সিস্টেমের ‘বলি’ ৩৪ শিশু শিক্ষার্থী

আরিফুল ইসলাম রিগান, কুড়িগ্রাম
৩১ ডিসেম্বর ২০২২, ২২:৫২আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২২, ২২:৫২

‘আমি তো কম্পিউটারের কিছু বুঝি না। দোকানদারকে কইছি, সে ফরম পূরণ করে দিছিল। চারটা আবেদন করে দিছে। ছেলে লটারিতে টিকছে। ভর্তির টাকাও জমা দিছি। এখন স্কুল কইতেছে ভর্তি হবে না। এই কথা শুনে ছেলে কাঁদতে কাঁদতে আমারে কয়, তুমি ক্যান এমন করে আবেদন করলা? আমি কোনও উত্তর দিতে পারতেছি না।’ 

ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির ডিজিটাল লটারিতে নির্বাচিত হলেও এখন ভর্তি করতে না পারার সিদ্ধান্তে এভাবে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান কুড়িগ্রাম সদরের এক অভিভাবক। পেশায় হোটেল ব্যবসায়ী এই অভিভাবকের ছেলে এ বছর ভর্তি ‘যুদ্ধের’ ডিজিটাল লটারিতে কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছিল। কিন্তু একই পছন্দক্রমে একাধিক আবেদন করায় তার ভর্তির সুযোগ বাতিল করেছে কর্তৃপক্ষ।

শুধু এই অভিভাবকের সন্তান নয়, এ বছর লটারিতে মেধা তালিকায় স্থান পাওয়া কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তিচ্ছু ৩৪ শিশু শিক্ষার্থীর ভর্তির সিদ্ধান্ত বাতিল ঘোষণা করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানা গেছে। 

এই শিশুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা নির্দেশনা অমান্য করে একই পছন্দক্রমে একাধিক আবেদন করেছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা বলছে, তারা নিজেরা কোনও আবেদন করেনি। তাদের পক্ষে অভিভাবকরা আবেদন করেছিলেন।

এর আগে গত ১৯ ডিসেম্বর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (মাধ্যমিক-১) দূর্গা রানী সিকদার স্বাক্ষরিত এক পত্রে মাউশির ১৪ ডিসেম্বরের একটি স্বারকের বরাতে বলা হয়, ‘কোনও আবেদনকারী তথ্য পরিবর্তন করে একাধিক আবেদন করে থাকলে ডিজিটাল লটারিতে তার ভর্তির নির্বাচন বাতিল বলে গণ্য হবে। কেননা ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে একই পছন্দক্রমে একাধিক আবেদন করা যাবে না মর্মে উল্লেখ ছিল।’

নির্বাচিত হওয়ার পরও ভর্তির সুযোগ বঞ্চিত ভুক্তভোগী শিশুদের অভিভাবকরা বলছেন, সফটওয়্যারেই একাধিক আবেদনের সুযোগ রাখা হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে একই পদ্ধতিতে একাধিক আবেদন করে অনেক শিক্ষার্থী লটারির মাধ্যমে ভর্তি হয়েছিল। ভর্তির আবেদনের সরকারি সফটওয়্যারে একাধিক আবেদনের সুযোগ না রাখলে কেউ এটা করতে পারতেন না। লটারির আগে এসব আবেদন বাতিল করে ফল ঘোষণা করলে এই পরিস্থিতি তৈরি হতো না। নির্বাচিত হওয়ার পর শিশুরা খুশি হয়ে সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করেছে। অনেকে স্কুলের পোশাকও তৈরি করেছে। এর মধ্যে ভর্তির সিদ্ধান্ত বাতিল করায় শিশুদের মনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

জেলা সদরের পুরাতন শহরের একাধিক অভিভাবক বলেন, ‘আবেদন তো আমাদের সন্তানরা করেনি। আমরা বিভিন্ন কম্পিউটারের দোকান থেকে আবেদন করেছি। দোকানদাররাই একাধিক আবেদন করার ব্যবস্থা করেছেন। আমরা এসব কৌশল জানিও না। এটা ভুল হয়ে থাকলে লটারির আগেই বাছাই করে বাদ দিতে পারতো। এখন লটারি করে নির্বাচিত হওয়ার পর এভাবে ভর্তির সিদ্ধান্ত বাতিল করায় সন্তানদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেলো। শিশুরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

আরেক অভিভাবক বলেন, ‘সরকারের সিস্টেমে একাধিক আবেদনের সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকার যদি এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে তাহলে আগে জানালে হতো। আমাদের কাছ থেকে স্কুল কর্তৃপক্ষ ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভর্তির টাকা জমা নিয়েছে। এখন গত বুধবার (২৮ ডিসেম্বর) আমাদের ডেকে বলা হচ্ছে, ভর্তি হবে না, টাকা ফেরত নিয়ে যান। আমরা অনেকে সন্তানদের স্কুলের পোশাকও তৈরি করেছি। এখন ভর্তি না হলে শিশুরা মানসিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কর্তৃপক্ষকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করছি।’

কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক বলেন, ‘লটারির মাধ্যমে ভর্তির আবেদনের সিস্টেমের বলি হচ্ছে এই শিশুরা। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এর দায় এড়াতে পারে না। কিন্তু তাদের সঙ্গে তো কথা বলার সুযোগ নেই। আপনারা তাদের প্রশ্ন করুন। এখানে শিশু শিক্ষার্থীদের অপরাধ কোথায়? এটা ডিজিটাল লটারির নামে প্রহসন।’

এই শিক্ষকরা আরও বলেন, ‘সরকার সবকিছু ডিজঅর্ডার করছে। জন্মসনদ ডিজিটাল করার পরও এনালগ ও ডিজিটাল উভয় সনদই কার্যকর রয়েছে। ফলে দুটি সনদ দিয়েই একাধিক আবেদন করা গেছে। একইভাবে বাবা-মায়ের এনালগ এনআইডির সঙ্গে স্মার্ট আইডির নম্বর দিয়েও আবেদন গ্রহণ হয়েছে। ফলে ডব্লুকেসি করার সুযোগ সিস্টেমেই রাখা হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন, ডিজিট পরিবর্তন অথবা ডিজিট কম করে দিয়ে আবেদন করলে তা গৃহীত হলো কেন? লটারির আগেই এসব আবেদন বাছাই করে বাতিল করলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।’

অভিভাবকদের সমালোচনা করে শিক্ষকরা বলেন, ‘এখন তো মানুষের মরালিটি নাই। সন্তানকে ভর্তি করতে গিয়ে প্রথমে তারা (অভিভাবকরা) ডব্লুকেসির আশ্রয় নিচ্ছেন। তাহলে ওই সন্তানরা কি শিখবে?’

জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জিয়াসমিন আরা হক বলেন, ‘সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা একই পছন্দক্রমে একাধিক আবেদন করে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের ভর্তি না করে তাদের টাকা ফেরত দিয়ে দিচ্ছি। নির্দেশনার বাইরে আমাদের কিছুই করার নেই।’

/এএম/
সম্পর্কিত
আদাবরে ঢাবি শিক্ষার্থী অপহরণের ঘটনায় গ্রেফতার ৯
কেনিয়ায় বালিকা বিদ্যালয়ের হোস্টেলে আগুন, ১৬ ছাত্রীর মৃত্যু
শিক্ষার্থীর আত্মহত্যাহামলার শিকার ব্রাইট স্কুলের চেয়ারম্যান, ঢামেকে ভর্তি
সর্বশেষ খবর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম