এক ‘পাগলা কুকুরের’ কামড়ে ৫ জনের মৃত্যু, সুন্দরগঞ্জে আতঙ্ক

গাইবান্ধা প্রতিনিধি 
১৫ মে ২০২৬, ০২:৫৯ আপডেট : ১৫ মে ২০২৬, ০২:৫৯

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে একটি বেওয়ারিশ ‘পাগলা’ কুকুরের কামড়ে অসুস্থ ও জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে গত এক সপ্তাহে পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া নারী-শিশুসহ আরও অন্তত ৯ জন আহত হয়ে হাসপাতাল ও নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কুকুর ধরার অভিযান ও ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম শুরু হলেও একের পর এক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে চরম আতঙ্ক।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ‘জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত অ্যান্টি-র‌্যাবিস ভ্যাকসিন না থাকায় অনেককেই বাইরে থেকে চড়া দামে টিকা কিনতে হয়েছে। এতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডোজ সম্পন্ন করতে পারেননি অনেকে।

স্থানীয়রা জানান, গত ২২ এপ্রিল সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের বজরা, কঞ্চিবাড়ি ও পাশের ছাপরহাটি ইউনিয়নের মণ্ডলেরহাট এলাকায় একটি বেওয়ারিশ-পাগলা কুকুর হঠাৎ মানুষের ওপর হামলা চালায়। এসময় দুই শিশুসহ অন্তত ১৪ জন গুরুতর আহত হন। স্থানীয় জনতা ইতোমধ্যে কুকুরটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে।

এরমধ্যে গত ৬ মে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ফুল মিয়া (৫২) ও নন্দ রানী (৫৫)। ৮ মে মারা যান রতনেশ্বর বর্মণ কুমার (৫০)। সবশেষ ১২ মে আফরুজা বেগম (৪০) এবং ১৩ মে ধুবণী গ্রামের গৃহবধূ সুলতানা বেগম (৩৯) মারা যান।

শুধু মৃত্যুই নয়, কুকুরের আক্রমণে আশপাশের গ্রামগুলোতেও সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্ক। সেদিনের ঘটনায় এখনও ৯ জন নারী-পুরুষ আহত ও অসুস্থ হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আহতদের কেউ হাসপাতালে, আবার কেউ নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আহতদের অনেকেই প্রথমে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলেও সেখানে ভ্যাকসিন না পেয়ে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে যান। কিন্তু সেখানেও ভ্যাকসিন সংকট থাকায় বাইরে থেকে বেশি দামে টিকা সংগ্রহ করতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টার গুরুত্বপূর্ণ সময়ও পেরিয়ে যায়।

কুকুড়ের কামড়ের পর মারা যাওয়া সুলতানা বেগমের ছেলে আল আমিন জানান, কুকুর তার মায়ের গলায় কামড় দেয়। পরে হাসপাতালে গিয়ে ভ্যাকসিন না পেয়ে বাইরে থেকে কিনে টিকা দিতে হয়। 

আরেক মৃত ফুল মিয়ার স্ত্রী জমিলা বেগম জানান, তার স্বামীকে কুকুর কামড় দেওয়ার পর বাইরে থেকে ১ হাজার টাকা দিয়ে অ্যান্টি-র‌্যাবিস ইনজেকশন কিনতে হয়েছিল। পরে অবস্থার অবনতি হলে রংপুর মেডিকেলে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়।

এদিকে কুকুর আতঙ্কে অনেক শিক্ষার্থী স্কুল-কলেজে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। বজরা কঞ্চিবাড়ী গ্রামের স্কুলছাত্র শরিফুল ইসলাম বলে, ‘কুকুরের ভয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা করতে পারছি না। বাড়ির বাইরে বের হলেই আতঙ্ক লাগে।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কুকুরটি বেশিরভাগ মানুষকে মুখমণ্ডলে কামড় দেওয়ায় আক্রান্তদের অবস্থা দ্রুত গুরুতর হয়ে পড়ে।

কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনোয়ার আলম সরকার জানান, আহত ও নিহতদের পরিবারের খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে চিকিৎসা সহায়তা ও এলাকায় ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য তাজরুল ইসলাম বলেন, নিহত ও আহতদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের। সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন থাকলে হয়তো অনেক মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতো।

এরইমধ্যে উপজেলা প্রশাসন ও পৌরসভার উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুর ধরার পাশাপাশি ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার সুইপার সুপারভাইজার রবিউল ইসলাম জানান, পর্যায়ক্রমে সব এলাকায় এই কার্যক্রম চলবে।

তবে গত ১৩ মে প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ দাবি করেছে, ২২ এপ্রিল কুকুরে কামড়ানো ব্যক্তিদের কেউই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসেননি। 

যদিও ওই সময় হাসপাতালে ভ্যাকসিন ছিল না বলেও স্বীকার করেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. দিবাকর বসাক। তিনি বলেন, বর্তমানে সরকারিভাবে ৩০ ভায়াল অ্যান্টি-র‌্যাবিস ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হয়েছে।

অন্যদিকে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. রফিকুজ্জামান জানান, আক্রান্তদের সবাই ভ্যাকসিন নিয়েছিলেন। তবে অনেকের গলা, মুখ ও মাথায় গভীর ক্ষত থাকায় দ্রুত স্নায়ুতন্ত্রে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে, ফলে ভ্যাকসিন কার্যকর হয়নি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২৪ ঘণ্টা তদারকির জন্য সাত সদস্যের মেডিকেল টিমসহ একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইফফাত জাহান তুলি বলেন, নিহত ও আহত পরিবারের পাশে প্রশাসন রয়েছে। একইসঙ্গে জনসাধারণকে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুকুরের কামড় বা আঁচড়ের ঘটনা ঘটলে দ্রুত চিকিৎসা ও টিকা নেওয়া জরুরি।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
‘সবচেয়ে মোটা’ কুকুরের মুকুট জয়ে অভিনব প্রতিযোগিতা
উপজেলাটিতে এক সপ্তাহে কুকুরের কামড়ে আহত ১১০
কুকুরের কামড়ে মৃত্যুর ঘটনায় হত্যার তদন্ত
সর্বশেষ খবর
হামের উপসর্গে একদিনে আরও ৩ জনের মৃত্যু
হামের উপসর্গে একদিনে আরও ৩ জনের মৃত্যু
আগামীতে প্রত্যেকটি অপরাধের হিসাব দিতে হবে: জামায়াত আমির
আগামীতে প্রত্যেকটি অপরাধের হিসাব দিতে হবে: জামায়াত আমির
রাজধানীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৩ নেতা গ্রেফতার
রাজধানীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৩ নেতা গ্রেফতার
নিজ ঘরে বৃদ্ধাকে গলা কেটে হত্যা, মেয়ে বললেন ‘ওরা সব লুট করে নিয়ে গেছে’
নিজ ঘরে বৃদ্ধাকে গলা কেটে হত্যা, মেয়ে বললেন ‘ওরা সব লুট করে নিয়ে গেছে’
সর্বাধিক পঠিত
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
ইশরাকের পদত্যাগের পরই ‘ক্ষমতা’ নিয়ে স্ত্রীর বার্তা
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রসঙ্গে যা বললেন জামায়াত আমির
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
বাবার চোখ এড়াতে ঢোলা জামা, আড়ালে চলতো শিশুর ওপর নির্যাতন
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পদত্যাগ করানো সরকারের প্যারাসিটামল থেরাপি: হাসনাত
পানাম নগরী ঘুরে দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নকশিকাঁথা-জামদানি দেখে মুগ্ধ
পানাম নগরী ঘুরে দেখলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত, নকশিকাঁথা-জামদানি দেখে মুগ্ধ