তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুৎ সংকট। গ্যাসের সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে না পারায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। এতে জনজীবনের পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা। দিনের বেলায় গরম আর রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। গ্রামাঞ্চলের অনেক এলাকায় দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকাতেও এখন লোডশেডিং শুরু হয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটের এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে ভোগান্তিতে ফেলেছে পরীক্ষার্থী ও শিক্ষার্থীদের। ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের লিখিত পরীক্ষা ২ জুলাই শুরু হয়ে ৮ আগস্ট পর্যন্ত শেষ। পরীক্ষা চলাকালেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ছিল। এমনকি পরীক্ষার্থীদের নির্বিঘ্নে পরীক্ষা দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট অঞ্চলে ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত পূর্বনির্ধারিত লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ শাটডাউন স্থগিত রাখা হয়েছিল।
বিদ্যুৎ ঘাটতি ছাড়িয়েছে ৩ হাজার মেগাওয়াট
বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের চিত্র পাওয়া যায় সাম্প্রতিক উৎপাদন ও চাহিদার হিসাবেও। গত ১১ আগস্ট মধ্যরাতে লোডশেডিং সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৫২৩ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৯৩১ মেগাওয়াট। ১২ আগস্ট বিকাল ৩টায়ও ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট।
এর আগের কয়েক দিনেও পরিস্থিতি ছিল আরও খারাপ। গত ৯ আগস্ট ঘাটতি একপর্যায়ে ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াটে এবং পরদিন ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। ২০২৩ সালের ২৭ জুনের সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট লোডশেডিংকেও ছাড়িয়ে গেছে সাম্প্রতিক এই ঘাটতি।
ফলে গ্রামাঞ্চলের অনেক এলাকায় দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। ময়মনসিংহের কোনও কোনও এলাকায় ১০ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। সিলেট ও বরিশালের কিছু এলাকাতেও ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিংয়ের খবর এসেছে।
দীর্ঘদিন ধরে গ্রামাঞ্চলের মানুষ বেশি ভোগান্তিতে থাকলেও এবার রাজধানীতেও এর প্রভাব স্পষ্ট। ১৪ আগস্টের প্রতিবেদনে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় রাতে এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার তথ্য এসেছে। বসুন্ধরা, ইস্কাটন, কাজীপাড়া, মৌচাক, কারওয়ান বাজার, পান্থপথ, পশ্চিম রাজাবাজার ও মোহাম্মদপুরের কিছু এলাকায় রাতের দিকে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের খবর পাওয়া গেছে।
ডেসকো ও ডিপিডিসির কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ডিপিডিসির অধীন এলাকায় বিদ্যুতের গড় চাহিদা প্রায় ২ হাজার ১০০ মেগাওয়াট এবং ডেসকোর অধীন এলাকায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৪৪০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে গড়ে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট করে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
পড়ার সময় বিদ্যুৎ নেই, রাতে গরমে ঘুম নেই
দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর। দিনের বেলায় গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। আবার রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে ঘরের ভেতর গরম ও অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের পড়ার সময় কমে যাচ্ছে এবং অনেকেই বাধ্য হয়ে বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষায় থাকছে।
বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল পড়াশোনায় সমস্যাটি আরও প্রকট। অনলাইন ক্লাস, ভিডিও লেকচার, ডিজিটাল বই, মডেল টেস্ট কিংবা অনলাইনভিত্তিক ভর্তি প্রস্তুতির সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো কার্যক্রম থেমে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে কোথাও কোথাও মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবায় সমস্যা যুক্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি আরও বাড়ছে।
এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য বিষয়টি ছিল আরও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর ২ জুলাই থেকে তাদের পরীক্ষা শুরু হয়। পরীক্ষা চলাকালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় কিছু এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে পরিকল্পিত লোডশেডিং বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তই দেখায়, পরীক্ষার সময় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
সক্ষমতা আছে, জ্বালানি নেই
বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট বেশি হলেও সেই সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি সরবরাহ।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক গ্যাসের প্রয়োজন প্রায় ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট, কিন্তু ১১ আগস্ট এসব কেন্দ্র পেয়েছে মাত্র ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাসের অভাবে ১৬টি গ্যাসভিত্তিক ও পাঁচটি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ ছিল এবং আরও ৩৪টি কেন্দ্র সক্ষমতার নিচে চলছিল।
এদিকে জুলাইয়ের শেষ দিকে মহেশখালীর একটি এলএনজি টার্মিনালে সমস্যার পর গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকেও সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
বিদ্যুত নেই, আছে মশা
মশার উৎপাতের কারণে সন্ধ্যার পর রাজধানীর অনেক বাসিন্দাকেই জানালা বন্ধ করে রাখতে হচ্ছে। জানালা খুললে ঘরে ঢুকছে মশা, আবার বন্ধ রাখলে গরমে অতিষ্ঠ হতে হচ্ছে। একদিকে গরম, অন্যদিকে মশা—দুইয়ের যন্ত্রণায় স্বস্তি নেই নগরবাসীর। এর মধ্যেই ডেঙ্গু পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ১৭ হাজার ৮৮০ ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ৫৯ জনের; আক্রান্ত ও মৃত্যুর হিসাবে ঢাকা বিভাগ রয়েছে শীর্ষে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগস্টের পাশাপাশি সেপ্টেম্বরেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে।
সংকটের প্রভাব শুধু বাসাবাড়িতে নয়, কৃষি-শিল্প খাতেও
বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসা, কৃষি ও শিল্পও। দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে দোকানপাট, ওয়ার্কশপ, রাইস মিল ও অনলাইনভিত্তিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে। শিল্পকারখানাগুলোকে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন কমাতে বা সময়সূচি পরিবর্তন করতে হচ্ছে। কেউ কেউ বাড়তি খরচে ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করছেন।
তবে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ক্ষতিটা অন্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাট একটি কারখানার উৎপাদন এক ঘণ্টা পিছিয়ে দিতে পারে; কিন্তু একজন পরীক্ষার্থীর পড়ার নির্দিষ্ট সময় নষ্ট হলে সেটি পরে সবসময় পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা, ভর্তি প্রস্তুতি কিংবা অনলাইন ক্লাসের সময়ে দীর্ঘ লোডশেডিং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নষ্ট করছে।
সরকারের সাশ্রয়ী ব্যবহারের উদ্যোগ
গ্যাস সংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সরকার বিদ্যুৎ ব্যবহারে আরও কঠোর সাশ্রয়ী ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। গ্যাস সংকট আরও খারাপ হওয়া এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপ জোরদার করছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী আনিন্দ্য ইসলাম আমিতও গ্যাস সরবরাহের সমস্যাকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে কবে নাগাদ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হয়নি।
সামনে শিক্ষার্থীদের জন্য কী
এইচএসসি লিখিত পরীক্ষা শেষ হলেও শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম থেমে নেই। ফলাফল, ভর্তি প্রস্তুতি, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন শ্রেণির নিয়মিত পড়াশোনায় বিদ্যুতের প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা ও ডিজিটাল কনটেন্টের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য দীর্ঘ লোডশেডিং বাড়তি বাধা তৈরি করছে।
মোহাম্মদপুরে বাসিন্দা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জিনাত রেদওয়ানা বলেন, ‘কলেজেও ক্লাস চলাকালে বিদ্যুৎ চলে যায়। বাসায় সন্ধ্যার পর দুই দফা লোডশেডিংয়ে লেখাপড়ার আগ্রহ থাকে না। রাতে ঠিকমত না ঘুমিয়ে পরদিন খুব সকালেই যেতে হয় ক্লাসে। এতে লেখাপড়ায় যেমন বিঘ্ন ঘটছে তেমনি গরমে অতিষ্ঠ হচ্ছি। কিছু বলার নেই।’
গ্রামেও বিদ্যুতের আসা যাওয়ায় কৃষিকাজের সেচ বিঘ্ন ঘটার পাশাপাশি লেখাপড়ায় প্রভাব পড়ছে বলে জানান রাজশাহীর একটি দুর্গাপুরের আলীপুর মডেল কলেজের অধ্যক্ষ সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ছাত্ররা এমনিতেই মোবাইলে সময় নষ্ট করে। তারপর বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে বাড়তি প্রভাব ফেলেছে। সদস্য শেষ হওয়া এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা বিদ্যুতের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ ফলাফলেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন এই অধ্যক্ষ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু ‘লোডশেডিং’ হিসেবে দেখার সুযোগ কমে এসেছে। গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহের সংকটের কারণে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যখন বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাচ্ছে, তখন তার প্রভাব পড়ছে শিক্ষা, ব্যবসা, কৃষি ও শিল্প—সব ক্ষেত্রেই। শিক্ষার্থীদের জন্য এর তাৎক্ষণিক ক্ষতি হচ্ছে পড়ার সময় ও শিক্ষার ধারাবাহিকতা নষ্ট হওয়া।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপুল উৎপাদনক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সংকটে যে বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সরকার কত দ্রুত গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে পারে।









