উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী ও অন্যতম বৃহৎ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ ৮৭ বছর ধরে এ অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসছে। প্রখ্যাত বহুভাষাবিদ ও ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং বিশিষ্ট সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো পণ্ডিত ব্যক্তিরা এই কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পারফরম্যান্স র্যাঙ্কিংয়েও একাধিকবার দেশের সেরা ও আঞ্চলিক পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ কলেজের স্বীকৃতি পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী, শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষের স্বল্পতা, আবাসন ও পরিবহনসহ নানা সমস্যাও রয়েছে ঐতিহ্যবাহী এ বিদ্যাপীঠে। বন্ধ হয়ে থাকা আবাসিক হলগুলো চালু এবং বিদ্যমান সংকট সমাধানে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টরা।
যেভাবে যাত্রা
বগুড়ায় একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয় ১৯৩৮ সালের ৪ এপ্রিল। এ উদ্দেশ্যে গঠিত কমিটির সভাপতি ছিলেন খান বাহাদুর মোহাম্মদ আলী এমএলএ এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মৌলভী আবদুস সাত্তার। তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন শিক্ষানুরাগী ও সমাজহিতৈষী ব্যক্তি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৩৯ সালের ৯ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে কলেজটি। প্রথমদিকে এর নাম ছিল ‘বগুড়া কলেজ’। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য স্যার এম. আজিজুল হকের সম্মানে পরে এর নাম রাখা হয় আজিজুল হক কলেজ।
প্রথমদিকে কলেজে ইন্টারমিডিয়েট অব আর্টস (আইএ) শ্রেণি চালুর অনুমতি ছিল। প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হয় শিক্ষা কার্যক্রম। প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন ড. এম. এম. মুখার্জি। স্থায়ী ভবন প্রস্তুত না থাকায় প্রথমদিকে বগুড়া মহানগরীর সুবিল প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনে ক্লাস নেওয়া হতো। প্রায় দুই বছর পর কলেজের কার্যক্রম ফুলবাড়ি বটতলা এলাকায় স্থানান্তর করা হয়।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতক ও সম্মান কোর্স চালু হয়। ১৯৪৩ সালে কলেজে ছাত্রী ভর্তি শুরু হয়। ১৯৪৫-৪৬ শিক্ষাবর্ষে বাংলা ও আরবি বিষয়ে সম্মান কোর্সসহ আরও কিছু শিক্ষাক্রম চালু করা হয়। দীর্ঘদিন বেসরকারিভাবে পরিচালিত হওয়ার পর ১৯৬৮ সালের ১৫ এপ্রিল কলেজটি সরকারীকরণ করা হয়। এরপর প্রতিষ্ঠানটি উত্তরবঙ্গের উচ্চশিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
দুই ক্যাম্পাসে ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী
বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক, সম্মান ও স্নাতকোত্তর মিলিয়ে সরকারি আজিজুল হক কলেজে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। তাদের পাঠদানের জন্য মঞ্জুরিকৃত ক্যাডার কর্মকর্তা ও শিক্ষক রয়েছেন প্রায় ১৯০ জন। অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষকরা বিভিন্ন বিভাগে পাঠদান করছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বর্তমানে ২৩টি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্স পরিচালিত হচ্ছে।
কলেজটির রয়েছে দুটি ক্যাম্পাস। বগুড়া মহানগরীর ফুলবাড়ি এলাকায় প্রায় চার একর জমির পুরোনো ক্যাম্পাসে উচ্চমাধ্যমিকের পাঠদান হয়। আর কামারগাড়ি এলাকায় প্রায় ৫৫ একর জমির নতুন ক্যাম্পাসে ডিগ্রি, সম্মান ও মাস্টার্সের পাঠদান পরিচালিত হয়। দীর্ঘ আট দশকে এ প্রতিষ্ঠান থেকে বহু শিক্ষাবিদ, গবেষক, আমলা ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়েছেন।
সাফল্যের ধারাবাহিকতা
তাত্ত্বিক পাঠদানের পাশাপাশি বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ১৮টি গবেষণাগার। আছে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ ও সমৃদ্ধ কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। বিশেষায়িত ল্যাবরেটরিতে ব্যবহারিক ক্লাসও নেওয়া হয়।
ফলাফলেও রয়েছে সাফল্যের ধারাবাহিকতা। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলে প্রতিবছরই কলেজটির শিক্ষার্থীরা শীর্ষস্থান ধরে রাখেন। গত বছরের মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে প্রায় ১০০ শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। নিয়মিত পাঠদান, অভিজ্ঞ শিক্ষকদের তত্ত্বাবধান এবং শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক পরিশ্রমের ফলেই এসব সাফল্য এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
৩৫ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১৯০ শিক্ষক
এত বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলেও শিক্ষক ও অবকাঠামো সংকট রয়েছে। প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১৯০ জন শিক্ষক থাকায় গড়ে একজন শিক্ষককে প্রায় ১৮৪ জন শিক্ষার্থীর পাঠদানের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। বড় বিভাগগুলোর শ্রেণিকক্ষেও শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে ক্লাস করতে হয়।
আবাসন সংকটও প্রকট। কলেজ প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে কলেজের আবাসিক হল রয়েছে ছয়টি—ছাত্রদের চারটি ও ছাত্রীদের দুটি। নতুন ছাত্রীনিবাসে ৮০ জনের থাকার সুযোগ রয়েছে। পুরোনো বেগম রোকেয়া ছাত্রীনিবাসে ২৫০টি আসনের বিপরীতে থাকছেন প্রায় ৪৫০ ছাত্রী।
পুরোনো ক্যাম্পাসে চালু থাকা ফখরুদ্দীন আহমদ হলে ১০০টি আসন রয়েছে। সেখানে উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা থাকেন।
অন্যদিকে ছাত্রদের তিনটি হল দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। ২০০৯ সালে ছাত্রশিবির ও তৎকালীন কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের পর শের-ই-বাংলা, শহীদ তিতুমীর ও শহীদ আকতার আলী মুন ছাত্রাবাস বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি হল সংস্কার করা হলেও সেগুলো আজও চালু হয়নি।
তিনটি ছাত্র হলে মোট ২১৬টি আসন ছিল। ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে মেস, বেসরকারি ছাত্রাবাস ও অন্যান্য আবাসনে থাকতে হচ্ছে। কলেজের আবাসিক হলে জনপ্রতি মাসিক ভাড়া ১৬৬ টাকা হলেও মেসে একজন শিক্ষার্থীকে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন।
ক্যাম্পাসেও বহিরাগতদের উপদ্রব
নতুন ক্যাম্পাসের সীমানাপ্রাচীর পুরোপুরি না থাকায় বহিরাগতদের উপদ্রবের অভিযোগও রয়েছে। বিকাল ও সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের আড্ডা দিতে দেখা যায় বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন। এতে মাঝেমধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর যাতায়াতের জন্য কলেজের নিজস্ব বাসও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে অনেক শিক্ষার্থীকে পাবলিক পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হয়।
বন্ধ হলগুলো সরকারি সম্পদের অপচয়
সুশাসনের জন্য নাগরিকের বগুড়া জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, ‘সরকারি আজিজুল হক কলেজে তিনটি আবাসিক হল যৌক্তিক কারণ ছাড়াই বছরের পর বছর বন্ধ রাখা হয়েছে। হলগুলো অযত্ন-অবহেলায় বন্ধ থাকা শুধু প্রশাসনের ব্যর্থতা নয়; সরকারি সম্পদেরও অপচয়। অবিলম্বে কলেজের বন্ধ হলগুলো চালু করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
প্রতিষ্ঠানটি আরও শিক্ষার্থীবান্ধব হোক
কলেজের দর্শন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বর্তমানে ধুনট সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর একেএম সোলায়মান হোসেন জানান, উত্তরবঙ্গ তথা সারা দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানটি নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে। এখান থেকে পাস করে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী দেশে-বিদেশে তাদের মেধার সর্বোচ্চ স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান হয়ে এটি আরও শিক্ষার্থীবান্ধব হয়ে উঠুক—এটাই প্রত্যাশা।
বন্ধ তিন হল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে
বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মাহফুজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও আমাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা দেশে-বিদেশে মেধার আলো ছড়িয়ে আসছে।’
বন্ধ থাকা তিনটি ছাত্রাবাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শিগগিরই এ ব্যাপারে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।’
অধ্যক্ষ আরও বলেন, ‘উত্তরবঙ্গের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী সরকারি আজিজুল হক কলেজের গৌরব ধরে রাখতে পর্যায়ক্রমে কলেজের সমস্যাগুলোর সমাধান করা হবে।’









