৯/১১ হামলার পরিকল্পনাকারীরা নিজেরাই জানেন না, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিপরীতে কী কী প্রমাণ রয়েছে মার্কিন রাষ্ট্রপক্ষের হাতে। বিচার প্রক্রিয়ায় গোপনীয়তার কথা বলে এমনটা করা হয়েছে। অভিযুক্তদের অবগতি ছাড়াই ওইসব ‘প্রমাণ’ ধ্বংসেরও আদেশ দেন ওই সামরিক আদালত। এতে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে গোটা মার্কিন বিচারব্যবস্থা।
মার্কিন সেনা কমিশন গত ১০ মে ওইসব নথি উন্মুক্ত করে। প্রভাশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান খবরটি নিশ্চিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গুয়ানতানামো বে কারাগারে বছরের পর বছর আটক রয়েছেন ৯/১১ হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত খালিদ শেখ মোহাম্মদ। ৯/১১-র মামলায় সেনা বিচারকদের কার্যক্রম নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন তুলছিলেন অভিযুক্তদের আইনজীবীরা। সম্প্রতি সেনা কমিশন থেকে কিছু গোপন নথি উন্মুক্ত করা হয়। সেনা প্রশাসসের এইসব গোপন নথি থেকে জানা যায়, গুয়ানতানামো বে-র বিশেষ সেনা ট্রাইব্যুনালের বিচারক ৯/১১ মামলায় সরকারি প্রসিকিউশনের নির্দেশে প্রমাণ বিনষ্ট করার আদেশ দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনালের বিচারক কর্নেল জেমস বিবাদী পক্ষ এমনকি তাদের আইনজীবীদেরও পোহল মামলার তথ্য-প্রমাণ না দেখানোর আদেশ দেন। ওই বিতর্কিত মামলায় চলতি সপ্তাহে আবারও বিচার পূর্ববর্তী শুনানি শুরু হয়েছে।
অভিযুক্ত খালিদ শেখের আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন, ট্রাইব্যুনালের বিচারক এবং সরকারি পক্ষের প্রসিকিউটররা মিলে মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত ধ্বংস করেছেন। বিচারক গোপন প্রক্রিয়ায় গোপন আদেশ প্রদান করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এক নথিতে দেখা যায়, মোহাম্মদের আইনজীবীরা ৯/১১-এর বিচার প্রক্রিয়াকে সন্ত্রাসবাদের মামলায় সেনা বিচারের ‘কলঙ্কিত অধ্যায়’ বলে উল্লেখ করেছেন।
মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি দাঁড়ানো মোহাম্মদ নথিতে বলছেন, ‘প্রথমে তারা বললেন যে, তারা আমাদের সামনে তথ্য-প্রমাণ হাজির করবেন না, কিন্তু আমাদের আইনজীবীদের তা দেখাবেন। কিন্তু এখন তারা আমাদের আইনজীবীদেরও দেখাবেন না। তারা আমাদের মেরে ফেলছেন না কেন?’
মোহাম্মদের আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন, সামরিক বিচার প্রক্রিয়ার গোপনীয়তা এবং আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে প্রমাণ লোপাট করলেও, এর বিরুদ্ধে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন না। পুরো মামলাটিই ‘সাজানো’ বলে অভিযোগ করেন তারা। আইনজীবীরা এই প্রক্রিয়াকে ‘বৈচারিক হত্যার কাছাকাছি’ বলেও উল্লেখ করেছেন।
আইনজীবীরা বলেন, ‘আইনত জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থ যা-ই থাকুক না কেন, যে গোপন প্রক্রিয়ায় ওই মামলা পরিচালিত হয়েছে, তাতে এই বিষয়টি পরিষ্কার যে, মোহাম্মদের বিরুদ্ধে চালানো মামলাটি ভুল পথে পরিচালিত হয়েছে। আর এজন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ লোপাট করা হয়েছে।’
তবে আদালত কোন ধরণের তথ্য-প্রমাণ ধ্বংস করেছেন, সে সম্পর্কে ওই প্রকাশিত নথিতে নিশ্চিত করা হয়নি। এ সম্পর্কিত ‘ক্লাসিফায়েড’ নথি এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
২০১৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর সামরিক আদালতের বিচারক পোহল ‘অন্যদেশে অবস্থিত মার্কিন জেলখানাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে’ আদেশ দেন। এটি মার্কিন জেলখানার এক ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায়’, যেখানে সিআইএ এবং তার সহযোগী সংস্থাগুলো মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়।
প্রকাশিত নথি অনুসারে, পোহল তথ্য-প্রমাণ গোপন রাখার আদেশ প্রদানের ছয় মাস পর প্রসিকিউশনের আপত্তির মুখে বিচারক ফেডারেল সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ তথ্য-প্রমাণ ধ্বংস করার কর্তৃত্ব প্রদান করেন। ধারণা করা হচ্ছে, নিরাপত্তা কাউন্সিলের পরামর্শ ছাড়াই সরকার এবং বিচারক পোহলের মধ্যকার যোগাযোগের ভিত্তিতে ওই আদেশ দেওয়া হয়।
বিবাদী আইনজীবীদের মতে, তাদের কাছে ওই আদেশের একটি ‘সম্পাদিত সংস্করণ’ পাঠান হয়েছিল। কিন্তু ওই আদেশের ১৮ মাসের মধ্যেও প্রসিকিউশন ওই তথ্য-প্রমান উপস্থাপন করেনি। যদিও ওই আদেশের ১ বছর পর তথ্য-প্রমাণগুলো ধ্বংস করা হয়।
মোহাম্মদের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ অপর একটি গোপন আদেশের জন্য সামরিক বিচারক পোহলের প্রমাণ ধ্বংসের আদেশের কপিটিও দেওয়া হয়। ওই তথ্য-প্রমাণের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ থাকার পরেও কোনও রকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই ওই তথ্য-প্রমাণকে নষ্ট করে দেওয়া হয়। আইনজীবীরা মনে করেন, ওই রায়ে সেনা কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
এদিকে, ২৪ মে ওই মামলার রাষ্ট্র পক্ষের প্রসিকিউটর ব্রিগেডিয়ার মার্ক মার্টিনস মোহাম্মদের আইনজীবীদের বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন। তবে মোহাম্মদের আইনজীবীরা বলেন, সেনা কমিশন দুই সপ্তাহ পর তথ্য প্রকাশ করে। ব্রিগেডিয়ার মার্টিনস মে-র প্রথমদিকেই মোহাম্মদের আইনজীবীদের বক্তব্যের বিরোধিতা করেন।
চার বছর পূর্বে পেন্টাগন মোহাম্মদকে ৯/১১ হামলার জন্য অভিযুক্ত করলেও, মূল বিচার প্রক্রিয়া এখনও শুরু হয়নি। এখন বিচার পূর্ববর্তী শুনানি চলছে। মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীদের আইনজীবীদের ওপর এফবিআই নজরদারি করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। যা বিচার প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতাকে নির্দেশ করে।
উল্লেখ্য, মোহাম্মদ এবং তার সঙ্গীরা এ নিয়ে দ্বিতীয় সামরিক কমিশনের মুখোমুখি হচ্ছেন। এর আগে ওবামা প্রশাসন ২০০৮ সালে গঠিত কমিশন বিলুপ্ত ঘোষণা করেন ২০১০ সালে। তখন সামরিক কমিশনের বিচার প্রক্রিয়া বেসামরিক আদালতে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নে সামরিক কমিশনগুলো ভেঙে দেওয়া হয়।
ফোর্ডহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ল’ স্কুলের সেন্টার অন ন্যাশনাল সিকিউরিটি-র পরিচালক ক্যারেন গ্রিনবার্গের মতে, ‘প্রমাণ লোপাট’-এর অভিযোগটাই সেনা ট্রাইব্যুনালের মোদ্দা কথা। তিনি বলেন, ‘এটি সম্ভবত সেনা কমিশনের অস্থিতিশীলতার এক বিশাল নিদর্শন।’
তিনি আরও বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, ওই বিচার প্রক্রিয়া ফেডারেল আদালত থেকে সরিয়ে নেওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো, তা হলে সেটা হতো এক সার্কাস। আর এখন বিভ্রান্তির জালে পুরো বিচারব্যবস্থাকেই সার্কাসে পরিণত করা হয়েছে।’ সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।
আরও পড়ুন:
সিঙ্গাপুরে যেভাবে সংগঠিত হয় বাংলাদেশি ‘জঙ্গি’রা
থাইল্যান্ডের মন্দিরে মন্দিরে বাঘ, অভিযানে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ
দুর্নীতির অভিযোগে ফেঁসে যাচ্ছেন নেতানিয়াহুর স্ত্রী!
/এসএ/বিএ/








