চোখের চিকিৎসা করাতে স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় গিয়েছিলেন রনজিলা পারভীন রুলি। পরিকল্পনা ছিল, চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে শনিবার রাতেই বগুড়ার বাসায় ফিরে আসবেন। বাড়িতে অপেক্ষা করছিলেন তার একমাত্র মেয়ে রাইসা আক্তার। পরদিন রবিবার আবার স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল রুলির।
কিন্তু মেয়ের কাছে তিনি ফিরলেন ঠিকই। তবে জীবিত নয়, কফিনবন্দি হয়ে।
শনিবার রাতে বগুড়া শহরের রহমাননগর এলাকার ভাড়া বাসায় যখন রুলির মরদেহ পৌঁছায়, তখন কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। নবম শ্রেণির ছাত্রী রাইসা বারবার মায়ের মরদেহের কাছে গিয়ে বিলাপ করতে থাকেন। তার মুখে একটাই কথা, ‘এখন কাকে মা ডাকব?’
মেয়ের এই আর্তনাদে স্বজনদের কান্না যেন আরও বেড়ে যায়। তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেরাই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি অনেকে। কিছুক্ষণ পরপর মাকে ডেকে আহাজারি করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেন রাইসা।
রনজিলা পারভীন রুলি ছিলেন বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। দীর্ঘদিন ধরে চোখের সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে স্বামী আবদুল মতিনের সঙ্গে ঢাকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
শুক্রবার রাতে বগুড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন তারা। শনিবার সকালে ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনালে পৌঁছান। সেখান থেকে রিকশায় করে ফার্মগেট এলাকার ইস্পাহানী ইসলামিয়া আই ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালে যাওয়ার কথা ছিল তাদের।
চিকিৎসা শেষে সেদিন রাতেই বগুড়ায় ফেরার পরিকল্পনা ছিল রুলির। কারণ, পরদিন রবিবার তাকে স্কুলে যেতে হবে। ছুটি না নিয়েই তিনি ঢাকায় গিয়েছিলেন।
কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না।
শনিবার ভোরে বাস থেকে নেমে স্বামী আবদুল মতিনকে সঙ্গে নিয়ে রিকশায় করে চক্ষু হাসপাতালের দিকে যাচ্ছিলেন রুলি। সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে তাদের রিকশা সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার কাছে পৌঁছায়।
এ সময় পেছন থেকে মোটরসাইকেলে দুই ছিনতাইকারী এসে রুলির ব্যাগ ধরে টান দেয়। রিকশায় বসা রুলি ব্যাগটি আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করেন। শুরু হয় টানাটানি।
একপর্যায়ে ছিনতাইকারীদের টানে রিকশা থেকে রাস্তায় ছিটকে পড়ে যান তিনি। মাথায় গুরুতর আঘাত পান।
স্বামী ও আশপাশের লোকজন দ্রুত তাকে উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
চোখের চিকিৎসা করাতে ঢাকায় যাওয়া একজন শিক্ষিকার জন্য কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পরিণতিটা এমন হবে, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেননি।
বগুড়ার রহমাননগরের বাসায় মায়ের ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন রাইসা। মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল গভীর। রাইসার ভাষায়, তারা কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারতেন না।
রাইসা বলেন, তিনিও মায়ের সঙ্গে ঢাকায় যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মা তাকে বুঝিয়েছিলেন, চিকিৎসককে দেখিয়েই শনিবার রাতে তারা ফিরে আসবেন। তাই তাকে চিন্তা না করতে বলেছিলেন রুলি।
মায়ের সেই আশ্বাসই এখন মেয়েটির কাছে সবচেয়ে বড় কষ্টের স্মৃতি। রাইসা বলেন, মা এখন আর ফিরে আসবে না। এখন কাকে মা বলে ডাকব?
এই প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই স্বজনদের কাছেও।
রনজিলা পারভীন রুলি ছিলেন তিন বোনের মধ্যে মেজ। তার মা জোবেদা খাতুন বলেন, রুলি তাকে খুব ভালোবাসতেন। স্কুল ছুটি পেলেই মাকে দেখতে যেতেন।
মেয়ের মৃত্যুর খবর মেনে নিতে পারছেন না তিনিও। তার ভাষায়, যে মেয়ে সব সময় তাদের খোঁজ নিতেন, সেই রুলি এখন আর তাদের মাঝে নেই।
একদিকে মেয়েকে হারানোর শোক, অন্যদিকে নাতনির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, সব মিলিয়ে পরিবারটিতে নেমে এসেছে গভীর শোক।
জোবেদা খাতুন একমাত্র মেয়ে রাইসার কথা উল্লেখ করে বলেন, অল্প বয়সেই সে মাকে হারালো। তিনি রুলির মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিনতাইকারীদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
রুলির স্বামী আবদুল মতিনের জন্যও এই ঘটনা যেন এক মুহূর্তে সবকিছু বদলে দিয়েছে। চোখের চিকিৎসার জন্য যে স্ত্রীকে নিয়ে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন, সেই স্ত্রীকেই হারিয়ে ফিরতে হয়েছে তাকে।
আবদুল মতিন বলেন, যারা তার মেয়েকে মা-হারা এবং তাকে স্ত্রীহারা করেছে, তাদের ফাঁসি চান তিনি। তার আকুতি, তার মতো আর কোনও বাবা ও স্বামী যেন এমন নির্মম ঘটনার শিকার না হন।
রনজিলা পারভীন রুলির শিক্ষকতা জীবনের শুরু ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে। সে সময় সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। পরে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পেয়ে বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দায়িত্ব নেন।
গাবতলী উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ইদ্রিস আলী প্রামাণিক বলেন, রুলি ভালো মানুষ এবং ভালো শিক্ষক ছিলেন।
তার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন অসংখ্য শিক্ষার্থী ও সহকর্মী। তাই রবিবার যখন তার মরদেহ কফিনে করে বিদ্যালয়ে পৌঁছায়, তখন সেখানে তৈরি হয় আরেকটি শোকের আবহ।
রুলির ভাই জাহিদুল ইসলাম জানান, রবিবার দুপুরে বগুড়া শহরের রহমাননগরের বাসা থেকে তার মরদেহ প্রথমে বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেওয়া হয়।
সেখানে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা তাকে শেষবারের মতো দেখতে ভিড় করেন। কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে।
বাদ জোহর বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে মরদেহ নেওয়া হবে গাবতলী সদর ইউনিয়নের তরফসরতাজ গ্রামে। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।

রাজধানীতে ছিনতাইয়ের সময় শিক্ষিকা হত্যা: সহযোগীসহ মূল সন্দেহভাজন গ্রেফতার
চিকিৎসার জন্য ঢাকায় প্রধান শিক্ষক, ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে পড়ে নিহত
মোহাম্মদপুরে অপরাধ শূন্যের কোঠায় আনতে চায় র্যাব
বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্ত না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়







