শিক্ষক ও তার পরিবারকে হত্যা করলো কারা, কারণ কী 

রংপুর প্রতিনিধি 
২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৩:১০আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৩:১০

রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারকে কারা হত্যা করেছে, তা এখনও নির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেনি পুলিশ। তবে পুলিশ জানিয়েছে, বাসার ভেতরে আলমারি ভাঙা, মালামালগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা। সোনার অলংকারের বাক্সসহ মালামাল এলোমেলোভাবে পড়ে থাকায় ধারণা করা হচ্ছে, বাসায় ডাকাতি করে মালামাল, নগদ অর্থ, সোনার অলংকার লুট করে নিয়ে যাওয়ার সময় বাধা দেওয়ায় চার জনকে হত্যা করেছে দুবৃর্ত্তরা। তবে এখনও কোনও অপরাধীকে শনাক্ত বা গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। 

শনিবার রাতে রংপুরের কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি তিনতলা ভবন থেকে শিক্ষকসহ তার পরিবারের চার জনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হলেন- জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী এবং স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী। 

পুলিশ ও সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, এটি একটি পরিকল্পিত ডাকাতির ঘটনা। দুর্বৃত্তরা ঘরের ভেতরে থাকা টাকা-পয়সা ও মূল্যবান জিনিসপত্র রাখার জায়গা ভেঙে সবকিছু তছনছ করে লুটপাট চালিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে দুই-তিন দিন আগে পুরো পরিবারটিকে গলায় রশি বা গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। খুনিরা সুপরিকল্পিতভাবে বাসার বৈদ্যুতিক সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। লাশগুলো ঘরের বিভিন্ন স্থানে, সিঁড়িতে ও ছাদে ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায় পাওয়া যায়। বর্তমানে রংপুর মহানগর পুলিশ এবং সিআইডি এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন এবং অপরাধীদের খুঁজে বের করতে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। 

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর থেকে পরিবারটির সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। স্বজনদের মাধ্যমে খবর পেয়ে শনিবার রাতে বাসায় গিয়ে চারটি মরদেহ পায় পুলিশ। খোঁজখবর নেওয়ার জন্য শনিবার রাতে বোন প্রীতিলতা চক্রবর্তীকে ফোন করেছিলেন পূজা চক্রবর্তী। বোনের ফোন বন্ধ পেয়ে একে একে বোনের স্বামী গণপতি চক্রবর্তী, তাদের মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং তাদের শিশু পুত্র প্রীয়ম চক্রবর্তীর ফোনে ফোন করেন। সবারই ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। 

এরপর রংপুর মহানগরের কামালকাছনার মাছুয়াপাড়ায় বোনের বাসায় এসে দেখেন ঘরে তালা লাগানো, ভেতরে জিনিসপত্র এলোমেলো। তখন ডাকা হয় পুলিশ। ভেতর থেকে বের হয় একে একে চার জনের লাশ। 

পুলিশ বলছে, গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী ও কন্যার লাশ পাওয়া যায় ছাদের সিঁড়িতে। প্রীয়ম চক্রবর্তীর লাশ পাওয়া যায় বিছানার নিচে। আর গণপতি চক্রবর্তীর লাশ পাওয়া যায় ছাদের এক প্রান্তে। 

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীর স্ত্রী শেফালী চক্রবর্তী। তিনি বলছিলেন, তাদের গ্রামের বাড়ি মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। তার শ্বশুরের নাম হেমন্ত চক্রবর্তী। এক বছর আগে গণপতি চক্রবর্তী অবসরে যান। তাদের পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তান ছিলেন প্রীয়ম। 

ঘটনাস্থলে পূজা চক্রবর্তী সাংবাদিকদের বলেন, বৃহস্পতিবার ভাগনি আগামী ফোন দিছিল, রাত একটা-দেড়টার দিকে। এমনি কুশল বিনিময়। শনিবার আবার রাত পৌনে ৯টার দিকে ফোন দিছি। আমার দিদির ফোনেও ফোন ঢোকে না, দুঃখিত বলে। জামাইবাবুর ফোনেও ফোন ঢোকে না। ভাগনির ফোনেও ফোন ঢোকে না। আর প্রিয়ম যে ক্লাস ফাইভে পড়ে ওর একটা বাটন ফোন আছে, সেটাতেও ফোন ঢোকে না। 

তিনি বলেন, আমার স্বামী অফিস থেকে আসার পর আমি বললাম, দিদিদের চারটা ফোনই বন্ধ কেন? চলো তো যাই ওদের বাসায়। আমরা আসলাম, কলিং বেলও বাজে না। দেখলাম, পুরো বাড়ি অন্ধকার। দিদি, দিদি, আগামী (প্রার্থী), প্রিয়ম করে চিল্লাতে চিল্লাতে প্রতিবেশী কিছু চলে আসলো। তখন এক প্রতিবেশী বললো, আজকে দুপুরের দিকে কী জানি অর্ডার করছিল, পার্শ্বেল আসছিল। তখন কলিং বেল চাপছে কেউ খোলে না, লোকটা ঘুরে গেছে। পরে পাশের একটা বাসায় গেলাম। তখন দুই বাড়ির মাঝের ছোট্ট একটা প্রাচীর টপকিয়ে উঠলাম। জোরে জোরে জানালার থাই গ্লাসে ধাক্কা দেওয়ার পর সেটা খুলে গেছে। মোবাইলের আলো দিয়ে দেখি, ওদের ওয়্যারড্রবের ড্রয়ার খুলে কাপড়সহ যা যা ছিল সব ছড়ানো-ছিটানো। তখন আমি চিৎকার করলাম। 

পূজা বলেন, আমার ভাগনের লাশ ছিল খাটের নিচে। আমার বড় বোনকে সিঁড়িতে ফেলে রাখছে। আমার বড় বোনের ওপর ভাগনিকে ফেলে রাখছে। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। উনি জিলা স্কুলের একজন শিক্ষক ছিলেন। খুব ভালো মানুষ। অনেক কষ্ট করে এই বাড়িটা করছেন। খুব শান্ত মানুষ। তাদের সবাইকে এভাবে মেরে ফেললো কারা। আমাদের জীবনের নিশ্চয়তা কী! আমরা চাই, এর সুষ্ঠু বিচার হোক। 

পূজা চক্রবর্তীর ডাকাডাকি শুনে স্থানীয় ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি সেখানে আসেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে এটা তো কেউ কল্পনাও করতে পারে না। এভাবে একটা পরিবারের চার জন হারিয়ে গেছে- এটা ভাবা যায় না। আমরা বিচার চাই। 

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, শহরের কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তীর দোতলা বাড়ি কাজ এখনও শেষ হয়নি। সেই বাড়ির দোতলায় সম্প্রতি পরিবার নিয়ে থাকা শুরু করেছিলেন গণপতি চক্রবর্তী। বাড়ির নিচতলাটা ফাঁকাই। তারা নতুন এসেছেন বলে এখনও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠেনি। 

স্থানীয়রা বলছেন, শনিবার রাতে প্রীতিলতার বোন পূজা চক্রবর্তী এসে ডাকাডাকি করেন। বাড়ির ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তিনি পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ এসে ফটক বন্ধ দেখে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে ডাকে। ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা এসে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকতে সহায়তা করে। 

রংপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গোয়েন্দা) সনাতন চক্রবর্তী বলছেন, তাদের খুন করা হয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি। তাদের গলায় দড়ি প্যাঁচানো রয়েছে। তাদের পুরো ঘরবাড়ি তছনছ অবস্থায় রয়েছে। আমরা ধারণা করছি, এটা ডাকাতি হতে পারে।

/এএম/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
শেষ মুহূর্তের গোলে রিয়ালের বাজিমাত, জয় দিয়ে মরিনহো যুগের নতুন সূচনা 
শেষ মুহূর্তের গোলে রিয়ালের বাজিমাত, জয় দিয়ে মরিনহো যুগের নতুন সূচনা 
শিক্ষক ও তার পরিবারকে হত্যা করলো কারা, কারণ কী 
শিক্ষক ও তার পরিবারকে হত্যা করলো কারা, কারণ কী 
দুদিন ধরে বোনকে ফোন দিয়ে পাচ্ছিলেন না, বাসায় এসে দেখলেন সবাই লাশ
দুদিন ধরে বোনকে ফোন দিয়ে পাচ্ছিলেন না, বাসায় এসে দেখলেন সবাই লাশ
এক শিক্ষক, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের লাশ উদ্ধার, বাসা ঘিরে রেখেছে সিআইডি
এক শিক্ষক, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের লাশ উদ্ধার, বাসা ঘিরে রেখেছে সিআইডি
সর্বাধিক পঠিত
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান কি ছুটিতে যাচ্ছেন?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান কি ছুটিতে যাচ্ছেন?
সুখবর পেলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সুলিভান, শাস্তি পেলেন মেসি 
সুখবর পেলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সুলিভান, শাস্তি পেলেন মেসি 
মাছ কেটে স্বাবলম্বী তারা 
মাছ কেটে স্বাবলম্বী তারা 
৪০ ক্যামেরা বসিয়েও খোঁজ মেলেনি সুন্দরবনের সেই বাঘিনীর
৪০ ক্যামেরা বসিয়েও খোঁজ মেলেনি সুন্দরবনের সেই বাঘিনীর
কোন কারণে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানিয়েছে ‘তৌহিদি জনতা’
কোন কারণে নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানিয়েছে ‘তৌহিদি জনতা’