পাঠদান থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম, লাল ভবনে ১৫৩ বছরের ইতিহাস

দুলাল আবদুল্লাহ, রাজশাহী
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০১আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০১

লালরঙা ভবন, সবুজে ঘেরা পরিপাটি ক্যাম্পাস আর দীর্ঘ ইতিহাস—রাজশাহী কলেজ যেন একই সঙ্গে অতীত ও বর্তমানের এক অনন্য মেলবন্ধন। শুধু পাঠদান নয়, ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের স্মৃতিও ধারণ করে আছে উপমহাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

নানা চড়াই-উতরাই ও সময়ের স্রোত পেরিয়ে ১৮৭৩ সালের ১ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী কলেজ এখন ১৫৩ বছরের পথে। ৩৫ একর জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটির ঝুলিতে অপ্রাপ্তির তুলনায় প্রাপ্তিই বেশি। শিক্ষা, সংস্কৃতি, আন্দোলন-সংগ্রাম ও জাতীয় জীবনে অবদানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আজ দেশসেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে রাজশাহী কলেজ।

পদ্মা নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত কলেজটি ঢাকা ও চট্টগ্রাম কলেজের পর বাংলাদেশের তৃতীয় প্রাচীনতম কলেজ। মাত্র পাঁচজন হিন্দু ও একজন মুসলিম ছাত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি সময়ের পরিক্রমায় পরিণত হয়েছে দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠে। বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখরিত উত্তরবঙ্গের এই শিক্ষাঙ্গন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিংয়েও টানা পাঁচবার সেরা কলেজের স্বীকৃতি পেয়েছে।

প্রতিষ্ঠার শুরু যেভাবে

প্রাচীন বাউলিয়া ইংলিশ স্কুল ও রাজশাহী জেলা স্কুলের হাত ধরেই রাজশাহী কলেজের পথচলা শুরু। ১৮৭২ সালে দুবলহাটির রাজা হরনাথ রায় চৌধুরীর দানকৃত সম্পত্তি এবং দীঘাপতিয়ার রাজা প্রমথনাথ রায়ের দেওয়া ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় কলেজের ভবন নির্মাণ করা হয়।

বাঙালির বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের স্মৃতিও ধারণ করে আছে উপমহাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

১৮৭৩ সালের ১ এপ্রিল রাজশাহী জেলা স্কুলে এফএ (ফার্স্ট আর্টস) শ্রেণি চালুর মাধ্যমে কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। ১৮৭৭ সালের অক্টোবরে স্নাতক কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি পায় এটি। ১৮৭৮ সালে প্রথম গ্রেডের মর্যাদা পাওয়ার পাশাপাশি ছাত্রসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০০-তে। সে সময়ই এর নামকরণ হয় রাজশাহী কলেজ। একই বছরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তির পর উত্তরবঙ্গের প্রথম কলেজ হিসেবে এখানে বিএ কোর্স চালু হয়।

১৮৮১ সালে স্নাতকোত্তর এবং ১৮৮৩ সালে বিএল কোর্স চালু হয়। ১৮৮৪ সালে নির্মাণ করা হয় কলেজের প্রথম ভবন, যা বর্তমানে প্রশাসনিক ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৯০২ সালে পুঠিয়ায় রানি হেমন্তকুমারী তাঁর নামে একটি হোস্টেল এবং কলেজের অধীনে মহারাণী হেমন্তকুমারী সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯০৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মাস্টার্স ও বিএল কোর্সের অধিভুক্তি বাতিল করে। এরপর প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয় রাজশাহী কলেজ। আইকম, বিকম (পাস) ও বিকম (সম্মান) কোর্স চালু হয় যথাক্রমে ১৯৫২, ১৯৫৪ ও ১৯৬১ সালে।

বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলেজটিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। চালু রয়েছে উচ্চমাধ্যমিক পাঠক্রমও। তবে শিক্ষার্থী নথিভুক্তি বন্ধ থাকায় ১৯৯৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত উচ্চমাধ্যমিক কার্যক্রম বন্ধ ছিল।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গৌরবময় তালিকা

তৎকালীন রাজশাহী জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক হরগোবিন্দ সেন ছিলেন রাজশাহী কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ। দীর্ঘ পথচলায় অসংখ্য প্রথিতযশা ব্যক্তি শিক্ষকতা করেছেন এই কলেজে। তাঁদের মধ্যে এফ টি ডাউডিং, শ্রী কুমার ব্যানার্জি , বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-এ-খুদা, ড. আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন, ভাষাবিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক ড. এনামুল হক, অধ্যাপক সুনীতিকুমার ভট্টাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ড. ইতরাত হোসেন জুবেরী, জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম. শামস উল হক উল্লেখযোগ্য।

নানা চড়াই-উতরাই ও সময়ের স্রোত পেরিয়ে ১৮৭৩ সালের ১ এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী কলেজ এখন ১৫৩ বছরের পথে

শিক্ষার্থী হিসেবেও এই কলেজে পড়েছেন দেশ-বিদেশে খ্যাতিমান বহু ব্যক্তি। তাঁদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত জ্যোতি বসু, খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য স্যার যদুনাথ সরকার, শিক্ষানুরাগী মাদার বখশ, জাতীয় চার নেতার অন্যতম এএইচএম কামারুজ্জামান, মুক্তিবাহিনীর উপ-সর্বাধিনায়ক এ কে খন্দকার, ৬ নম্বর সেক্টর কমান্ডার এম খাদেমুল বাশার, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দিন আহমেদ, সাবেক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান, পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ আলী মিয়া, ইতিহাসবিদ অক্ষয় কুমার মৈত্র, কথাসাহিত্যিক আনোয়ার পাশা, কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক, নাট্যকার মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, গল্পকার রফিকুর রশিদ, কলামিস্ট ড. এবনে গোলাম সামাদ এবং বর্তমান ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুসহ বহু বরেণ্য ব্যক্তি রয়েছেন।

কথিত আছে, ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব বাংলায় রাজশাহী কলেজেই স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে পাঠদান করা হতো। সে সময় অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও আসাম, বিহার ও উড়িষ্যা থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে জ্ঞানার্জনের জন্য আসতেন। একসময় অবিভক্ত ভারতবর্ষে রাজশাহীর পরিচয়ের সঙ্গেও রাজশাহী কলেজের নাম জড়িয়ে ছিল।

লালরঙা ভবনে ইতিহাসের ছাপ

রাজশাহী কলেজের অন্যতম বড় আকর্ষণ এর ঐতিহাসিক স্থাপত্য। চীনা কারিগর ও মিস্ত্রিদের হস্তশিল্পের সমন্বয়ে ব্রিটিশশৈলীতে কাঠের সানশেড দিয়ে নির্মিত প্রশাসনিক ভবনটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। হাজী মুহাম্মদ মহসীন ভবন, ফুলার ভবন ও প্রশাসনিক ভবনের মতো লালরঙা স্থাপনাগুলো আজও প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন হয়ে আছে।

ভবনগুলোর স্থাপত্যশৈলী বর্তমান প্রজন্মকে সেই আমলের রাজকীয় নির্মাণরীতির কথা মনে করিয়ে দেয়। ফলে রাজশাহী কলেজের পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে এর লালরঙা ভবনগুলো। পথচারীরাও নীরবে থমকে তাকান এসব স্থাপনার দিকে।

রাজশাহী কলেজ মানেই যেন লাল ভবন আর সবুজ প্রকৃতিতে ঘেরা একটি সুন্দর ও পরিপাটি ক্যাম্পাস। পড়ালেখার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চা, সাহিত্যচর্চা, আড্ডা, গল্প কিংবা গান—সবকিছুই চলে সমান তালে। শুধু জ্ঞানার্জন নয়, ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা এরশাদবিরোধী আন্দোলন—বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এই কলেজের নাম।

ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ক্যাম্পাস

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিও গভীরভাবে ধারণ করে আছে রাজশাহী কলেজ। ভাষাশহীদদের স্মরণে নির্মিত দেশের প্রথম শহীদ মিনারের ইতিহাসও এই ক্যাম্পাসের সঙ্গে যুক্ত।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ঢাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণের খবর ট্রেনে করে রাজশাহীতে পৌঁছায়। খবর পেয়ে রাজশাহী কলেজ ও আশপাশের প্রগতিশীল চিন্তাধারার শিক্ষার্থীরা কলেজ ছাত্রাবাসে সমবেত হন। সিদ্ধান্ত হয়, ইট-মাটি দিয়ে রাতেই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হবে।

৩৫ একর জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটির ঝুলিতে অপ্রাপ্তির তুলনায় প্রাপ্তিই বেশি

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাতেই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু পরদিন সকালে পাকিস্তানি বাহিনী সেটি গুঁড়িয়ে দেয়। ভাষা আন্দোলনের সেই অধ্যায় আজও রাজশাহী কলেজের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।

ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন

সময়ের সঙ্গে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গেও নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে রাজশাহী কলেজ। প্রতিটি বিভাগে চালু করা হয়েছে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম। শিক্ষকদের দেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ল্যাপটপ। গবেষণা ও তথ্য বিনিময়ে বহির্বিশ্বের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগের জন্য রয়েছে ওয়াই-ফাই সুবিধা।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় শ্রেণিকক্ষ, প্রবেশমুখসহ গুরুত্বপূর্ণ ফটকগুলো সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। প্রায় তিন লাখ বইয়ের সংগ্রহ নিয়ে রয়েছে বিশাল গ্রন্থাগার। পুরোনো দিনের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের পাশাপাশি সেখানে রয়েছে প্রয়োজনীয় আধুনিক বইও।

শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে রয়েছে পঞ্চাশের বেশি সহশিক্ষা সংগঠন। এর মধ্যে রয়েছে রাজশাহী কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটি (আরসিআরইউ), রোভার স্কাউট, বিএনসিসি, বিতর্ক ক্লাব, রেঞ্জার গাইড, বিজ্ঞান ক্লাব, ক্যারিয়ার ক্লাব, বিজনেস ক্লাব, সংগীত অ্যাকাডেমি, নৃত্যচর্চা কেন্দ্র, বাঁধন, বরেন্দ্র থিয়েটার, অন্বেষণ, নাট্য সংসদ, আবৃত্তি পরিষদ, ফটোগ্রাফি ক্লাব, রোটার‌্যাক্ট ক্লাব, এথিক্স ক্লাব, প্রেজেন্টেশন ক্লাব, ক্রিয়েটিভ ক্লাব, ইনোভেশন ক্লাব ও রেড ক্রিসেন্ট। প্রতিটি বিভাগেও রয়েছে স্বতন্ত্র ক্লাব।

‘সুস্থ দেহ, সুস্থ মন’ ধারণাকে সামনে রেখে রয়েছে ব্যায়ামাগার। শিক্ষার্থীরা সেখানে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য নানা অনুশীলন করেন। নামাজের জন্য রয়েছে দ্বিতল মসজিদ। নগরীর বাইরের শিক্ষার্থীদের জন্য ছাত্রাবাস ও ছাত্রীনিবাস এবং যাতায়াতের জন্য রয়েছে পরিবহন ব্যবস্থা।

পাঁচ শতাধিক কম্পিউটার সম্বলিত ‘রাজশাহী কলেজ ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব’ও রয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক কম্পিউটার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আউটসোর্সিং ও বিভিন্ন প্রোগ্রামিংয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বিভিন্ন বিভাগেও রয়েছে আলাদা ল্যাব।

‘রাজশাহী কলেজ একটা মহাকাব্য’

কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী আফসানা রহমান বলেন, “দূর থেকে রাজশাহী কলেজকে একটা ছোট গল্প মনে হলেও রাজশাহী কলেজ একটা মহাকাব্য। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতি বছর কলেজের হাজার হাজার শিক্ষার্থী তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে পৃথিবীর কল্যাণে নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। তাতে কলেজের ইতিহাসের পাতা বাড়ে আর আমরা তা শুনে স্বস্তি পাই।”

আজ দেশসেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে রাজশাহী কলেজ

তিনি আরও বলেন, “৩৫ একর আয়তনের এই লাল-সবুজের জগতে যখনই প্রবেশ করি মনে হয় স্বর্গে প্রবেশ করেছি। মনের সকল বিষণ্নতা, ক্লান্তি, অবসাদ দূর হয় এ স্বর্গে প্রবেশের মাধ্যমে। আর স্বর্গ নামকরণে তো একটিমাত্র কারণ হতে পারে না।”

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল আলিম বলেন, “আমার চোখে রাজশাহী কলেজের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ঐতিহ্য নয়, বরং ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা। পুরোনো স্থাপত্যের পাশে আধুনিক প্রযুক্তি, ইতিহাসের পাশে নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন এবং অতীতের গৌরবের সঙ্গে ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রত্যয়ই রাজশাহী কলেজকে আলাদা করেছে।”

তিনি বলেন, “প্রজন্মের পর প্রজন্ম এখানে এসেছে, নিজেকে তৈরি করেছে, তারপর পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু তাদের হৃদয়ে রাজশাহী কলেজ থেকে গেছে একইভাবে। রাজশাহী কলেজের ইতিহাস যত পুরোনো হচ্ছে, তার দায়িত্বও তত বাড়ছে। অতীতের গৌরবকে স্মরণ করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের জন্য আরও জ্ঞাননির্ভর, মানবিক ও সৃজনশীল একটি শিক্ষাঙ্গন তৈরি করাই হওয়া উচিত আগামী দিনের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার। কারণ ইতিহাস শুধু স্মরণ করার বিষয় নয়, ইতিহাস থেকে ভবিষ্যৎ নির্মাণের শক্তিও নিতে হয়।”

১৫০ বছর পেরিয়ে নতুন আয়োজন

রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মো. ইব্রাহিম আলী বলেন, “আমি রাজশাহী কলেজ থেকে পড়াশোনা করেছি। যার ফলে আমার এটি একটা অসাধারণ অনুভূতি আছে।”

তিনি বলেন, “১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী কলেজ ইতোমধ্যে ১৫০ বছর অতিক্রম করেছে। এই ১৫০ বছর অতিক্রমের আয়োজনটি বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী এবং রাজশাহী শহরবাসীর জন্য গর্ব ও ভালো লাগার বিষয়। যারা রাজশাহী কলেজকে ধারণ করেন, লালন করেন এবং কলেজকে নিয়ে অহংকার করেন, নিঃসন্দেহে তাদের কাছেও এই আয়োজন ভালো লাগবে।”

অধ্যক্ষ আরও বলেন, “রাজশাহী কলেজের এই বৃহৎ আয়োজনে বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থী, প্রাক্তন শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডার স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেবেন বলে আমরা আশা করছি। একই সঙ্গে সবার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।”

তিনি বলেন, “এটা একটা বড় অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে যেমন আমাদের বৃহৎ খরচের ব্যাপার আছে, তেমনি এখানে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং এটাকে সুষ্ঠুভাবে সম্পূর্ণ করার জন্য অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। আমরা আশা করব যে আমার সমস্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ নগরবাসী অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে সার্বিক সহযোগিতা করবে।”

প্রফেসর ইব্রাহিম আলী আরও বলেন, “রাজশাহী কলেজ ঐতিহ্যবাহী একটি কলেজ। এই কলেজের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যারা শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, তারা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কাজ করছেন। জাতিখ্যাত বহু ব্যক্তিত্ব এই কলেজে পড়াশোনা করেছেন এবং দেশের অনেক বড় বড় জায়গায় তারা কাজ করছেন।”

তিনি বলেন, “আমরা আশা করব যে এই ১৫০ বছর পূর্তিতে আমাদের বর্তমান প্রজন্মের কাছে যে ধরনের প্রত্যাশা এবং যে ধরনের তারা প্রাপ্তি আশা করে, সেগুলো আমরা পূরণ করতে পারব। আমরা এখানে শুধুমাত্র একটা অনুষ্ঠান করব না। এখানে আমাদের কিছু লক্ষ্য আছে, উদ্দেশ্য আছে। যে লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যগুলো যদি আমরা পূরণ করতে পারি, তাহলে আমাদের বর্তমান শিক্ষার্থী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই অনুষ্ঠান থেকে উপকৃত হবে এবং এটা একটি স্মরণীয় অনুষ্ঠান হবে।”

রেজিস্ট্রেশনে সিনিয়র অ্যালামনাসদের আগ্রহ

অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মো. ইব্রাহিম আলী জানান, “অনুষ্ঠানটির রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম এখনো সেভাবে বেগবান হয়নি। তবে রেজিস্ট্রেশনের জন্য এখনো সময় রয়েছে। এরই মধ্যে অনেকে আগ্রহ নিয়ে রেজিস্ট্রেশন করছেন। বিশেষ করে অনেক সিনিয়র অ্যালামনাস সরাসরি এসে রেজিস্ট্রেশন করছেন।”

আধুনিক রাজশাহী কলেজের রূপকার

রাজশাহী কলেজের সাম্প্রতিক সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন সাবেক অধ্যক্ষ মোহা. হবিবুর রহমান। তাঁর নেতৃত্বে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনেও টানা চারবার দেশসেরা হওয়ার স্বীকৃতি পায় কলেজটি। তাঁকে আধুনিক রাজশাহী কলেজের রূপকার হিসেবেও অভিহিত করা হয়।

তিনি ২০১৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ২৮টি সূচকে ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা চারবার সেরা হয় রাজশাহী কলেজ। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি পায় মডেল কলেজের স্বীকৃতিও।

পদ্মা নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত কলেজটি ঢাকা ও চট্টগ্রাম কলেজের পর বাংলাদেশের তৃতীয় প্রাচীনতম কলেজ

কলেজটির ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী কাওসার আহমেদ বলেন, “আমরা যেসময় কলেজ অধ্যয়ন করেছি, তখন তেমন উন্নতি দেখিনি। এতে করে মন খারাপ হতো। কারণ একই শহরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যাম্পাস নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করত। আমরা অধ্যক্ষ হাবিবুর রহমানকে পাইনি। কিন্তু তাঁর মেয়াদে রাজশাহী কলেজ অনেক বদলে গেছে।”

তিনি বলেন, “এতে করে পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখানোর যে প্রেরণা, সেটা হয়তো অন্য কলেজগুলোর চেয়ে ভিন্ন। এ কারণেই আমাদের কলেজ স্বতন্ত্র একটি জায়গা পেয়েছে। আর এক্ষেত্রে রাজশাহী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মোহা. হবিবুর রহমানের প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দক্ষতা প্রশংসনীয়ই শুধু নয়, অনুকরণীয়।”

সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহা. হাবিবুর রহমান বলেন, “যেকোনও কাজের প্রতি ভালোবাসা, একাগ্রতা, সততা ও স্বচ্ছতা থাকতে হয়। আমি সেটা করার চেষ্টা করেছি। রাজশাহী কলেজের সার্বিক উন্নতির জাদু সম্পর্কে অনেকেই জানতে চান। এক কথায় বলতে গেলে, আমরা শিক্ষার্থীদের ইতিবাচকভাবে বদলে যেতে দেখেছি। আমরা শিক্ষার্থীদের সুযোগ করে দিয়েছি, প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছি, যা অনেক প্রতিষ্ঠানই পারেনি।”

১৫৩ বছরের পথচলায় নতুন প্রজন্ম

১৮৭৩ সালে ৩৫ একর জায়গাজুড়ে যাত্রা শুরু করা রাজশাহী কলেজ এখন ২৪টি বিভাগে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়ে এগিয়ে চলছে। প্রায় দেড় শতাব্দীর বেশি সময় ধরে তৈরি হওয়া এই প্রতিষ্ঠান শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী একটি শিক্ষাঙ্গন নয়; এর লালরঙা ভবন, আন্দোলন-সংগ্রামের স্মৃতি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গৌরবময় ইতিহাস এবং আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয়ই রাজশাহী কলেজকে দিয়েছে আলাদা পরিচয়।

সময়ের সঙ্গে ভবন বদলেছে, প্রযুক্তি এসেছে, শিক্ষার ধরন বদলেছে; কিন্তু পদ্মার তীরের এই লাল-সবুজ ক্যাম্পাসে ইতিহাসের সেই আবহ এখনো রয়ে গেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্মের পদচারণায় রাজশাহী কলেজ তাই শুধু অতীতের স্মৃতি নয়—নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও এক চলমান গল্প।  

/এএম/ 
সম্পর্কিত
১৩৬ বছরে ‘বাংলার অক্সফোর্ড’, কীভাবে শুরু হয়েছিল যাত্রা?
১১০ বছর ছড়াচ্ছে মুগ্ধতা, কারমাইকেল কলেজে কারা পড়েছে জানেন?
ব্রজসুন্দরী দেবীর দত্তকপুত্রের হাতে গড়া আসাম প্রদেশের প্রথম কলেজ এটি
সর্বশেষ খবর
‘সহনীয়’ পর্যায়ে আজ ঢাকার বাতাস
‘সহনীয়’ পর্যায়ে আজ ঢাকার বাতাস
নৌকার ছন্দে আবিষ্কার করুন রাতারগুলের সৌন্দর্য
নৌকার ছন্দে আবিষ্কার করুন রাতারগুলের সৌন্দর্য
ব্যবহারকারীদের তথ্য গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনে গুগলকে বড় জরিমানা
ব্যবহারকারীদের তথ্য গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনে গুগলকে বড় জরিমানা
৫০০ জনকে নিয়োগ দেবে আড়ং, এইচএসসি পাসেই আবেদন
৫০০ জনকে নিয়োগ দেবে আড়ং, এইচএসসি পাসেই আবেদন
সর্বাধিক পঠিত
রাশিয়ার নির্বাচনে আবারও জয়ী পুতিন, কত ভোট পেলেন
রাশিয়ার নির্বাচনে আবারও জয়ী পুতিন, কত ভোট পেলেন
রুপির বিপরীতে কেন এত শক্তিশালী হলো টাকা?
রুপির বিপরীতে কেন এত শক্তিশালী হলো টাকা?
‘নিজেকে শেষ করার’ আগে চিরকুটে কষ্টের কথা লিখে গেছেন মরিয়ম
‘নিজেকে শেষ করার’ আগে চিরকুটে কষ্টের কথা লিখে গেছেন মরিয়ম
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটির তালিকা সংশোধন করে প্রজ্ঞাপন
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটির তালিকা সংশোধন করে প্রজ্ঞাপন
১০ কোটি টাকার সেতুতে রডের বদলে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ঢালাই, তাও রাতের বেলায়
১০ কোটি টাকার সেতুতে রডের বদলে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ঢালাই, তাও রাতের বেলায়