X
সোমবার, ০৪ জুলাই ২০২২
২০ আষাঢ় ১৪২৯
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব দুই

শিল্পীদের আয়ের বিজ্ঞানসম্মত পথ খুলে দেয় গ্রামোফোন

আপডেট : ২৩ মে ২০২২, ২১:৪৯

আমরা তখন স্কুলে ওপরের দিকের ক্লাসে। আমাদের পাড়ায় বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট ছিল। যেমন, ইকবাল হোটেল, ঘোষ ব্রাদার্স, সবুর রেস্টুরেন্ট। আরেকটি রেস্টুরেন্ট ছিল নামবিহীন। মালিকের নাম গোলাম রসুল। এটি গোলাম রসুলের চায়ের দোকান নামেই পরিচিতি পায়। আড্ডার সঙ্গে চায়ের সম্পর্ক বহু পুরাতন। আর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় গান, তবে সে আড্ডা হয়ে ওঠে সর্বোত্তম।

প্রথম ৩টি রেস্টুরেন্টে রেডিও ছিল। তবে রেডিওতে গান ছাড়াও বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠান সম্প্রচার হতো তখন। কাজেই নিরবচ্ছিন্নভাবে গান শোনার কোনও উপায় ছিল না। তাই আমরা বন্ধুরা স্কুল যাতায়াতের জন্য বরাদ্দ টাকা থেকে জমিয়ে, গোলাম রসুলের চা দোকানে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব থাকতাম। কারণ সেখানে একটা গ্রামোফোন ছিল। এবং গ্রামোফোনে বিরতিছাড়া জনপ্রিয় বাংলা, হিন্দি ও উর্দু গান বাজানো হতো। 

তখন পোর্টেবল রেকর্ড প্লেয়ারও এসে গেছে। 

সেই সময়ে মধ্যম আয়ের মানুষের প্রায় সব বাসায় রেকর্ডে গান শোনার ব্যবস্থা ছিল। তবে তা ছিল ঘরের বড়দের দখলে। তাই বয়সে ছোটদের গান শোনার বিকল্প ব্যবস্থা তারা নিজেরাই করতো। যেমন- বাসায় বড়দের অনুপস্থিতিতে গান শোনা অথবা গ্রামোফোনে গান বাজানো হয় এমন পছন্দের রেস্টুরেন্ট বেছে নেওয়া।

অবিভক্ত ভারতে যখন গ্রামোফোন, রেডিও, সিনেমা ছিল না তখন বিভিন্ন সভা, সমাবেশ, জলসায় গান গেয়ে শিল্পীরা পরিচিতি পেতেন। একই সঙ্গে তাদের কিছু আয়ের ব্যবস্থাও হতো। সংগীতশিল্পী ও সংগীত সংশ্লিষ্টরা রাজা, নবাব, জমিদারদের থেকে আর্থিক আনুকূল্যও পেতেন। 

নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ ও গওহর জান যেমন, গওহর জান ও তার মা মালকা জান যখন প্রথম কলকাতায় এসেছিলেন তখন নবাব ওয়াজিদ আলি শাহর পৃষ্ঠপোষকতায় নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। 

তখন বিভিন্ন রাজ দরবারে সভা গায়কের পদটি বেশ আকর্ষণীয় ছিল।

সিনেমা আসার আগে নাটক ছিল মানুষের বিনোদনের প্রধান গন্তব্য। নাটক ছিল সংগীতশিল্পীদের আয়ের অন্যতম মাধ্যম। সে সময় নাটকে নেপথ্যে গান গাওয়ার কৌশল জানা ছিল না। গানের প্রয়োজনে সংগীতশিল্পীদের মঞ্চে অভিনয় করতে হতো। নাটকের অংশ হিসাবেই মঞ্চে গান পরিবেশন করতে হতো। নাটক তখন নিয়মিত মঞ্চস্থ হতো। তাই যারা নাটকে সুযোগ পেতেন আর্থিক দিক থেকে তারা কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতেন।

এই অবস্থায় গ্রামোফোনের আগমন উপমহাদেশে সংগীতের বাণিজ্যিক বিপ্লব সংঘটিত হয়। শিল্পীদের আয়ের বিজ্ঞানসম্মত পথ খুলে যায়। সংগীত সংশ্লিষ্ট অন্যদেরও আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এই প্রথম গান থেকেও ব্যবসায়ীরা নিয়মিত আয়ের পথ খুঁজে পান। 

১৮৭৭ সালে টমাস এডিসন শব্দযন্ত্র আবিষ্কার করেন। যন্ত্রের নাম দেন ফনোগ্রাফ। সেটি ভারতেও আমদানি হয়েছিল। কিন্তু ফনোগ্রাফ উন্নত শব্দ প্রক্ষেপণ করতে পারতো না। তাই জনপ্রিয়তা হারায়। ১৮৮৪ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে বসবাস শুরু করেন জার্মান অভিবাসী এমিল বার্লিনার। তিনি ১৮৮৭ সালে শব্দ রেকর্ডিংয়ের একটি সফল সিস্টেমের পেটেন্ট করান। এবং মানুষ গ্রামোফোনের সঙ্গে পরিচিত হন। বার্লিনার সৃষ্ট চাকতি রেকর্ড ব্যবহার করা এবং তৈরি করা সহজ হওয়াতে গ্রামোফোন দ্রুত জনপ্রিয় হয়। এমিল বার্লিনার ও তার গ্রামোফোন

পৃথিবীতে গ্রামোফোনের আগমনে, ঘরে বসে গান শোনার নতুন সুযোগ তৈরি হয়। পছন্দের গান শোনা, যতবার ইচ্ছা ততবার শোনার সুযোগ, গ্রামোফোনের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে সাহায্য করে। মানুষ গান পছন্দ করলো কিনা তা রেকর্ড বিক্রির পরিমাণ দেখলেই আন্দাজ করা যেতো। শিল্পীর নিজের কণ্ঠের ধারণকৃত গান সংরক্ষণের সুবিধা, সংগীতশিল্পে স্বর্ণযুগের সূচনা করে। 

১৯০২ সালের প্রথমার্ধে গ্রামোফোন কোম্পানির সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার এফ ডব্লিউ গেইসবার্গ কলকাতায় আসেন। একই বছর তার উদ্যোগে গওহর জানের কণ্ঠে ভারতীয় খেয়াল রেকর্ড করা হয় এবং এই রেকর্ডই গ্রামোফোন কোম্পানির প্রথম রেকর্ড হিসাবে ১৯০২ সালে ভারতে প্রকাশিত হয়। এরপর বাংলাসহ বিভিন্ন ভাষায় নিয়মিত গওহর জানের গান প্রকাশিত হয়। 

তবে বাংলা গানের প্রথম রেকর্ডে কণ্ঠ দেন অ্যামেচার শিল্পী শশীমুখী ও ফনীবালা। প্রখ্যাত রেকর্ড সংগ্রাহক অধ্যাপক ইকবাল মতিন বিবিসি বাংলার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে এই তথ্য উল্লেখ করেছেন। ইকবাল মতিন অন্যত্র বলেছেন, শশীমুখী ও ফনীবালার গান গওহর জানের আগেই রেকর্ড করা হয়, তবে তা প্রকাশিত হয় গওহর জানের রেকর্ড প্রকাশের পরে। প্রফেসর ইকবাল মতিনের কাছে এসব রেকর্ড সংরক্ষিত আছে। পরে ফনীবালা বা শশীমুখীর তেমন একটা তৎপরতা দৃশ্যমান হয়নি গ্রামোফোনে।

টমাস এডিসন ও এফ ডব্লিউ গেইসবার্গ গ্রামোফোনের আগমনে গান-বাজনায় পেশাদারিত্বের গুরুত্ব বাড়ে। যে কারণে আধুনিক বাংলা গানে বৈচিত্র্য আসে। গায়কীতে নতুনত্ব যোগ হয়। বাদ্যযন্ত্রে নতুন নতুন প্রতিভার সমাবেশ ঘটে। 
বেশ কিছু গ্রামোফোন কোম্পানি সেই সময়ে গড়ে ওঠে। যার মধ্যে ছিল ‘হিস মাস্টার ভয়েস’, ‘টুইন’ ‘কলম্বিয়া’, ‘রিগ্যাল’, ‘পাইওনিয়ার’, ‘মেগাফোন’, ‘সেনোলা’ প্রভৃতি। 

গ্রামোফোনের বেশ পরে ১৯২৭ সালে রেডিও’র সম্প্রচার শুরু হয় এবং তার অল্প কয়েক বছর পরে সবাক চলচ্চিত্রের আগমনে শিল্পীদের জন্য নিজের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ এবং আয় বৃদ্ধির সুযোগ আরও বেড়ে যায়। 

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গীতিকবি

চলবে...

প্রথম পর্ব: অ্যাঞ্জেলিনা ইয়ার্ড থেকে সুপার স্টার গওহর জান হয়ে ওঠার ইতিহাস

চলতি পর্বের তথ্যসূত্র:
‘History of gramophone’ by Matthew.Recording-History.org
বিবিসি নিউজ বাংলা
অতীতের পাতা থেকে কলের গান রেকর্ডের গান- পণ্ডিত অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়
Onushilon.org

/এমএম/এমওএফ/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডে চাকরি
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডে চাকরি
মেঘনা গ্রুপের কারখানার আগুন নিয়ন্ত্রণে
মেঘনা গ্রুপের কারখানার আগুন নিয়ন্ত্রণে
হাট কাঁপাবে ‘টাঙ্গাইলের সম্রাট’
হাট কাঁপাবে ‘টাঙ্গাইলের সম্রাট’
‘আমাদের জন্য শিরোপা কঠিন হয়ে গেলো’
‘আমাদের জন্য শিরোপা কঠিন হয়ে গেলো’
এ বিভাগের সর্বশেষ
প্রথম রেকর্ড হাতে পেয়ে ইন্দুবালা নিজেই ভেঙে ফেলেন!
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব সাতপ্রথম রেকর্ড হাতে পেয়ে ইন্দুবালা নিজেই ভেঙে ফেলেন!
অমলা দাশের কারণেই অনেক প্রতিভাবান শিল্পী এসেছিলেন
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব ছয়অমলা দাশের কারণেই অনেক প্রতিভাবান শিল্পী এসেছিলেন
রেকর্ডিং কোম্পানিগুলোর কাছে যোগ্য সম্মানি পাননি কে. মল্লিক
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব পাঁচরেকর্ডিং কোম্পানিগুলোর কাছে যোগ্য সম্মানি পাননি কে. মল্লিক
‘সেকালের কলকাতার লোকেরা ছিলেন সংগীত-ছুট’
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব চার‘সেকালের কলকাতার লোকেরা ছিলেন সংগীত-ছুট’
গান-বাণিজ্যে গওহর জান নায়িকা হলে, লালচাঁদ বড়াল নায়ক
গানের শিল্পী, গ্রামোফোন, ক্যাসেট ও অন্যান্য: পর্ব তিনগান-বাণিজ্যে গওহর জান নায়িকা হলে, লালচাঁদ বড়াল নায়ক