গাইবান্ধার পলাশবাড়ী থানায় ঢুকে হামলা ও ওসিসহ ৯ পুলিশ সদস্যকে আহত করার ঘটনায় মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় পলাশবাড়ী উপজেলা যুব জামায়াতের বায়তুলমাল সম্পাদক মাহমুদুল হাসান পলাশকে প্রধান আসামি করে ৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাত আরও ১০-১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। এরমধ্যে এজাহারভুক্ত আসামি তৌহিদুল ইসলামকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) দুপুরে পলাশবাড়ী থানার এসআই রেজাউল করিম বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এতে ৯ জন নামীয় ও ১০-১২ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে পলাশবাড়ী থানার ওসি সরোয়ার আলম খান জানান, থানায় ঢুকে পুলিশের ওপর হামলা ও ৯ জন পুলিশ সদস্যকে আহত করার ঘটনায় মামলা রুজু হয়েছে। ইতিমধ্যে ‘কাকন’ নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং বাকি আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গ্রেফতার আসামিকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে বুধবার (২৫ মার্চ) রাত আনুমানিক ১০টার দিকে পলাশবাড়ী থানা ভবনের ভেতরে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ওসি সরোয়ার আলম খান, এক নারী কনস্টেবলসহ অন্তত ৯ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। আহতদের উদ্ধার করে পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী পুলিশ সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে ওসি ও ডিউটি অফিসারের সঙ্গে বাগবিতণ্ডার একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে অভিযুক্ত পলাশ থানার বাইরে গিয়ে তার দলের নেতাকর্মীদের ডেকে আনেন। তারা সংঘবদ্ধভাবে এসে থানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং পুলিশের ওপর হামলা চালায়। পরে আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন—ওসি সরোয়ার আলম খান, এসআই শাহ নেওয়াজ, এসআই রাসেল, এএসআই আশরাফুল, এএসআই ওহিদুল, এএসআই রুহুল আমিন, নারী কনস্টেবল মোস্তারিনা ও কনস্টেবল আব্দুল মজিদসহ ৮ জন।
পুলিশ ও যুব জামায়াত নেতাকর্মীদের তথ্যমতে, কালিবাড়ি বাজারের একটি সরকারি বরাদ্দ দেওয়া দোকানের মালিকানা ও দখল নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, যুব জামায়াত নেতা পলাশ বুধবার রাতে থানায় এসে ওসিকে দোকানে তালা দিতে চাপ প্রয়োগ করেন এবং অমান্য করলে চাকরি নিয়ে হুমকি দেন। এ সময় তিনি ওসিকে ‘ফ্যাসিস্ট’ ও ‘দোসর’ বলে আখ্যা দেন। এ নিয়ে বাগবিতণ্ডার একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং হাতাহাতি ও পরবর্তীতে হামলার ঘটনা ঘটে।
এ বিষয়ে ওসি সরোয়ার আলম খান বলেন, অভিযোগ গ্রহণ করে তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হলেও অভিযুক্তরা অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি করে এবং একপর্যায়ে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। এরপর পরিস্থিতি সহিংসতায় রূপ নেয়। জামায়ামাত আমিরকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে উত্তেজিত আচরণ করা হয়।
তবে হামলার অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে যুব জামায়াত নেতাকর্মীরা। তাদের দাবি, পুলিশই প্রথমে তাদের ওপর হামলা চালায় এবং এতে তাদের দুই নেতাকর্মী আহত হন। তারা অভিযোগ করেন, প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে পুলিশ মিথ্যা মামলা করেছে। তাদের আরও দাবি, গ্রেফতার ‘কাকন’ পেশায় গণমাধ্যমকর্মী।
যদিও পাল্টা অভিযোগ করে যুব জামায়াত ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাদের দাবি, ওসির সঙ্গে কোনও ধরনের হামলা বা মারধরের ঘটনা ঘটেনি। বরং পুলিশ নিজেরাই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে হাতে-মাথায় ব্যান্ডেজ করে ঘটনা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে মামলা করেছে।
তারা আরও বলেন, অনেক নির্দোষ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে, যারা ঘটনাস্থলে উপস্থিতই ছিলেন না। সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করা হলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হবে বলে দাবি করেন তারা।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, দোকান সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়ে থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে ওসি অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং পুলিশ সদস্যরা তাদের ওপর চড়াও হন। পুলিশের ওপর হামলার কোনো ঘটনা ঘটেনি বলেও তারা দাবি করেন।
এদিকে, ঘটনার পর গাইবান্ধা-৩ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কাওছার মো. নজরুল ইসলাম লেবু, সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
অন্যদিকে, যুব জামায়াত নেতারা জানিয়েছেন, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দলের কোনও সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া অভিযুক্তদের কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে নিজেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে পুলিশের হামলার শিকার হওয়ার দাবি করেছেন।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সি সার্কেল) এ বি এম রশীদুল বারী ঘটনাটিকে দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে বলেন, যুব জামায়াত নেতা পলাশের নেতৃত্বে ৮-১০ জনের একটি দল থানায় প্রবেশ করে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। ‘ফ্যাসিস্ট’ ট্যাগ দিয়ে ওসিসহ পুলিশ সদস্যদের মারধর করা হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, অভিযুক্তরা ওসি ও অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের ‘আওয়ামী দোসর’ ও ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে গালিগালাজ, হুমকি এবং শারীরিক আক্রমণ চালায়। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।
এদিকে, থানার সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য ভিডিও পর্যালোচনা করে জড়িতদের শনাক্তের কাজ চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে সিসিটিভি ফুটেজ দেখানো হবে। ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মোবাইলে ধারণ করা ভিডিওতে তর্ক-বিতর্ক ও ধস্তাধস্তির দৃশ্য দেখা গেছে।
ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছে পুলিশ।








