২০২১ সালে রংপুরে দুটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে একটি হলো ফেসবুকে ধর্মীয় অবমাননাকর পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে পীরগঞ্জে হিন্দুপাড়ায় ৩৫টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে মালামাল লুটপাট। অপরটি হলো হারাগাছ থানায় মাদক ব্যবসায়ী সন্দেহে এক যুবককে আটক করে হাতকড়া পরিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ। দুটি ঘটনা বছরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
হিন্দুপাড়ায় তাণ্ডবের ঘটনায় চারটি মামলা করা হয়েছিল। কিন্তু আড়াই মাসেও কোনও মামলার চার্জশিট দিতে পারেনি পুলিশ। আদৌ এই ঘটনার বিচার হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পীরগঞ্জের বড়করিমপুর কসবা মাঝিপাড়ার এক যুবক ফেসবুকে কাবা শরিফের ছবি পোস্ট করে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। এ ঘটনার জেরে ১৬ অক্টোবর রাতে রামনাথপুর ইউনিয়নের তিনটি হিন্দু গ্রামে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এ সময় হিন্দুদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো হয়। অগ্নিকাণ্ডে ৩৫টি বাড়িঘর পুড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৬৬টি পরিবার।
ঘটনার পর জাতীয় সংসদের স্পিকার ও রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য শিরীন শারমিন চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন। পরে সরকারি উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারের বাড়িঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে দেওয়া হয় আর্থিক সহায়তা।
মামলা, গ্রেফতার ও রিমান্ড:
হামলার পরপরই ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া পরেশ চন্দ্র ও তার দুই বন্ধু আল আমিন এবং উজ্জলকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তিন জনই আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাণ্ডবের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছে। পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আরও তিনটি মামলা করা হয়।
পুলিশ জানায়, হামলার নেতৃত্ব দেন রংপুর কারমাইকেল কলেজের দর্শন বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণির ছাত্র ও ওই বিভাগের ছাত্রলীগের কমিটির ১ নম্বর সহ-সভাপতি এসএম সৈকত মণ্ডল (২৪)। তাকে গ্রেফতারের পর ১৮ অক্টোবর ছাত্রলীগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী থানা শিবির নেতা রবিউলকে গ্রেফতার করা হয়। তারা আদালতে জবানবন্দি দেন।
এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৭৭ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে বেশির ভাগ গ্রেফতারকৃতকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে চার জন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। এখনও গ্রেফতার অভিযান অভিযান চলছে বলে জানায় পুলিশ।
পুলিশের বিরুদ্ধে নিরীহদের গ্রেফতারের অভিযোগ:
হিন্দুপাড়ায় তাণ্ডবের ঘটনায় পুলিশ ২০ নিরাপরাধ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্বজনদের অভিযোগ, গ্রেফতারকৃতদের বেশির ভাগই ঘটনার সময় বাড়িতে ছিল না। বিভিন্ন স্থানে কর্মরত ছিল। বাড়িতে আসার পর তাদের গ্রেফতার করে এসব মামলায় চালান দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার ও রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য শিরীন শারমিন চৌধুরীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। এরপর গ্রেফতার অভিযান বন্ধ হয়।
তদন্ত কমিটি:
পীরগঞ্জের হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা তদন্তে পৃথক দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। একটি কমিটি গঠন করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও অপরটি জেলা প্রশাসন। এই দুই কমিটির সদস্যরা নিজ নিজ দফতরে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলেও তা প্রকাশ করেনি মানবাধিকার কমিশন ও জেলা প্রশাসন। তবে দুই তদন্ত কমিটির প্রধান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ঘটনার সত্যতা পেয়েছেন তারা।
পুলিশের বক্তব্য ও সর্বশেষ অবস্থা:
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পীরগঞ্জ থানার ওসি সরেশ চন্দ্র বলেন, এখনও ঘটনার তদন্ত চলছে। মামলার চার্জশিট দেওয়ার এখনও সময় হয়নি। তদন্ত শেষে চার্জশিট দেওয়া হবে। তবে কোনও নিরীহ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়নি। এমনকি গ্রামবাসীকে হয়রানি করা হয়নি।
হারাগাছ থানায় পুলিশি নির্যাতনে যুবকের মৃত্যু:
গত ৩ ডিসেম্বর হারাগাছের নতুন বাজার পাকার মাথা এলাকায় পুলিশের নির্যাতনে তাজুল ইসলাম নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হারাগাছ পৌর এলাকায় গভীর রাত পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে গ্রামবাসীর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে পুলিশসহ ৬০ জন আহত হন। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনতা হারাগাছ থানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শতাধিক রাউন্ড রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, তাজুল ইসলাম মাদকসেবী ও ব্যবসায়ী। মাদকবিরোধী অভিযানে তাকে আটক করে পুলিশ। পরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়। তাকে নির্যাতন করা হয়নি। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে দুটি মামলা করেছে। এর মধ্যে তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা করা হয়। অপরটি থানায় হামলা ভাঙচুরসহ তাণ্ডবের ঘটনায়। এই মামলায় শতাধিক অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।
ঘটনাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ:
এ ঘটনায় হাইকোর্টে রিট করেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। ৮ ডিসেম্বর বিচারপতি মামনুন রহমান ও বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ ঘটনাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন।
একই সঙ্গে রংপুরের জেলা ও দায়রা জজকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন- জেলা প্রশাসকের একজন প্রতিনিধি ও রংপুর পুলিশ কমিশনারের একজন প্রতিনিধি। ১৫ দিনের মধ্যে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলা হয়। কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে এই বিষয়ে এখনও কোনও আদেশ দেননি হাইকোর্ট।
এ ব্যাপারে হারাগাছ থানার ওসি রেজাউল করিম বলেন, পুরো বিষয়টি হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের ওপর রয়েছে। তবে এই ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।








