দিনাজপুরে গত এক সপ্তাহের মধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের দ্বারা পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার দুটি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনমনে সমালোচনা এবং ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তবে দলের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, টেন্ডার বা ইজারা সংক্রান্ত বিরোধ এবং আইন অমান্য করার প্রবণতা থেকে ঘটনাগুলো ঘটেছে। ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে যারা এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কেন থানার ভেতরে সিআইডি পুলিশের পরিদর্শককে থাপ্পড়-হুমকি
দিনাজপুর কোতোয়ালি থানার ভেতরে সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক নওয়াবুর রহমানকে থাপ্পড় মারা ও হত্যার হুমকি দেওয়ার ঘটনায় জেলা কৃষক দলের সদস্যসচিব মো. মজিবর রহমান মজিবকে (৫৬) গ্রেফতার করা হয়েছে। গতকাল রবিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পুলিশ পরিদর্শক নওয়াবুর রহমান বাদী হয়ে গতকাল রাতেই মজিবর রহমান ও অজ্ঞাতনামা দুজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মজিবর রহমান জেলা কৃষক দলের সদস্যসচিব। তিনি একটি ইজিবাইক গ্যারেজের মালিক ও বালুয়াডাঙ্গা শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য। পুলিশ পরিদর্শক নওয়াবুর রহমান দিনাজপুরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) কর্মরত।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, একটি হত্যা মামলার নথিপত্র সংগ্রহ ও আগের তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করতে গতকাল রাতে কোতোয়ালি থানায় যান পুলিশ পরিদর্শক নওয়াবুর রহমান। তিনি তখন সাদাপোশাকে ছিলেন। প্রায় একই সময়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে দেখা করতে যান কৃষক দল নেতা মজিবর রহমান।
তখন ওসি থানায় ছিলেন না। ওসির কক্ষের সামনে মজিবর ওসির অবস্থান সম্পর্কে নওয়াবুরের কাছে জানতে চেয়ে বলেন, ‘ওসি কোথায় আছেন’। ওই সময় নওয়াবুর রহমান নিজেকে সিআইডি কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে জানান, একটি মামলার তদন্তের কাজে থানায় এসেছেন, তিনি এই থানার পুলিশ নন এবং ওসি কোথায় আছেন তা জানেন না। তখন মজিবরের সঙ্গে থাকা একজন নওয়াবুরকে গালিগালাজ শুরু করেন।
নওয়াবুর রহমান এর প্রতিবাদ করলে মজিবর রহমান তাকে ডান গালে থাপ্পড় দেন। এ সময় তাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। পরে থানায় অন্য পুলিশ সদস্যরা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। এরপর কৃষক দল নেতাকে গ্রেফতার করে থানায় রাখা হয়।
ছাড়াতে তদবির
এদিকে মজিবর রহমানকে থানা থেকে ছাড়িয়ে নিতে গভীর রাত পর্যন্ত তদবির করতে দেখা গেছে বিএনপির কয়েকজন নেতাকে। পাশাপাশি শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরাও সেখানে ছিলেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, নওয়াবুর রহমানকে থাপ্পড় মারার পর থানার ডিউটি অফিসারের কক্ষে থাকা এসআই মো. মানিক রানা, এসআই মো. মমিনুর রহমান ও কনস্টেবল মো. রফিকুল ইসলামসহ অন্য পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। তারা নওয়াবুর রহমানের পরিচয় জানালে অভিযুক্তরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে ও পুলিশ পরিবারকে উদ্দেশ করে অশ্লীল ও মানহানিকর কথাবার্তা বলেন এবং হত্যার হুমকি দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অভিযুক্ত মজিবর রহমানকে থানা হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)। তবে তার সঙ্গে থাকা অপর দুই ব্যক্তি কৌশলে ঘটনাস্থল থেকে চলে যান।
সিআইডি কর্মকর্তা নওয়াবুর রহমান জানান, ঘটনার পর তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। চিকিৎসা গ্রহণ এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা শেষে মামলা করেছেন। মামলার সঙ্গে চিকিৎসাপত্রের মূল কপি এবং ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সংবলিত একটি পেনড্রাইভ সংযুক্ত করা হয়েছে বলেও জানান।
যা বলছেন ওসি
এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নূরনবী বলেন, ‘থানায় অবস্থান করে পুলিশ সদস্যের গায়ে হাত তুলেছেন ওই ব্যক্তি এবং এমনকি হত্যার হুমকিও দিয়েছেন। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিকে সোমবার আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। তবে তার সঙ্গে থাকা অন্য দুই সহযোগী কৌশলে থানা থেকে পালিয়ে যান, তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’
ইউএনওর সামনে পুলিশ সদস্যকে লাথি মারলেন বিএনপি নেতার ছেলে
এর আগে দিনাজপুরের বিরামপুরে এক পুলিশ সদস্যকে লাথি মেরে আহত করার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা বিএনপির এক নেতার ছেলের বিরুদ্ধে। খাস পুকুর ইজারাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট হট্টগোলের সময় ওই পুলিশ সদস্য মোবাইলে ভিডিও ধারণ করায় লাথি মেরেছেন বলে জানা গেছে। গত ৩ আগস্ট বেলা পৌনে ২টার দিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিনা খাতুনের উপস্থিতিতে এ ঘটনা ঘটে।
অভিযুক্ত রাহাদুজ্জামান পরাগ (২৭) উপজেলার দিওড় ইউনিয়নের ধানঘরা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম আলী ওরফে বাবুর ছেলে। পরাগ নিজে দিওড় ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক। লাথিতে আহত নুরুজ্জামান সরকার বিরামপুর থানার একজন কনস্টেবল। ঘটনার পর তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।
এ ঘটনায় ওই দিন রাত ১২টার দিকে বিরামপুর থানার এক উপপরিদর্শক বাদী হয়ে রাহাদুজ্জামান পরাগ ও আল আমিন (২৫) নামের দুজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৫-৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। অপর অভিযুক্ত আল আমিন পৌর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, সোমবার বেলা ১১টায় ইউএনও কার্যালয়ে উপজেলার অর্পিত পুকুর ইজারার আবেদন জমা নেওয়া হচ্ছিল। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে কয়েকজন পুলিশ সদস্যও ছিলেন। বেলা পৌনে ২টার দিকে রাহাদুজ্জামান পরাগ, আল আমিনসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজন ইউএনওর কক্ষের সামনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন এবং পুকুর ইজারার আবেদন জমা দিতে বাধা দেন।
এ সময় কনস্টেবল নুরুজ্জামান সরকার ব্যক্তিগত মোবাইলে উদ্ভূত পরিস্থিতির ভিডিও ধারণ করছিলেন। এতে পরাগ, আল আমিনসহ কয়েকজন তাকে ভিডিও করতে বাধা দেন। পরে তারা জোর করে ইউএনওর কক্ষে ঢোকার চেষ্টা করেন। পুলিশ বাধা দিলে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পুলিশ সদস্যদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও ধাক্কাধাক্কি শুরু করেন। একপর্যায়ে কনস্টেবল নুরুজ্জামানকে লাথি মারা হয়। এরপর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা জোর করে ইউএনওর কক্ষে ঢুকে ইউএনও তানজিনা খাতুনের উপস্থিতিতে পুলিশ সদস্যদের মোবাইলে ধারণ করা ভিডিও মুছে ফেলতে বাধ্য করেন।
এ ঘটনার পর বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ইউএনওর দাফতরিক কক্ষে উপজেলা বিএনপির কয়েকজন নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন ইউএনও। বিষয়টি মীমাংসার উদ্দেশ্যেই এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
এতে উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাজিয়া নওরীন, বিরামপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার হারেজ উদ্দিন, উপজেলা বিএনপির সভাপতি মিঞা মো. শফিকুল আলম, সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর এলাহী চৌধুরী, পৌর বিএনপির সভাপতি হুমায়ুন কবির ও সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম। এ সময় ইউএনও কার্যালয়ের বাইরে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী অবস্থান করছিলেন।
ঘটনাটি ইউএনওর সামনেই ঘটেছে কিনা—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তানজিনা খাতুন বলেন, ‘আমি শুনেছি, ভিডিও ফুটেজে দেখেছি।’
এ বিষয়ে উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সানোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি ঘটনার সময় ওই পুলিশ সদস্যকে গন্ডগোল থেকে সেভ করে ইউএনওর কক্ষে নিয়ে যাচ্ছিলাম। পেছন থেকে ওই পুলিশ ভাইয়ের কোমরে ও পায়ে লাথি মারেন। আমার ডান পায়েও একটি লাথি লাগে। এখানে অপরাধ লুকানোর উপায় নাই, কারণ দুই পাশেই তো ক্যামেরা আছে।’
বিরামপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শামীম আল মামুন বলেন, ‘পুলিশকে মারধর ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে গতকাল রাতে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’
চলছে সমালোচনা
আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর এমন প্রকাশ্য হামলার ঘটনায় সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সমালোচনা তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই মন্তব্য করছেন যে, খোদ থানার ভেতরেই যদি পুলিশ সুরক্ষিত না থাকে, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়। দলীয় পরিচয়ের অপব্যবহার করে আইন হাতে তুলে নেওয়ার এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

‘ওসি কোথায়?’ প্রশ্নের পর থানাতেই সিআইডি ইন্সপেক্টরকে থাপ্পড়, কৃষকদল নেতা আটক
ইউএনওর সামনে পুলিশ সদস্যকে লাথি মারলেন বিএনপি নেতার ছেলে, থানায় মামলা







