৭২ দিন ঘরবন্দি থেকে অভিনেতা বেছে নিলেন মুসাফির জীবন!

Send
মাহমুদ মানজুর
প্রকাশিত : ০০:০৯, জুন ০৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:২৬, জুন ০৪, ২০২০

মানিকগঞ্জে শুটিংয়ের বাইরে মাজনুন মিজানএকজন কর্মক্ষম পেশাদার অভিনয়শিল্পী ঘরের বাইরে অথবা শুটিং স্পটে দশ, পনের কিংবা এক মাসও ব্যস্ত থাকতে পারেন। দেশের বাইরে হলে দিনের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। সে হিসেবে ১৫ দিনের ‘মুসাফির জীবন’ শুনে হতচকিত হওয়ার কিছু নেই।

কিন্তু সময়টা তো শিরোনামের পক্ষে নয়। পক্ষ বিপক্ষেরও বিষয় নয়, এটা এই সময়ের জন্য অবিশ্বাস্য! হুম, সেই ঘটনারই অংশীদার হলেন অভিনেতা মাজনুন মিজান। টানা ৭২ দিন ঘরে থেকে অবশেষে ২ জুন বেরিয়ে পড়লেন লম্বা শুটিং সফরে। মনে মনে নিশ্চয়ই বলেছেন নিজেকে, ‘যা আছে কপালে...’!
কারণ, তার এই সফর এক দুদিনের জন্য নয়, টানা ১৫ দিনের। স্বাভাবিক সময়ে যেমনটা সচরাচর ঘটে না কোনও অভিনয় শিল্পীর ক্ষেত্রে। বিশেষ করে মানিকগঞ্জ-উত্তরা-পুবাইলে শুটিংয়ে সকালে গিয়ে রাতে বাসায় ফেরাটাই স্বাভাবিক ঘটনা। অথচ, মাজনুন এই করোনাকালে এসব লোকেশনেই টানা ১৫ দিন কাটাবেন!
সময়টা ‘অসময়’ বলেই হয়তো মাজনুন তার শুটিংয়ের জাল পেতেছেন এভাবে।
৩ জুন সন্ধ্যায় পুবাইলের শুটিং ইউনিটের বিশ্রামাগারে পিঠ এলিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে এই বহুমাত্রিক অভিনেতা বললেন সবিস্তার। তার ভাষায়, ‘২ জুন শুটিং করেছি মানিকগঞ্জের নবগ্রামে। চলছে বিটিভির একটি ধারাবাহিক। সেখান থেকে দুদিনের ছুটি নিয়ে আজ (৩ জুন) সকালে এলাম পুবাইল। এখানে অংশ নিলাম দুটি বিশেষ নাটিকায়। কাল (৪ জুন) পুবাইলের কাজ শেষ করে যাবো ফের মানিকগঞ্জ। সেখানে দুদিন শুটিং করে যাবো গাজীপুরের উলুখোলায়। সেখানে অংশ নেবো একটি ধারাবাহিকের কাজে। বলতে পারেন পুরো মুসাফিরের মতো হয়ে গেলাম। করোনা আমাকে অভিনয়ের মুসাফির বানিয়ে দিলো।’
স্বাভাবিক সময়ে মাজনুন মিজান (পুরনো ছবি)মিজানের আলাপে এটুকু আভাস, প্রথমত তিনি এই মহামারি মাথায় নিয়ে শুটিং করতে চাইছেন না। আবার এক দুদিনের জন্য এত বড় রিস্ক নিয়ে ঘরে ফেরাও ঠিক হবে না। তাই তিনি ১৫ দিনের পুরো শুটিং শিডিউল-লোকেশন ম্যানেজ করে লাগেজ নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন মুসাফিরের বেশে।
তার ভাষায়, ‘দেখুন আরও এক দেড় মাস বাসায় থাকার পরিস্থিতি যদি থাকতো আমার পকেটে, তাহলে কোটি টাকার লোভ পেলেও জীবনের এই রিস্ক নিতাম না। বুঝতেই পারছেন, ১৫ দিনের প্ল্যান নিয়ে বেরিয়েছি। এরমধ্যে শুটিং অফার পেলে সময় আরও বাড়াবো। কারণ, আমি চাইনি এক দুদিন শুটিং করে বাসায় ফিরে স্ত্রী-সন্তানদের অনাহূত আতঙ্ক বা বিপদে ফেলতে। আমি ৭২ দিন শুটিং ছাড়া বাসায় বসে ছিলাম। অভ্যাসের বিচারে এটা যেমন অবিশ্বাস্য তেমনি অর্থনৈতিক বিচারেও একই বিষয়। এটাই তো আমার পেশা। আমাকে তো খেয়ে-পরে বাঁচতে হবে। নাকি না?’
মাজনুন মিজানের প্রশ্ন ও পরিকল্পনায় কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়। এটাও তো বড় সত্যি, বাঁচার বিকল্প নেই। খবর নিয়ে জানা গেছে, করোনাকালে শুটিং বন্ধ হওয়ার পর মাজনুন মিজানের মতো এভাবে লম্বা সময়ের প্ল্যান নিয়ে এখনও কেউ মাঠে নামেনি। না নির্মাতা, না শিল্পী। নিজের প্রোটেকশন কেমন নিয়েছেন কিংবা শুটিং প্রক্রিয়াই বা কেমন?
মিজান বলেন, ‘বললে বিশ্বাস করবেন না, কেমন প্রতিরোধ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমি নিজেকে পার করছি। কারণ, আমাকে তো মিনিমাম ১৫ দিন এভাবে গ্রামে-গঞ্জে কাটাতে হবে। আরেকটি স্বস্তির বিষয়, দুটি ইউনিটে গেলাম গেল তিন দিনে। দুটোতেই অসম্ভব প্রস্তুতি। শুধু স্বাস্থ্যবিধি পালনের জন্য আলাদা লোক নিয়োগ হয়েছে ইউনিটে। যেটা জীবনেও আমরা দেখিনি। সবাই মাস্ক, গ্লাভস পরছি। স্যানিটাইজার ইউজ করছি পানির মতো। প্রত্যেকটি যন্ত্র-আসবাব স্প্রে হচ্ছে। আমি খুবই সন্তুষ্ট এই সচেতনতা দেখে। আমার ধারণা, এমন সচেতন থাকলে শুটিংয়ে ফিরবে স্বাভাবিক প্রাণ।’
শুটিং ইউনিটে রয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা। এটা স্বস্তির খবর অন্যদের জন্য। নিশ্চয়ই খুব দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে উঠবে উত্তরা-পুবাইলের শুটিংপাড়াগুলো। মিজানের ভাষ্যমতে, তার দুটি ইউনিটের বাইরে এখনও তেমন কোনও শুটিংয়ের খবর কানে আসেনি। তার ভাষায়, ‘শুটিংয়ের প্রাণকেন্দ্র পুবাইল এখন কাঁদছে। কোথাও কেউ নেই।’


পুবাইলে চলছে শুটিং, ক্যামেরার সামনে জ্যোতিকা জ্যোতি। একই ইউনিটে রয়েছেন মাজনুন মিজানওপ্রশ্ন ছিল, শুটিং ইউনিটের বাইরে মানিকগঞ্জ বা পুবাইলের সাধারণ মানুষদের মধ্যে করোনা বিষয়ে সচেতনতা কেমন? তারা কী আগের মতোই শুটিংজুড়ে ভিড় জমায়! মাজনুন মিজান বলেন, ‘সেটাই তো বড় ভয়। কোনও পরিবর্তন নেই আমার সাধারণ ভাই-বোনদের। তারা এখনও সমান অবুঝ! সেই একই আগ্রহ, একই জটলা, একই উদাসীনতা। বেশিরভাগই মাস্ক ব্যবহার করে না। বললেও কথা কানে নেয় না। আমার মনে হলো, করোনার ভয়াবহতা গ্রামগুলোতে এখনও পৌঁছায়নি। এই মানুষগুলোকে সচেতন করা দরকার। কিন্তু কে করবে?’
মানিকগঞ্জে মাজনুন মিজান যে ধারাবাহিকটির শুটিং শুরু করেছেন তার নাম ‘সন্ধ্যা পাড়ের জীবন’। ১৩ পর্বের বিটিভির এই ধারাবাহিকটিতে উঠে আসবে মানুষকে স্বাস্থ্য-সচেতন করে তোলার নানা বিষয়। অন্যদিকে পুবাইল যে দুটি নাটিকায় অংশ নিলেন সেটি নির্মিত হচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে। নাম ‘বকুলের বিবাহ’ ও ‘বকুলের সংসার’। বিষয় মাতৃস্বাস্থ্যের ওপর সচেতনতা সৃষ্টি। এতে মাজনুন অভিনয় করছেন শিক্ষকের চরিত্রে। ফাখরুল আরেফীন খানের নির্মাণে জনসচেতনতামূলক এই প্রজেক্টের আরেকটি অন্যতম চরিত্রে আছেন জ্যোতিকা জ্যোতি।
মানিকগঞ্জ ও পুবাইলের কাজ দুটির পাশাপাশি এই সফরে মিজানের তৃতীয় প্রজেক্ট হচ্ছে গাজীপুরের উলুখোলায়। রাজিবুল ইসলাম রাজীবের এই প্রজেক্টটিও ধারাবাহিক নাটক। তবে নাম এখনও জানেন না। এতে মাজনুন অংশ নেবেন ৯ জুন থেকে।
মিজান জানান, লকডাউনে আটকে যাওয়ার আগে তিনি শেষ শুটিং করেছেন প্রায় তিন মাস আগে কলকাতায়। সেখানে তিনি অংশ নিয়েছেন শামীম আহমেদ রনীর ‘কমান্ডার’ সিনেমায়।
কেমন লাগছে লম্বা ঘরবন্দির পর ফের শুটিংয়ে-আউটডোরে, মুক্ত আলোয় ফিরে? জবাবে একটু দ্বিধাগ্রস্ত মাজনুন। বললেন, ‘আসলে এটাকে মুক্তি বলা যাবে কিনা বুঝি না। পেশাদার অভিনেতা হিসেবে এটা মুক্তি বটে! আবার জীবনের দায়ও বলা যায়। আগেই বলেছি, ঘরে থাকার মতো সঞ্চয় থাকলে আমি এই অসময়ে মুসাফিরের বেশে বের হতাম না। আমার মতো এই দেশের সিংহভাগ মানুষ একই যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। অথচ মুক্তির পথ জানা নেই। সে হিসেবে, এই শুটিং সফরে বেরিয়ে পড়াটা আমার জন্য মুক্তির মতোই আনন্দের।’মানিকগঞ্জের শুটিংয়ে সহশিল্পীদের সঙ্গে মাজনুন মিজান

/এমএম/এমওএফ/

লাইভ

টপ