অনেক বছর আগে, ফুল-টাইম ফুটবল সাংবাদিক হওয়ার আগে, আমি গুটিকয়েক ম্যাগাজিন ও ওয়েবসাইটের জন্য শখের বশে মিউজিক রিভিউ বা গান নিয়ে সমালোচনা লিখতাম। সেই অতীতটাই এখন আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ভূত হয়ে তাড়া করার জন্য! আমার সম্পাদক আমাকে বাধ্য করেছেন টুর্নামেন্ট শুরুর আগে, গত শুক্রবার (৫ জুন) সদ্য মুক্তি পাওয়া ২০২৬ বিশ্বকাপের অফিশিয়াল অ্যালবামটি শুনতে এবং সেটির একটি রিভিউ লিখতে। অ্যালবামটির অতি-কাল্পনিক নাম দেওয়া হয়েছে—‘অফিশিয়াল ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৬ অ্যালবাম’।
ফুটবল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এর আগেও বহু দারুণ দারুণ গান তৈরি হয়েছে, এটা সত্যি। কিন্তু প্রায় এক ঘণ্টার এই ১৮ ট্র্যাকের সংকলনটিতে কি তেমন কোনো গানের দেখা মিলবে? যেখানে স্টর্মজি ও শাকিরা থেকে শুরু করে জেলি রোল এবং দ্য রোলিং স্টোনসের মতো শিল্পীদের যৌথ প্রচেষ্টা ঠাঁই পেয়েছে। একটা আন্দাজ করেই দেখুন না, উত্তর কী হতে পারে!
এই অ্যালবামের অন্তত একটি গানের প্রতি যদি একটু দয়া দেখাতে হয়, তবে বলতে হবে অ্যালবামটির শুরুটা বেশ আশাব্যঞ্জকভাবেই হয়েছিল। ব্ল্যাকপিঙ্ক ব্যান্ডের সদস্য হিসেবে সুপরিচিত লিসা-র গাওয়া ‘গোলস’ গানটি ট্র্যাপ-অনুপ্রাণিত ইলেকট্রো মিউজিকের মধ্য দিয়ে বেশ একটা চমৎকার উদ্যম নিয়ে এগিয়েছে। গানটি শোনার সময় পা দোলানোর মতো একটুখানি উন্মাদনা অন্তত তৈরি হয়, যা দেখে মনে হতে পারে যে এই অ্যালবামটি শোনার পেছনে সময় দেওয়াটা হয়তো সার্থক হবে। কিন্তু, এই ধারণাটি একটি চরম মিথ্যা আশ্বাস মাত্র।
অ্যালবামের বাকি গানগুলো অতিরিক্ত প্রডিউস করা ইলেকট্রো-পপ আর পানসে হিপ-হপ টিউনসের এক জগাখিচুড়ি। গানগুলো শুনে মনে হয়, এগুলো কেউ মন থেকে লেখেনি; বরং এমন একটি অ্যালগরিদম দিয়ে তৈরি করা হয়েছে যা নতুন প্রজন্মের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে, আবার একই সাথে অন্য কাউকেও যাতে বিন্দুমাত্র বিরক্ত না করে—সেই ঝুঁকিহীন হিসাব কষে তৈরি। এর চূড়ান্ত ফলাফল এতটাই একঘেয়ে, স্বাদহীন এবং প্রাণহীন যে, তা শেষ পর্যন্ত কানের জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছে।
এই অ্যালবামের তাত্ত্বিকভাবে তথাকথিত বড় হিট গানগুলো হলো—শাকিরা ও বার্না বয়ের গাওয়া টুর্নামেন্টের অফিশিয়াল গান ‘দাই দাই’, যা সম্পূর্ণ ভুলে যাওয়ার মতো একটি গান। অন্যটি হলো জেলি রোল এবং কারিন লিওনের ‘লাইটার’—অতিরিক্ত পলিশ করা কান্ট্রি-পপের একটি স্টম্প-ক্ল্যাপিং গান, যা বড্ড বেশি আমেরিকান ঘরানার। প্রথম গানটি শুনে মনে হয়, এর প্রডিউসারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন গানটি থেকে যেকোনো মূল্যে আনন্দের অনুভূতিটুকু অস্ত্রোপচার করে বাদ দেওয়া হয়। আর দ্বিতীয় গানটি শুনলে মনে হয়, এটি কোনো ফোর্ড পিক-আপ ট্রাকের বিজ্ঞাপনের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, যা সম্ভবত অ্যারিজোনার মরুভূমির বুক চিরে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন মাথায় কাউবয় হ্যাট পরা কোনো ব্যক্তি। কোনো গানই আসলে হৃদস্পন্দন বাড়াতে পারে না।
পুরো রেকর্ডটি মূলত একই ছাঁচে ঢালা, শিল্পহীন ও সস্তা পপ গানের এক অবিচ্ছেদ্য কাদা, যা বিশ্বের কোনো প্রান্তে কোনো পার্টিতে বাজার চেয়ে কোনো অফিসের ‘হোল্ড মিউজিক’ (ফোনে অপেক্ষার সময় যে সুর বাজে) হিসেবে বেশি মানানসই হতো। কর্পোরেট নজরদারির অতিরিক্ত ছোঁয়া এতে স্পষ্ট। এমনকি এখানে অত্যন্ত বিরক্তিকর স্ট্রিমার আইশোস্পিড-এর ‘চ্যাম্পিয়ন’নামের একটি গানও রাখা হয়েছে—সম্ভবত বাজার গবেষণার রিপোর্টে দেখা গেছে যে, তার উপস্থিতি ১৬ থেকে ২১ বছর বয়সীদের বাজারে এই অ্যালবামের বিক্রি বাড়িয়ে দেবে।
সে যে বিন্দুমাত্র র্যাপ করতে পারে না তা নিশ্চিত, এবং এই অ্যালবামে তার চিৎকার-চেঁচামেচিতে ভরা হট্টগোলের গানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—পুরো অ্যালবামের মধ্যে কেবল এই একটি গানেই ‘বিশ্বকাপ’ বা ‘ফুটবল’ শব্দটির উল্লেখ পাওয়া গেছে। যদিও বিশ্বকাপ কর্তৃপক্ষ সম্ভবত চাইবে যেন আইশোস্পিড তাদের নামটি মুখেও না নিক।
তবে এই অ্যালবামের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম অংশ, অর্থাৎ পুরো ধূসর উপত্যকার সবচেয়ে গভীরতম খাদটি এসেছে ‘দ্য রোলিং স্টোনস’-এর একটি নতুন গানের অত্যন্ত বাজে রিমিক্স ‘ইন দ্য স্টারস’-এর হাত ধরে। গানটিতে একটি দাদামশাই আমলের রিফ-কে নতুন করে ঘষেমেজে এমন এক অদ্ভুত ও সস্তা ড্যান্স ট্র্যাকে রূপান্তর করা হয়েছে, যা আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন কোনো ক্লাবই তাদের ডিজে-কে বাজানোর অনুমতি দেবে না।
এটি এতটাই জঘন্য যে, ২০০০-এর দশকে গুয়ান্তানামো বে-র বন্দীদের নির্যাতন করার জন্য সিআইএ যেভাবে ‘আইরন মেইডেন’-এর গান ব্যবহার করত, আমার সেই গল্পগুলোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। ‘ইন দ্য স্টারস’-এর ওই অন্তহীন পাঁচ মিনিট শেষ হওয়ার আগেই আমি যেকোনো অপরাধের কথা স্বীকার করে নিতে রাজি ছিলাম! গানটি থামানোর জন্য আমি যেকোনো অপরাধ করতে পারতাম। এই বছর এর চেয়ে খারাপ কিছু আমি নিশ্চিতভাবেই আর শুনব না।
খারাপ লাগার বাইরেও, এই অ্যালবামটি যতটা না বেদনাদায়ক, তার চেয়েও বেশি একঘেয়ে ও নিস্তেজ। অধিকাংশ কণ্ঠশিল্পীদের আওয়াজ শুনে মনে হয়েছে তারা নিজেরাই ক্লান্ত, এমনকি অতিরিক্ত অটো-টিউন ব্যবহারের পরও তা ঢাকা যায়নি। ইভা ম্যাক্স ও বিয়া-র ‘এনার্জি’ গানটিতে শক্তির বিন্দুমাত্র অস্তিত্ব নেই। অন্যদিকে, ২১ স্যাভেজ যখন ‘থ্রি নেশনস’ গানে বলেন—লড়াইয়ের রোমাঞ্চ/ক্রোধের রোমাঞ্চ/প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়া, তখন তাকে শুনে মনে হয় ঘরের মেঝেতে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার চালাতে চালাতে তিনি কিছুটা মনোযোগ হারিয়েছেন। এটি এমন একটি অ্যালবাম যা পুরোপুরি আবেগহীন—কেবল একদল শিল্পী তাদের মোটা অঙ্কের সহজ পারিশ্রমিকের চেক পকেটে ভরার জন্য এই ১৮টি গান জুড়ে দিয়েছেন।
এই অ্যালবামটি শোনার পর আসল যে প্রশ্নটি মাথায় আসে তা হলো: এটি আসলে কার জন্য তৈরি? কারণ এটি নিশ্চিতভাবেই ফুটবল ভক্তদের জন্য নয়। আগেই বলেছি, আইশোস্পিডের গানটি এবং কিছু গানজুড়ে থাকা তথাকথিত ‘চ্যাম্পিয়ন হওয়া’, ‘প্রতিপক্ষকে হারানো’—এই জাতীয় কিছু গতানুগতিক আধো-মনোভাবের ইঙ্গিত ছাড়া ফুটবলের কোনো উল্লেখই এখানে নেই।
এখানে এমন একটি গানও নেই যা গ্যালারির দর্শকদের মুখে মুখে স্লোগান বা চ্যান্টে রূপ নেওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা রাখে; যদিও কয়েকটি গানে গ্যালারির স্লোগানের স্যাম্পল জোর করে জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে গানগুলোকে একটু ফুটবল-ফুটবল আবহ দেওয়া যায়। ফুটবল উন্মাদনার পেছনে যে আনন্দ, বেদনা আর আবেগের আবর্তন থাকে, তার সাথে সংযোগ স্থাপনের বিন্দুমাত্র চেষ্টাও কোনো গানে করা হয়নি। সহজ কথায়, এখানে ‘থ্রি লায়নস’-এর মতো চমৎকার কিছুর ছিটেফোঁটাও নেই। এটি কেবলই এক ঘণ্টার এক যন্ত্রণার নাম।
এটা স্বীকার করতেই হবে যে, ফুটবল নিয়ে এমন লিরিক লেখা যা শুনতে সস্তা বা হাস্যকর লাগবে না—তা বেশ কঠিন কাজ, যার প্রমাণ শত শত গানে রয়েছে; এক্ষেত্রে ‘থ্রি লায়নস’ ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়। তবে এই অ্যালবামের গানগুলো সেই চেষ্টাই করেনি। ‘অফিশিয়াল ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৬ অ্যালবাম’ ফুটবলকে একটি দ্বিতীয় চিন্তার জায়গাও দেয়নি। ফুটবল এখানে কোনো চিন্তার বিষয়ই ছিল না।
সত্যি বলতে, এটি মিউজিক লাভার বা গানপাগলদের জন্যও নয়। এটি বড্ড বেশি নিরাপদ, বড্ড বেশি জেনেরিক, স্বাদহীন এবং মৌলিক শৈল্পিক গুণাগুণ বর্জিত। এটি এমন একটি অ্যালবাম যা কেবল সেইসব অ্যাকাউন্ট্যান্ট আর আমলাদের খুশি করার জন্য তৈরি করা হয়েছে, যাদের ছায়া এই সৃজনশীল প্রক্রিয়ার প্রতিটি সিদ্ধান্তে জড়িয়ে ছিল। এই রেকর্ডটি মূলত কয়েক ডজন বাক্স টিক দেওয়ার (সব শর্ত মেলানোর) একটি প্রয়াস মাত্র, এই বিশ্বাসে যে এটি করলে হয়তো গণবাজারের সবার কাছে এর আবেদন থাকবে। কিন্তু বাস্তবে, এটি সম্ভবত কারো কাছেই আবেদন তৈরি করতে পারবে না। আমার পরামর্শ হলো—শুধু খেলাগুলো দেখুন, আর এই অ্যালবামটি এড়িয়ে চলুন।
সূত্র: থ্রি অ্যাডেড মিনিটস
লেখক: ম্যাথিউ গ্রেগরি, ফুটবল লেখক ও সাংবাদিক। মূলত ‘থ্রি অ্যাডেড মিনিটস’-এর একজন ফুটবল সাংবাদিক। তিনি ফুটবল ম্যাচ ও কৌশলের চুলচেরা বিশ্লেষণ, মতামতধর্মী কলাম, ইন-ডিপথ স্টোরি, খেলোয়াড় দলবদলের আপডেট এবং ‘ফ্যান্টাসি প্রিমিয়ার লিগ’ নিয়ে কাজ করেন।
ক্রীড়া সাংবাদিকতায় এক অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য নাম ম্যাথিউ। প্রিমিয়ার লিগসহ বিশ্ব ফুটবলের ওপর তাঁর গভীর জ্ঞান এবং বিশেষজ্ঞসুলভ বিশ্লেষণ তাঁকে ফুটবল দুনিয়া সম্পর্কে উচ্চমানের ও তথ্যসমৃদ্ধ মতামত প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছে।
‘৩ অ্যাডেড মিনিটস’-এর নিয়মিত এফপিএল বিশেষজ্ঞ হওয়ার পাশাপাশি তিনি তরুণ ফুটবলারদের প্রতিভা বিকাশ বা ইয়ুথ ডেভেলপমেন্টের একজন একনিষ্ঠ অনুসারী এবং ‘ওয়ান্ডারকিড পাওয়ার র্যাঙ্কিং’-এর কিউরেটর। এছাড়াও তিনি ‘বার্মিংহাম ওয়ার্ল্ড’ ও ‘ব্রিস্টল ওয়ার্ল্ড’-এর ব্রেকিং নিউজ কভার করেন। এর আগে তিনি ‘বিবিসি স্পোর্টস’-এর লাইভ স্পোর্টস কভারেজেও যুক্ত ছিলেন।
শুনে নিতে পারেন ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের অফিসিয়াল থিম সং দাই দাই








