বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর ঘুরে দেখলেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন

রাজশাহী প্রতিনিধি
০৬ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৭ আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৭

বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন রবিবার (৫ জুলাই) সকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারিতে সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ঘুরে দেখেন।

জাদুঘর পরিদর্শনের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম এবং বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক কাজী মো. মোস্তাফিজুর রহমান রাষ্ট্রদূতকে জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, প্রাচীন পুঁথি ও গ্রন্থাগারের বিভিন্ন সংগ্রহ সম্পর্কে অবহিত করেন।

এ সময় রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহের প্রতিফলন হিসেবে তিনি এ জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের ভূমিকার প্রশংসা করেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে জাদুঘরের সংগ্রহ সংরক্ষণে সহযোগিতার আগ্রহও প্রকাশ করেন।

জাদুঘর পরিদর্শন শেষে রাষ্ট্রদূত ও তার প্রতিনিধিদলের সদস্যরা বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সেখানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত স্টারলিংক ইন্টারনেট সংযোগের উদ্বোধন করেন। সফর শেষে সোমবার (৬ জুলাই) তার ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।

উল্লেখ্য, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন শরৎকুমার রায়। ছাত্রজীবন শেষ করে ইউরোপ সফরে গিয়েছিলেন নাটোরের দীঘাপাতিয়ার এই রাজকুমার। ঘুরেছেন ইতালির পম্পেই, গ্রিসের থিবস। মিসরের অনেক প্রাচীন শহরেও পড়েছিল তার পা। এসব নগরীর ধ্বংসাবশেষ দেখে নিজের দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন তিনি। দেশে ফিরে ‘বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি’ নামে একটি সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। এই সমিতি বরেন্দ্র অঞ্চলের পুরাকীর্তি অনুসন্ধানে নেমে পড়ে। সমিতির সংগ্রহ নিয়ে ১৯১০ সালের সেপ্টেম্বরে যাত্রা শুরু করে ‘বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম’। অগ্রজ রাজা প্রমদানাথের দেওয়া জমিতে নিজের পকেট থেকে ৬৩ হাজার টাকা দিয়ে গৌড়ের স্থাপত্যশৈলীর অনুকরণে অপূর্বশিল্প সুষমামণ্ডিত একটি ভবন নির্মাণ করান শরৎকুমার রায়।

জানা গেছে, এর নকশাও শরৎকুমার রায় নিজেই করেছিলেন। দেশের একমাত্র গবেষণা জাদুঘরটি ১৯৬৪ সাল থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে এই জাদুঘরের সংগ্রহে আছে ১৭ হাজারের বেশি দুর্লভ সংগ্রহ।

জাদুঘরে ঢুকেই দর্শনার্থীরা প্রথম প্রতিষ্ঠাতাদের সঙ্গে পরিচিত হবেন। প্রথমেই অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র ছবি। তিনি ছিলেন বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির পরিচালক। মাঝখানে শরৎকুমার রায়ের ছবি। তিনিই ছিলেন সমিতির সভাপতি। তারপর আছে জাদুঘরের প্রথম অনারারি কিউরেটর রমাপ্রসাদ চন্দের ছবি।

এরপর গ্যালারিতে ঢুকতেই দেখা মিলবে টেরাকোটার বিষ্ণুমূর্তি। পোড়ামাটিতে তৈরি হলেও এখনও অটুট আছে বিষ্ণুমূর্তিটির নিটোল চোখমুখ। জাদুঘরের একজন কর্মকর্তা বলেন, টেরাকোটায় তৈরি আরও দুটি মূর্তি ঢাকা জাদুঘরে ছিল। ২০০৭-০৮ সালে ফ্রান্সের গিমে জাদুঘরে প্রদর্শনীর জন্য বিমানবন্দরে নেওয়ার পর সেখান থেকে মূর্তি দুটি চুরি হয়ে যায়। পরে ভাঙা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তারপর নওগাঁর রানীনগর থানায় বিষ্ণুমূর্তিটি পাওয়া যায়। এটিই এখন দেশে টেরাকোটায় তৈরি একমাত্র বিষ্ণুমূর্তি।
এরপরের গ্যালারিতেই দেখা যাবে লক্ষ্মণ সেনের বাগবাড়ী শিলালিপি। ‘কুটিল’ হরফে লেখা এই শিলালিপিতে লক্ষ্মণ সেনের রাজবংশের পরিচয় লেখা আছে।

জাদুঘরের কর্মকর্তা আবদুল কুদ্দুস বললেন, রাজশাহীর গোদাগাড়ীর দেওপাড়া থেকে বিজয় সেনের ‘প্রশস্তি’ উদ্ধার হয়েছিল। সেটি কলকাতায় আছে। আর বাগবাড়ী থেকে ২০০৭ সালে পাওয়া লক্ষ্মণ সেনের এই লিপিটি এখানে রয়েছে। এটির সময়কাল ১১৮৪ থেকে ১১৮৫ সাল। এই লিপি আর কোথাও নেই। ভেতরের একটি গ্যালারিতে রয়েছে গঙ্গামূর্তি। গঙ্গামূর্তি আরও বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে, কিন্তু এই মানের গঙ্গা আর কোথাও নেই বলে দাবি কর্মকর্তা আবদুল কুদ্দুসের। নারীদেহের গড়ন ও পা থেকে মাথা পর্যন্ত গয়না আমাদের ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে। মকরের (কুমিরের মতো প্রাণী) পিঠে আরোহণ করে আছেন গঙ্গা। পা থেকে মাথা পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে দেখতে অনেকক্ষণ লাগবে। কৃষ্ণপ্রস্তরে নির্মিত মূর্তিটি আনুমানিক দ্বাদশ শতাব্দীর। এটি জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা শরৎকুমার রায়ের সৌজন্যে পাওয়া।

এই গ্যালারিতেই রয়েছে অর্ধনারীশ্বর। অর্ধেক পুরুষ অর্ধেক নারী। শরীরের ডান দিকে পার্বতী, বাঁ দিকে শিব। ডান দিকে নারী অঙ্গের বৈশিষ্ট্য আর বাঁ দিকে পুরুষের চেহারা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কৃষ্ণপ্রস্তরে নির্মিত মূর্তিটি আনুমানিক দ্বাদশ শতাব্দীর।

জাদুঘরে পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি আছে। এগুলোর অধিকাংশ সংস্কৃত, প্রাকৃত ও আদি বাংলা ভাষায় রচিত। এর মধ্যে ৩ হাজার ৯০০টি সংস্কৃত আর ১৭০০টি বাংলা। সবচেয়ে বেশি আলোচিত ১২৭৩ খ্রিষ্টাব্দ এবং ত্রয়োদশ শতকের কোনও এক সময়ে তালপাতায় লিখিত ও রঙিন চিত্রকর্ম দ্বারা শোভিত দুটি পুঁথি। নাম ‘অষ্টসহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছে অতি অনুসরণীয় ও সম্মানিত গ্রন্থ ‘অষ্টসহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’। আট হাজার লাইনে লেখা একটি পুঁথিতে ছয়টি ও অপরটির ৪৯টি পাতায় দেবদেবীর ৪৯টি রঙিন ছবি স্থান পেয়েছে। ছবিগুলোর রং-রেখা হাজার বছর পরও অটুট রয়েছে। বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের অষ্টসহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা পুঁথির চিত্র বাংলার প্রাচীন চিত্রশিল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এ ধরনের পাণ্ডুলিপি বা পাণ্ডুলিপির খণ্ডাংশ বাংলাদেশের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে নেই।

/এফআর/
সম্পর্কিত
চীনে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে বসছেন পুতিন, ট্রাম্প ও শি
ধারের টেবিলে শুরু হওয়া যে কোম্পানি এখন ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে
পানাম নগরী ঘুরে দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নকশিকাঁথা-জামদানি দেখে মুগ্ধ
সর্বশেষ খবর
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
বিপাকে রোনালদো, নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে গুনলেন জরিমানাও
বিপাকে রোনালদো, নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে গুনলেন জরিমানাও
জিম্বাবুয়েকে উড়িয়ে বাংলাদেশের ফাইনালের পথ সহজ করলো আফগানিস্তান
জিম্বাবুয়েকে উড়িয়ে বাংলাদেশের ফাইনালের পথ সহজ করলো আফগানিস্তান
বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস সেমিনারে যোগ দিবেন ডা. জুবাইদা রহমান 
বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস সেমিনারে যোগ দিবেন ডা. জুবাইদা রহমান 
সর্বাধিক পঠিত
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
‘পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না’ মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন এমপি রতন
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
চট্টগ্রামে জন্ম, ঢাকায় বসবাস-এমপি হতে ঠাকুরগাঁওয়ে আলীম নিজামী
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
ইউএনওর সরকারি গাড়ি নিয়ে ভাড়া বাসায়, তিন নারীসহ আটক চালক
ইউএনওর সরকারি গাড়ি নিয়ে ভাড়া বাসায়, তিন নারীসহ আটক চালক
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: যা বললেন প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির