স্মরণে মোস্তফা কামাল সৈয়দএই প্রথমবার উনি নাকে ঘষা দেননি!

Send
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত : ২০:২৪, মে ৩১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০২:২৩, জুন ০১, ২০২০

টিভি ব্যক্তিত্ব মোস্তফা কামাল সৈয়দ করোনাভাইরাসের কাছে পরাজয় মেনে নিলেন ৩১ মে দুপুরে। তার এই প্রস্থানে মিডিয়ায় নেমেছে শোকের ছায়া। বিটিভি থেকে এনটিভি, মোট পাঁচ দশকের সফল কর্মজীবন কাটিয়েছেন এই নন্দিতজন। পর্দার আড়ালের মানুষ হিসেবে তার অবদান আলাদা করে চোখে লাগার মতো। তাকে বলা হয় টিভি-মাধ্যমের সবচেয়ে আধুনিক মানুষ। যার আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে দেশের টিভি শিল্পে। সেসব ভেবেই স্মৃতিকাতর হলেন সাংবাদিক ও নির্মাতা জসীম আহমেদ। লিখেছেন, নিজের চোখে দেখা একজন মোস্তফা কামাল সৈয়দকে নিয়ে—

বিটিভির সামনে দাঁড়িয়ে বরকতউল্লাহ (বামে) ও মোস্তফা কামাল সৈয়দের (ডানে) ছবি তুলছেন সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকি





বাংলাদেশ টেলিভিশনের তৃতীয় তলায় ডিডিজি (প্রোগ্রাম)-এর বিশাল কক্ষে তার সামনে চুপ করে বসে আছি। তার পিএস পাতা ওলটাচ্ছেন আর তিনি একটার পর একটা স্বাক্ষর করছেন। সব ফাইল গুছিয়ে পিএস চলে যাওয়ার পর তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কি খবর জসীম সাহেব?’

বললাম, জি, আমাকে ফোন করে দেখা করতে বললো আপনার অফিস থেকে।
ডান হাত দিয়ে নাকের মাঝখানে প্রায় ৩০ সেকেন্ডের মতো ঘষে আমার চোখে চোখ রেখে তিনি বললেন, ‘ডকুটা দেখলাম। আপনার তো অ্যাবিলিটি আছে, ফাঁকি দিলেন কেন?’
বললাম, সীমিত বাজেট, চেষ্টা কম করিনি। আর্মি কিছু সুবিধা দেওয়ায় কাজটা শেষ পর্যন্ত করা গেলো।
এবার একটু হাসি দিয়ে বললেন, ‘দেখেন আপনি আরও ভালো করতে পারতেন এই বিশ্বাস থেকে মামুন ভাই (আব্দুল্লাহ আল মামুন), বাচ্চু (নাসির উদ্দিন ইউসুফ), বাদল রহমান, মুরাদ (মানজারে হাসিন), টুটুলদের (সাইদুল আনাম টুটুল) মতো মেকারদের সাথে আপনাকে একটা সুযোগ দেওয়া হলো।’
মন খারাপ করে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে আছি। তিনিও চুপচাপ। কিছুক্ষণ পর সাইড টেবিল থেকে একটা প্লেট সামনে এগিয়ে বললেন, ‘নেন পেয়ারা খান, কেজি পেয়ারা। আরেকটা কাজ আপনাকে দেওয়া হবে। আশা করি আরেকটু মনোযোগী হবেন। শোনেন, ডিজি সাহেব (সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকি) আর জাফর সাহেব (কাজি আবু জাফর সিদ্দিকী) আপনার কাজটা পছন্দ করেছেন বলে ১৫ ডিসেম্বর ৮টার সংবাদের পর অনএয়ার হবে। নাইলে আমি ঠিকই আটকে দিতাম।’
বিটিভির কমিশন করা ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’ সিরিজে আমার বানানো ডকুমেন্টারি ‘রক্তের অক্ষরে লেখা’-এর প্রচার শিডিউল চূড়ান্ত হওয়ার আগে ডিডিজি মোস্তফা কামাল সৈয়দের সঙ্গে আমার আলাপের অংশবিশেষ এতক্ষণ তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। সম্ভবত ৯৭ সালের ডিসেম্বর মাসের ঘটনা।
পরবর্তী সময়ে তিনি ডেকে ডেকে কত কাজ দিয়েছেন- ফিকশন, নন-ফিকশন। এবং সব কাজ জমা দেওয়ার পরই ডেকে নিয়ে নাক ঘষে একই কথা বলতেন, ‘আগের কাজটা অনেক ভালো ছিল, এই কাজটা খারাপ হলো। ধুর, আপনি ফাঁকিবাজি শুরু করছেন!’
একসময় ধরেই নিলাম এটা হলো কাজ প্রপারলি আদায় করে নেওয়ার একটা টেকনিক উনার। আরও প্রমাণ পাওয়া গেলো, যখন প্রতিমন্ত্রী আমার একটা কাজ অকারণে আটকে দিলেন তখন কামাল ভাই ফাইট করে সেটা অনএয়ার কনফার্ম করলেন। সেই ঘটনাটা স্মৃতি থেকে খানিকটা বলছি।

৯৬ সালে বিটিভি নিউজে যখন আমি জয়েন করি, তখন কামাল ভাই ডিডিজি (নিউজ) হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছিলেন। আমাকে ডেকে নিলেন তার রুমে। অনেক কিছু বলার মাঝে তিনি একটা পর্যায়ে বললেন, ‘‌করাপশন দুই প্রকার। মোরাল ও লিগ্যাল। সিস্টেমের কারণে এখানে অটো-লিগ্যাল করাপশন হয়ে যায়। প্লিজ মোরালি করাপ্ট হবেন না।’
আরেকদিন প্যানেলে এডিট করছি। তিনি আমার প্যানেলে হাজির। সাথে তখনকার তথ্য প্রতিমন্ত্রী আবু সাঈদ। এসেই প্রতিমন্ত্রী সাহেব বুঝে না বুঝে অনেক কথা বলতে শুরু করলেন। আমি প্যানেলে বসা এডিটরকে ‘পেকআপ’ বলে সোজা বের হয়ে গেলাম! পরদিন কামাল ভাই আমাকে তার রুমে ডেকে নিলেন। বললেন, ‘ট্যাক্টফুল শব্দটা প্রচণ্ড অসৎ। কিন্তু এখানে কাজ করতে হলে কিছুটা ট্যাক্টফুলি করতে হয়।’ আমি বললাম, যেটাকে আপনি অসৎ বললেন সেটা আমি করবো না। এই বলে আমি বিটিভি ছেড়ে দিলাম।
প্রতিমন্ত্রীর কাছ থেকে সেই ঘটনার প্রতিক্রিয়া পেলাম আমার একটি ডকুমেন্টারি সম্প্রচার আটকে দেওয়ার চেষ্টার মাধ্যমে। ‘বঙ্গবন্ধুর পাকিস্তান জেলজীবন’ নিয়ে বানিয়েছিলাম সেটি। মন্ত্রী আটকে দেওয়ার পর কামাল ভাই তাকে বললেন, ‘স্যার, ছবিটা প্রিভিউ কমিটির ভালো লেগেছে বলে শিডিউল ফাইনাল করলাম। আপনি ফাইলে একটু লিখে দেন, এটা বিটিভি প্রচার করবে না।’
কামাল ভাই এই ঘটনার মাধ্যমেও আমাকে শিখিয়ে দিলেন, কীভাবে ট্যাক্টফুলি কাজ করতে হয়! কারণ, মন্ত্রীর আপত্তি থাকা সত্বেও আমার ডকুমেন্টারি আটকালো না। শুধুমাত্র কামাল ভাইয়ের কারণে।

বিটিভি যুগের পর একদিন দিপু ভাই (মোস্তফা ফিরোজ) ফোন করে বললেন, ‘আমরা এনটিভি শুরু করছি। কামাল ভাই প্রোগ্রামের হেড। কিছু ডকুমেন্টারি নিয়া তোমার সাথে আলোচনা করতে বললেন, একটু আসতে পারবা কাওরানবাজার?’ ততদিনে আমি টেলিভিশনের জন্য কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছি। তবু আমি যাই এবং জানাই আমার অবস্থান।
কান উৎসবের লালগালিচায় জসীম আহমেদদু’বছর আগে অম্লান বিশ্বাস জানালো, কামাল ভাই জানতে চান আমি কেমন আছি। কিছু না বলে উনার অফিসে গিয়ে দেখা করে জানালাম কেমন আছি। তখনও উনি বারবার বলছিলেন ডকুমেন্টারি বানানো কনটিনিউ করতে। ফোনেই দেখালাম আমার ‘আ পেয়ার অব স্যান্ডেল’। আর বললাম, এটা মোবাইলে করা। এই প্রথমবার উনি নাকে ঘষা দেননি। শুধু বললেন, ‘গুড ওয়ান’।
বিটিভির নিউজে অল্প কিছু দিন কাজ করেছি আমি। তখন কামাল ভাই ডিডিজি (নিউজ) ছিলেন। পরবর্তী সময়ে যখন স্বাধীনভাবে কাজ করা শুরু করলাম তখনও তিনি ডিডিজি (প্রোগ্রাম)। ওই সময়ে কামাল ভাইর স্নেহ ভালোবাসা পেয়েছি। কাজ-পাগল কামাল ভাই কখনও অবসরে যেতে চাননি।
কামাল ভাইয়ের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। বিশেষ করে উনাদের হাত দিয়ে আমাদের বেড় ওঠা। কিন্তু লিখতে পারছি না। চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।

লেখক: সাংবাদিক ও নির্মাতা
করোনায় মারা গেলেন এনটিভির অনুষ্ঠান প্রধান মোস্তফা কামাল সৈয়দ

/এমএম/এমওএফ/

লাইভ

টপ