রাবিতে শিক্ষক নিয়োগ বিধি আবার পাল্টানো হলো কার জন্য?

Send
তৌসিফ কাইয়ুম, রাবি
প্রকাশিত : ২০:৫৪, অক্টোবর ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:১৩, অক্টোবর ২২, ২০২০

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্বগ্রহণের পর ২০১৭ সালে ৪৭২তম সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তন করেন। এতে দীর্ঘদিন ধরে ওই নীতিমালায় থাকা ২০০১-০২ সালে এসএসসি/সমমান এবং ২০০৩ সালের এইচএসসি/সমমান পরীক্ষার্থীদের আবেদন যোগ্যতা (এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফলে) শিথিলের বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়। তবে তিন বছর পর ‘বিশেষ কারণে’ বাদ দেওয়া বিষয়টি সংযোজন করে একটি বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। আর এতেই প্রশ্ন উঠেছে বার বার শিক্ষক নিয়োগ বিধি পাল্টানোর নেপথ্য কারণ কি? বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়েরই সিনিয়র শিক্ষকরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপকরা বলছেন, পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে তিন বছর আগে বাদ দেওয়া বিষয়টি ফের সংযোজন করা হয়েছে। অন্যদিকে, সিন্ডিকেটে সে সময়ে পাস হওয়া বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, তখন সেটি অনিচ্ছাকৃতভাবে বাদ পড়েছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ০১ অক্টোবর বসা সিন্ডিকেট সভায় এর আগে বাদ দেওয়া ২০০১,২০০২ সালের এসএসসি/ সমমান এবং ২০০৩ সালের এইচএসসি/সমমান পরীক্ষায় জিপি (গ্রেড পয়েন্ট) ৫.০০ স্কেলে ন্যূনতম জিপিএ/সিজিপিএ শিথিলের বিষয়টি শিক্ষক নীতিমালায় আবারও সংযোজন করা হয়। পরবর্তীতে ১২ অক্টোবর সে অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি  দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এম এ বারী স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট বিভাগে প্রভাষক পদে স্থায়ীভাবে দুজন এবং সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপক পদে অস্থায়ীভাবে দুজনকে নিয়োগ দেওয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে প্রভাষক পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে বলা হয়, গ্রেডিং পদ্ধতিতে এসএসসি/সমমান এবং এইচএসসি/সমমান পরীক্ষায় জিপি (গ্রেড পয়েন্ট) ৫.০০ স্কেলে যে-কোনও একটিতে ন্যূনতম সিজিপিএ ৩.৫০ এবং অন্যটিতে জিপিএ/সিজিপিএ ৪.৫ থাকতে হবে। তবে শুধুমাত্র ২০০১,২০০২ ও ২০০৩ সালের এস.এস.সি./ সমমান এবং ২০০৩ সালের এইচ.এস.সি./সমমান পরীক্ষায় জিপি (গ্রেড পয়েন্ট) ৫.০০ স্কেলে যে কোনও একটিতে ন্যূনতম জিপিএ/সিজিপিএ ৩.৫০ এবং অন্যটিতে ৩.২৫ থাকতে হবে।

এছাড়া বিজ্ঞপ্তির বিশেষ দ্রষ্টব্যে বলা হয়, স্বীকৃত বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট এ স্নাতক (সম্মান)সহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরা অগ্রাধিকার পাবেন।

 

রাবিতে গত ১২ অক্টোবর প্রকাশ করা শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি

শর্তটি আগে বাদ দিয়ে ফের নীতিমালায় সংযোজন করার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এম এ বারী বলেন, ২০০১ সালে প্রথম গ্রেডিং সিস্টেম চালু হয়েছিল। সেময় মার্কিং সিস্টেমে ধস নামে। এ কারণে জিপিএ/সিজিপিএ বিষয়টি ২০১৩, ২০১৫ সালের নীতিমালাতেও এটি ছিল। ২০১৭ সালের নীতিমালায় এটি বাদ পড়ে গিয়েছিল। গত ০১ অক্টোবর সিন্ডিকেট সভায় ২০১৭ সালের নীতিমালার সঙ্গে এটি সংযোজন করা হয়।

তিন বছর পর এই শর্তটি সংযোজনের পেছনে বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য বা প্রয়োজন আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যান।

বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট এ স্নাতক (সম্মান) সহ  স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে বাংলাদেশ থেকে যারা এ বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেছেন তারা বঞ্চিত হবেন কিনা এমন প্রশ্নে অধ্যাপক এম এ বারী বলেন, এখানে বঞ্চিত হওয়ার কিছু নেই।

এদিকে শিক্ষাগত যোগ্যতার ওই শর্ত বাদ দেওয়ার তিন বছর পর আবারও তা যোগ করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পেছনে বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সিনিয়র শিক্ষক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলছেন, ‘বিষয়টি উদ্দেশ্যমূলক এবং পছন্দের কোনও প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে এমনটা করা হচ্ছে।’

ব্যবসায় অনুষদের সিনিয়র শিক্ষক ও প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বর্তমান উপাচার্য নিজের মেয়ে ও জামাতাকে নিয়োগ দিতে পূর্বে ‘সর্বজন প্রশংসিত’ শিক্ষক নীতিমালা বাদ দিয়ে নতুন নীতিমালা করেন। এখন আবার নিজের বাদ দেওয়া বিষয়টি নীতিমালায় যুক্ত করেছেন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে এমন করা করা হয়েছে। ’’

শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি ও ব্যবসায় অনুষদের সাবেক ডিন এবং ফাইন্যান্স বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপক আমাজাদ হোসেন বলেন, ‘তিন বছর আগে বাদ দিয়ে ফের সংযোজন করা এবং সেই অনুসারে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ। বিদেশি স্বীকৃত বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা- এগুলো উদ্দেশ্যমূলক। কোনও পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে এমনটা করা হচ্ছে।’

শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালায় এই শর্তটি আবারও সংযোজনের বিষয়টি অবহিত নন জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আশরাফুল আলম খান বলেন, ‘২০১৫ সালের নীতিমালায় ছিল। ২০১৭ সালে এটি বাদ দিয়ে তিন বছর পরে কেন সংযোজন করা হলো সেটির ব্যাখা আমরা জানতে চাইবো। যদি ভুলবশত হয়ে থাকে তবে শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালার মতো সেনসেটিভ বিষয়ে ভুল হবে কেন? ইন্টেনশনালি (ইচ্ছাকৃতভাবে) এটি করা হয়েছে কিনা সেই ব্যাখ্যাও জানতে চাইবো আমরা।’
উল্লেখ্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান  ২০১৭ সালে ৪৭২তম সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালায় যে পরিবর্তন আনেন তার সুফল ঘরে তোলেন তিনি নিজেই। অভিযোগ রয়েছে ওই নীতিমালার সুযোগে তার মেয়ে সানজানা সোবহান মার্কেটিং বিভাগ থেকে পাস করেও নিয়োগ পান টুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে এবং জামাতা এ টি এম শাহেদ পারভেজ নিয়োগ পান ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটে (আইবিএ)। কারণ, এখন যে নীতিমালা ফিরিয়ে আনা হলো সেটি বহাল থাকলে তাদের আবেদন করার যোগ্যতাই থাকতো না। কারণ বিভাগে উপাচার্যকন্যার মেধাক্রম ছিল ২১তম, আর জামাতার এমবিএ পরীক্ষায় মেধাক্রম ছিল ৬৭তম এবং তার ফল ছিল সিজিপিএ-৩.৪৭।

ফলে তিন বছর পর সেই শর্ত বাদ দেওয়ার ‘বিশেষ কারণটি’ এখন প্রকাশ্য এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও (ইউজিসি) বিষয়টি তদন্ত করছে। এবার সেই শর্ত আবারও পুনর্বহাল করার কারণ স্বার্থ শেষ নাকি নতুন কিছুর শুরু তা নিয়ে তাই শিক্ষকমহলে রয়েছে জোর সন্দেহ।

এসব বিষয়ে জানতে উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

/টিএন/

লাইভ

টপ