তিনি আকবরকেন্দ্রিক সব ঘটনা জানতে পেরেছেন। তবে আকবর এমন করতে পারে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। 

এ ব্যাপারে আশুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাবেদ মাহমুদ বলেন, ‘আকবরের বাড়ি দূর্গাপুর ইউনিয়নের বগইর গ্রামে এই টুকু জানি। আকবর কিংবা তার পরিবার সম্পর্কে আমার কাছে কোনও তথ্য নেই। জেলা পুলিশ কিংবা পুলিশ সদর দফতর থেকেও এ  তথ্য জানার জন্যে কোনও নির্দেশনা আমাদের কাছে আসেনি।’

উল্লেখ্য, রায়হান নামের ওই যুবককে বন্দরবাজার থানা পুলিশ গত শনিবার (১০ অক্টোবর) বিকালে আটক করে। ওইদিন রাতে ফাঁড়িতে তার ওপর নির্যাতন চালায় পুলিশ এবং তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য টাকা দাবি করে। ভোরে অপরিচিত একটি মোবাইল থেকে ছেলের ফোন পায় রায়হানের বাবা। তাতে ওই ফাঁড়িতে তাকে আটকে রেখে ছেড়ে দেওয়ার জন্য টাকা দাবি করা হচ্ছে বলে জানায় রায়হান। বাবাকে টাকা নিয়ে এসে তাকে উদ্ধারের অনুরোধও করে রায়হান। ছেলেকে বাঁচাতে ভোরে তার বাবা টাকা নিয়ে ওই ফাঁড়িতে গেলে তাকে জানানো হয় রায়হান এখন ঘুমাচ্ছে, সকাল ১০টার দিকে আসতে হবে। পরে সকালে এলে তাকে বলা হয় সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজে যেতে। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন তার ছেলে মারা গেছে। এরপর মৃত ছেলের শরীরে নির্যাতনের ভয়াবহ চিহ্ন দেখতে পান তিনি। রায়হানের হাতের নখগুলোও ওপড়ানো ছিল। পুলিশ এরপর দাবি করে রায়হানকে ছিনতাইকারী সন্দেহ করে জনতা গণপিটুনি দেওয়ায় তার মৃত্যু হয়েছে। তবে সিটি করপোরেশনের ফুটেজে এর কোনও প্রমাণ মেলেনি। রবিবার সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজে তার ময়না তদন্ত সম্পন্ন হয়। বিকেলে ৩টার দিকে ময়না তদন্ত শেষে নিহতের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। এশার নামাজের পর জানাজা শেষে তার লাশ পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়। রায়হানকে পুলিশ হেফাজতে অমানবিক নির্যাতনের ঘটনাটি রবিবার থেকেই গণমাধ্যমে আলোচিত হচ্ছে। সোমবার এ ঘটনায় সিলেট কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন নিহতের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি। এ মামলায় এসআই আকবরকে মামলার মূল আসামি হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। মামলা দায়েরের পর এর তদন্তভার দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কে। 

আরও পড়ুন:

পুলিশ হেফাজতে রায়হানের মৃত্যু: ৪ পুলিশ বরখাস্ত, ৩ জনকে প্রত্যাহার

পুলিশ হেফাজতে যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা

মোবাইল নম্বরটি কার?

গণপিটুনির প্রমাণ মেলেনি সিসিটিভি ফুটেজে, দাবি কাউন্সিলরের

পুলিশ হেফাজতে যুবককে নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ

 

 

/টিএন/

লাইভ

টপ
X