X
শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪
৬ বৈশাখ ১৪৩১
দিনাজপুরের ১৮ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র

কেটেছে ভাষাগত সমস্যা, এগিয়ে যাচ্ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা

বিপুল সরকার সানি, দিনাজপুর
০১ মার্চ ২০২৪, ১০:০১আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৪, ১০:০১

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের শিক্ষাগ্রহণে প্রধান সীমাবদ্ধতা ছিল ভাষাগত। বাংলা না জানায় বিদ্যালয়ে এসে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে পারতো না। ফলে একদিকে ফল খারাপ হতো অন্যদিকে বাঙালি শিশুদের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে সমস্যায় পড়তে হতো। এ অবস্থায় মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ছিটকে পড়তো তারা। এবার কেটে গেছে ভাষাগত সমস্যা, এগিয়ে যাচ্ছে দিনাজপুরের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা। 

সদরের ১৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দিন দিন বাড়ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীর সংখ্যা। ফলের দিক দিয়েও ভালো করছে তারা। এসব বিদ্যালয়ে তাদের জনগোষ্ঠীর শিক্ষক রাখায় এমন পরিবর্তন হয়েছে। যারা নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষার পাশাপাশি বাংলা পাঠ্যপুস্তক বাংলায় তাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন। এজন্য চিত্রটা ভিন্ন।

সদরের নশিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ৪৩ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। এর মধ্যে বাঙালি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ১ থেকে ১০ রোল নম্বরের মধ্যে রয়েছে দুজন। ১১ থেকে ২০ রোল নম্বরের মধ্যে আছে ছয় জন। অথচ ২০১১ সালে এই বিদ্যালয়ে তাদের এমন অবস্থা ছিল না। ওই বছর বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল সাত জন। যারা ছিল পিছিয়ে। রোল নম্বর ছিল ৩০-এর বাইরে।

শুধু এই বিদ্যালয় নয়, সদরের আরও ১৭ বিদ্যালয়ের চিত্র ছিল এমন। বর্তমানে এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। ক্লাসের রোল নম্বরেও এগিয়ে গেছে তারা। নিজস্ব জনগোষ্ঠীর শিক্ষক পাঠদান করায় এসব শিক্ষার্থী এগিয়ে গেছে বলে জানা গেছে। সেইসঙ্গে বেড়েছে পড়াশোনায় আগ্রহ।

জেলা শিক্ষা অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরের ব্যবধানে এই ১৮ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। ১ থেকে ১০ রোলও হয়েছে দ্বিগুণ। ২০১১ সালে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৩৩ জন, ২০২৩ সালে ৩০২ জনে দাঁড়িয়েছে। ১ থেকে ১০ম স্থানের সংখ্যা ছিল ৩৪ জন, ২০২৩ সালে হয়েছে ৬৭ জন।

সদরের সুবরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী ২৩, ২০১১ সালে ছিল ৯ জন, কর্নাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৩, আগে ছিল দুজন, পূর্ব খোসালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪০, আগে ছিল ১০ জন, পশ্চিম খোসালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৬, আগে ছিল পাঁচ জন, বেলবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৮, আগে ছিল ছয় জন, পরশুরাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩১, আগে ছিল ১৫ জন, মহারাজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৯, আগে ছিল ছয় জন, শিবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১২, আগে ছিল চার জন, পাঁচবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১০, আগে ছিল সাত জন, কাশিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১১, আগে ছিল তিন জন, চেরাডাঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১২, আগে ছিল চার জন, মহাব্বতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১০, আগে ছিল একজন, বারাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১১, আগে ছিল ১১ জন, মুরাদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৮, আগে ছিল ছয় জন, গোদাগাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫, আগে ছিল সাত জন এবং চকগোপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৪ জন, যা আগে ছিল ছয় জন।

নিজস্ব জনগোষ্ঠীর শিক্ষক পাঠদান করায় এসব শিক্ষার্থী এগিয়ে গেছে

নশিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, বাঙালি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে বসে একসঙ্গে পাঠগ্রহণ করছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা। এসব শিক্ষার্থী এখন ভালো ফল করে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

আগে বাংলা ভাষা বুঝতাম না, এখন বাংলায় কথা বলতে পারি জানিয়ে এই বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী জেমস ময়ুক হাসদা জানায়, বিদ্যালয়ে আমাদের জনগোষ্ঠীর একজন ম্যাডাম আছেন, তিনি আমাদের সব পড়া ও ভাষা বুঝিয়ে দেন। এতে পড়াশোনা সহজ হয়ে গেছে আমাদের। মাতৃভাষার পাশাপাশি বাংলা লিখতে এবং পড়তে পারি।

একই শ্রেণির শিক্ষার্থী সূর্য মার্ডি জানায়, আমি বাংলা পড়তে পারি, বলতে পারি। আগে বাংলায় কথা বলতে পারতাম না। এখন অনেক বাঙালি বন্ধু হয়েছে, তাদের সঙ্গে খেলি। তাদের মতো করে কথা বলতে পারি।

সুবরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী বিধান মুর্মু জানায়, আমি আগে বইয়ের কিছুই পড়তে পারতাম না। এখন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষিকা আমাকে সবকিছু শিখিয়ে দিয়েছেন। ফলে বাংলায় সবকিছু পড়তে, বুঝতে এবং লিখতে পারছি। পাশাপাশি আমাদের মাতৃভাষাও পারি। 

একই বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রিয়াংকা মার্ডি জানায়, স্কুলে বাংলা ভাষায় পড়াশোনা করি। এখন আমি সবকিছুই বুঝতে পারি। এখন আমার রোল নম্বর ৪। বাংলায় স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারি।

ভালোভাবে পড়ালেখা করে পঞ্চম শ্রেণি থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেছি জানিয়ে লুইস মুর্র্মু জানায়, আগে পড়াশোনা করতে পারছিলাম না। এখন পড়াশোনা স্বাভাবিকভাবে করতে পারছি। কোনও সমস্যা হয় না। সব সহজ লাগতেছে।

অভিভাবক ও শিক্ষকদের মতে, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষকরা দোভাষীর মতো মাতৃভাষার পাশাপাশি বাংলা পাঠ্যপুস্তক বাংলায় শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন। এতে মাতৃভাষার পাশাপাশি বাংলার প্রতি দখল বেড়েছে তাদের। এজন্য এসেছে সফলতা। 

সদরের সুবরা এলাকার এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সম্পা মার্ডি বলেন, ‘বিদ্যালয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষক থাকায় আমাদের ছেলেমেয়ের উন্নতি হয়েছে। তারা এখন মাতৃভাষার পাশাপাশি বাংলা পারে। ভাষাগত দিক দিয়ে এগিয়ে গেছে তারা। আগের চেয়ে ভালো ফল করছে। আমাদের শিশুদের সাহসও বেড়েছে।’

আরেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সুবরা জোসপিনা সরেন বলেন, ‘বিদ্যালয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষক আছে বলেই শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। আমরা তো বাড়িতে থাকি না, কাজে চলে যাই। আমি চাই, প্রতিটি বিদ্যালয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষক দেওয়া হোক। এর ফল জানি। আমি বাংলা না বুঝলেও আমার মেয়ে বাংলায় কথা বলে।’ 

নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষার পাশাপাশি বাংলা পাঠ্যপুস্তক বাংলায় তাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন শিক্ষকরা

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষক লক্ষ্মীমনি হেমরম বলেন, ‘আগে শিশুরা বাংলা ভাষা বুঝতো না। তাদের বাবা-মায়েরা তো বাংলা বলে না। বিদ্যালয়ে আসলেও পড়া বুঝতো না। এখন পড়া আমরা বুঝিয়ে দিই। বাংলার সঙ্গে সঙ্গে মাতৃভাষাও বুঝিয়ে দিই, এটাই আমার প্রধান কাজ। ফলে পড়ালেখার মান বেড়েছে তাদের। শিক্ষার্থীও বেড়েছে। এমনও আছে, যারা বাঙালি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ভালো ফল করছে।’

এ ব্যাপারে নশিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মিলি রানি দাস বলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষার সঙ্গে বাংলার সেতুবন্ধন হচ্ছে। প্রাথমিকেই বাংলাকে আয়ত্তে আনতে পারছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকরা তাদের পাঠদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে শিক্ষার্থী বেড়েছে দ্বিগুণ।’ 

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জীবনমান উন্নয়ন নিয়ে গবেষণা করছেন বীরগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ড. মাসুদুল হক। তিনি বলেন, ‘আমাদের চাওয়া সব জনগোষ্ঠীর শিশুরা শিক্ষার মাধ্যমে মেধাকে কাজে লাগিয়ে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখুক। মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী-অধ্যুষিত এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে তাদের জনগোষ্ঠীর শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হোক। এর ফলে তারা শিক্ষার প্রচার-প্রসারের সুযোগ পাবে। জীবনমান উন্নয়ন হবে। সমন্বিত শিক্ষা-সংস্কৃতি কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে। সরকার চাইলেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী-অধ্যুষিত এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে তাদের ভাষার শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারে।’

/এএম/
সম্পর্কিত
‘ফুল বিজু’ উৎসবের মাধ্যমে পাহাড়ে বর্ষবরণ শুরু
আলো ছড়াচ্ছে কুষ্টিয়ার বয়স্ক বিদ্যালয়
পুরস্কার নেওয়ার পরই শেষ অরন্য চিরান ‘বিতর্ক’
সর্বশেষ খবর
দাবদাহে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের তরল খাদ্য দিচ্ছে ডিএমপি
দাবদাহে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের তরল খাদ্য দিচ্ছে ডিএমপি
জাপানি ছবির দৃশ্য নিয়ে কানের অফিসিয়াল পোস্টার
কান উৎসব ২০২৪জাপানি ছবির দৃশ্য নিয়ে কানের অফিসিয়াল পোস্টার
ড্যান্ডি সেবন থেকে পথশিশুদের বাঁচাবে কারা?
ড্যান্ডি সেবন থেকে পথশিশুদের বাঁচাবে কারা?
লখনউর কাছে হারলো চেন্নাই
লখনউর কাছে হারলো চেন্নাই
সর্বাধিক পঠিত
বাড়ছে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানি, নতুন যোগ হচ্ছে স্বাধীনতা দিবসের ভাতা
বাড়ছে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানি, নতুন যোগ হচ্ছে স্বাধীনতা দিবসের ভাতা
ইরান ও ইসরায়েলের বক্তব্য অযৌক্তিক: এরদোয়ান
ইস্পাহানে হামলাইরান ও ইসরায়েলের বক্তব্য অযৌক্তিক: এরদোয়ান
উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থীকে অপহরণের ঘটনায় ক্ষমা চাইলেন প্রতিমন্ত্রী
উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থীকে অপহরণের ঘটনায় ক্ষমা চাইলেন প্রতিমন্ত্রী
ইরানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল!
ইরানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল!
সংঘাত বাড়াতে চায় না ইরান, ইসরায়েলকে জানিয়েছে রাশিয়া
সংঘাত বাড়াতে চায় না ইরান, ইসরায়েলকে জানিয়েছে রাশিয়া