আফগানিস্তানের বিদ্রোহী গোষ্ঠী তালেবান-এর সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির মূলনীতি হিসেবে ২০ সপ্তাহের মধ্যে পাঁচ হাজার চারশ’ সেনা প্রত্যাহার করে নেবে যুক্তরাষ্ট্র। আফগানিস্তানে এক টিভি সাক্ষাৎকারে সম্ভাব্য ওই চুক্তির বিস্তারিত জানান ওয়াশিংটনে নিযুক্ত আফগান বিষয়ক দূত জালমাই খলিলজাদ। তবে এই চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদন পেতে হবে বলে জানান তিনি। তালেবান প্রতিনিধিদের সঙ্গে নবম ধাপের আলোচনার ফলাফল আফগান সরকারকে জানানোর পরে এই সাক্ষাৎকার দেন তিনি। সোমবার সাক্ষাৎকার সম্প্রচারের পর কাবুলে বিদেশিদের আবাসিক এলাকায় বড় ধরনের হামলার ঘটনা ঘটে। এতে পাঁচ জন নিহত ও অনেকে আহত হয়েছে। হামলার দায় স্বীকার করেছে তালেবান।
টুইন টাওয়ার হামলার পর আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের অংশ হিসেবে সামরিক জোট ন্যাটো হামলা চালিয়ে তালেবান সরকারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে। তখন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই করে যাচ্ছে গোষ্ঠীটি। দীর্ঘ ১৮ বছরের যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে গত বছরের জুন থেকে কাতারের রাজধানী দোহায় মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা শুরু করেন তালেবান কর্মকর্তারা। গত সপ্তাহে সেখানে দুই পক্ষের নবম ধাপের আলোচনা শেষ হয় ।
বৈঠকের একপর্যায়ে দোহায় অবস্থিত তালেবানের রাজনৈতিক কার্যালয়ের মুখপাত্র সুহাইল শাহিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর ইঙ্গিত দেন। ওই সময়ে মার্কিন কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কোনও কথা না বললেও বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, চুক্তির বিষয়ে আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানিকে জানাতে কাবুল সফরে যেতে পারেন যুক্তরাষ্ট্রের মুখ্য আলোচক খলিলজাদ।
কাবুল সফরের সময় আফগান সম্প্রচারমাধ্যম টোলো নিউজকে তালেবান বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য চুক্তির বিস্তারিত জানান খলিলজাদ। সোমবার ওই সাক্ষাৎকার সম্প্রচারিত হয়। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহারের বিনিময়ে তালেবান কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করবে যে আফগানিস্তান আবারও এমন কোনও সশস্ত্র গোষ্ঠীর ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হবে না, যারা যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের ওপর হামলা চালাতে চায়। তিনি বলেন, আমরা একমত হয়েছি যে, যদি চুক্তি অনুযায়ী সব শর্ত ঠিকঠাক চলে তাহলে আমরা বর্তমানে উপস্থিত থাকা পাঁচটি ঘাঁটি ১৩৫ দিনের মধ্যে ছেড়ে দেবো।
বর্তমানে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৪ হাজার সেনা সদস্য রয়েছে। তালেবানের এক মুখপাত্র ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে জানিয়েছেন, খলিলজাদ যে পরিমাণ সেনা প্রত্যাহারের কথা বলেছেন তা ঠিকই আছে। বিবিসি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাকি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি কয়েকটি শর্তের ওপর নির্ভর করবে। এরমধ্যে রয়েছে আফগান সরকার ও তালেবানের মধ্যে শান্তি আলোচনা শুরু এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর।
এই চুক্তির বিষয়ে কোনও মন্তব্য করার আগে আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি তা ভালোভাবে খতিয়ে দেখবেন বলে জানিয়েছেন তার এক মুখপাত্র। তিনি জানান, আফগান সরকারের কাছে এখন প্রমাণ হতে হবে যে তালেবান আসলেই শান্তি চায়।
২০০১ সালে মার্কিন আগ্রাসন শুরুর পর থেকে বর্তমানে আফগানিস্তানের সবচেয়ে বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে তালেবান। বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি আফগান সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল আখ্যা দিয়ে তাদের সঙ্গে কোনও আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে।
২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসন শুরুর পর আন্তর্জাতিক জোটের প্রায় সাড়ে তিন হাজার সদস্য নিহত হয়েছে। এরমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা সদস্য রয়েছে প্রায় দুই হাজার তিনশ’। তবে আফগানিস্তানের বেসামরিক, তালেবান বিদ্রোহী ও সরকারি সেনার সংখ্যা নির্দিষ্ট করা কঠিন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আফগান যুদ্ধে ৩২ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন ইনস্টিটিউট জানায়, এই যুদ্ধে ৫৮ হাজার নিরাপত্তা সদস্য ও প্রায় ৪২ হাজার বিদ্রোহী সেনা নিহত হয়েছে।







