বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই পানিকে দেখেছে ভাটির দেশের চোখ দিয়ে। কিন্তু ব্রহ্মপুত্র নিয়ে চীনের মহাপরিকল্পনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ঢাকা ও নয়াদিল্লিকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করাচ্ছে, যেখানে প্রতিবেশী দুই দেশের স্বার্থের মিল ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের জন্য পানির রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে একটি সহজ ভৌগোলিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে; যেখানে নদী বয়ে আসে উজান থেকে, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ভাটিতে। সেই ঝুঁকির সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ তিস্তা। কিন্তু পানির নিরাপত্তার বড় প্রশ্নটি হয়তো এখন আরও অনেক দূরে, তিব্বতে। সেখানেই ইয়ারলুং সাংপো নদীর উৎপত্তি। এরপর অরুণাচল প্রদেশ দিয়ে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করে সিয়াং নামে। আসামে এসে এর নাম হয় ব্রহ্মপুত্র এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে এসে যমুনা নামে প্রবাহিত হয়।
এই ভূগোল বাংলাদেশ ও ভারতকে তাদের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে, যে সম্পর্ক এতদিন মূলত পৃথক পৃথক নদী নিয়ে বিরোধ ও দরকষাকষির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
ফারাক্কা, তিস্তা, শুষ্ক মৌসুমের পানিপ্রবাহ এবং সেচের প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। কিন্তু এখন আর এই প্রশ্নগুলোই পুরো চিত্রকে বর্ণনা করে না। জলবায়ু পরিবর্তন হিমালয় অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের ধরন এবং নদীগুলোর আচরণ বদলে দিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইয়ারলুং সাংপোর নিম্ন অববাহিকায় চীনের বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা, যা নদীটির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনায় নতুন এক কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি করেছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির নির্মাণকাজ ২০২৫ সালে শুরু হয়েছে এবং এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে পরিণত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বেইজিং বলছে, এর ফলে ভাটির দেশগুলোর স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কিন্তু পানির প্রবাহ, পলি, পরিবেশব্যবস্থা এবং প্রকল্প সম্পর্কে সীমিত তথ্যের কারণে ভারত ও বাংলাদেশ উভয়েই প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলাদেশের জন্য এর গুরুত্ব খুব পরিষ্কার। নদীটি চীনের সীমান্তে থেমে যায় না। ভারত একই সঙ্গে চীনের ভাটির দেশ এবং বাংলাদেশের উজানের দেশ। এই অবস্থান ভারতকে একটি অনন্য জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। ব্রহ্মপুত্রে উজানের তৎপরতা এবং ভাটির দেশগুলোর স্বার্থ নিয়ে নয়াদিল্লি বেইজিংয়ের কাছে উদ্বেগ জানিয়েছে। ঢাকার জন্য এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলের জায়গা তৈরি হয়েছে। পানির নীতির সব বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের একমত হওয়ার প্রয়োজন নেই; কিন্তু চীনের কাছ থেকে আরও বেশি স্বচ্ছতা পাওয়ার বিষয়ে দুই দেশের স্বার্থ যে এক, তা অস্বীকার করারও সুযোগ নেই।
তবে কয়েক দশক ধরে ভারত-বাংলাদেশের পানি কূটনীতি মূলত দ্বিপক্ষীয় আলোচনার কাঠামোর মধ্যেই আটকে আছে। তিস্তা তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা নিয়ে বাংলাদেশের যৌক্তিক উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমের রয়েছে কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের জীবিকার নিজস্ব প্রয়োজন। এই স্বার্থগুলোর মধ্যে সমন্বয় না হওয়ায় একটি পূর্ণাঙ্গ তিস্তা চুক্তি এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশ ভাগ করে নেয় ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা মিলিয়ে যে নদীব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, তা রাজনৈতিক সীমানার খুব একটা তোয়াক্কা করে না। ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি তাই পূর্বানুমানযোগ্য পানি বণ্টনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির। চুক্তিটির বর্তমান ৩০ বছরের মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। ফলে এর নবায়নও দুই দেশের সম্পর্কের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন আরও বিস্তৃত একটি দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি আর শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি; এই পুরোনো বিভাজনও এখন আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য নয়। অতিবৃষ্টি ভয়াবহ বন্যা ডেকে আনতে পারে, আবার দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক সময় পানির সংকটকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। অর্থাৎ একই নদী কখনও বন্যার হুমকি, কখনও পানির সংকটের উৎস হয়ে উঠতে পারে।
তাই বাংলাদেশের কাছে পানির নিরাপত্তার অর্থ এখন শুধু কোনো নদী থেকে একটু বেশি পানি নিশ্চিত করা নয়। এর অর্থ নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া, পূর্বানুমানযোগ্য পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। তিব্বত, অরুণাচল প্রদেশ বা আসামে অস্বাভাবিক পানিপ্রবাহ তৈরি হলে ভারত আগাম সতর্কতা দিতে পারে। একইভাবে বাংলাদেশের ভাটির তথ্য ভারতকে পলি জমার পরিবর্তন, বন্যার সমতলে পানি ধরে রাখার ক্ষমতা এবং নদীর গতিপথের পরিবর্তন বুঝতে সাহায্য করতে পারে।
এখান থেকেই একটি আঞ্চলিক নদী-তথ্যব্যবস্থার ধারণা সামনে আসে। যেখানে থাকবে প্রায় তাৎক্ষণিক জলপ্রবাহের তথ্য, আগাম বন্যা সতর্কতা, সমন্বিত দুর্যোগ মোকাবিলার ব্যবস্থা, পলি পর্যবেক্ষণ, জলবায়ু পূর্বাভাস এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে আরও বেশি স্বচ্ছতা।
এ ধরনের সহযোগিতা তিস্তা সমস্যার সমাধান করবে না। গঙ্গা নিয়েও মতপার্থক্য দূর হবে না। আবার চীন ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বড় একটি নতুন শক্তি হয়ে উঠেছে বলে বাংলাদেশ তার ন্যায্য দাবিগুলো থেকেও সরে যেতে পারে না। তবে এর বড় শিক্ষা হলো; একটি নদীর যে অংশটি নিজের সীমানার ভেতরে পড়েছে, শুধু সেটুকু ব্যবস্থাপনা করে কোনো দেশ দীর্ঘমেয়াদি পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না।
একই নদী, ভিন্ন দেশে ভিন্ন নাম
চলতি মাসে দিল্লিতে এই অভিন্ন স্বার্থ নিয়ে আলোচনার একটি সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ভারত সফর করেন। সাত বছর পর এটি ছিল তার প্রথম ভারত সফর।
ভারত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। বর্তমানে বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে তার সেই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নেয়, তিনি সেখানে যাবেন না। ঢাকা স্পষ্ট করে জানায়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। বরং তার প্রথম ভারত সফর উপযুক্ত সময়ে দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবেই হওয়া উচিত।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে অবশ্য এই সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতি অবশ্য একটি ‘সুযোগ হাতছাড়া’ হওয়ার মতোই দেখা যেতে পারে। নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যে অন্য অনেক বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও তার উপস্থিতি এমন একটি সময়ে ভারত ও বাংলাদেশকে ব্রহ্মপুত্র এবং চীনের উজানের পরিকল্পনা নিয়ে অভিন্ন উদ্বেগ জানানোর সুযোগ তৈরি করতে পারতো, যখন শি জিনপিং দিল্লিতে ছিলেন। সেই ‘সুযোগ’ অবশ্য এখন পেরিয়ে গেছে। কিন্তু মূল বাস্তবতা রয়ে গেছে।
চীনের ব্রহ্মপুত্র প্রকল্পের সম্ভাব্য ভাটির প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশ তথ্য ও নিশ্চয়তা চেয়েছে। ভারতও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছে। বাংলাদেশের সামনে ভারত ও চীনের মধ্যে কোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার প্রশ্ন নেই। তার স্বার্থ আরও সরল। কোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্প যদি একটি আন্তঃসীমান্ত নদীর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, তাহলে ভাটির দেশগুলোর সেই প্রকল্পের নকশা, পরিচালনাপদ্ধতি, পরিবেশগত প্রভাব এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে সময়মতো তথ্য পাওয়ার অধিকার থাকা উচিত। এই নীতি চীনা, ভারতীয় কিংবা বাংলাদেশি; যে দেশের প্রকল্পই হোক, সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
ব্রহ্মপুত্র তাই ভারত-বাংলাদেশের পানি কূটনীতিকে নতুন করে ভাবার একটি সুযোগ তৈরি করছে। চীন ও বাংলাদেশের মাঝখানে ভারত যে মধ্যবর্তী অবস্থানে রয়েছে, তা নয়াদিল্লি এড়িয়ে যেতে পারে না। একইভাবে কয়েকটি দেশের সীমানা পেরিয়ে আসা নদীর ওপর বাংলাদেশের নির্ভরশীলতার বাস্তবতাও ঢাকা এড়িয়ে যেতে পারে না।
তবে ভারত চাইলে পানি নিয়ে উদ্বেগের একটি উৎস হওয়ার বদলে যৌথভাবে সহনশীলতা তৈরির অংশীদার হয়ে উঠতে পারে। তার জন্য প্রয়োজন হবে একেকটি নদী নিয়ে আলাদা আলাদা দরকষাকষির বাইরে গিয়ে পুরো অববাহিকাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখা।
তিস্তা গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। গঙ্গাও রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর থাকবে। কিন্তু বড় পরীক্ষাটি হয়তো ব্রহ্মপুত্রকে ঘিরেই। তিব্বত থেকে অরুণাচল প্রদেশ, আসাম হয়ে বাংলাদেশ; এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে নদীটি যেন এমন একটি সত্য সামনে আনছে, যা রাজনীতি অনেক দিন ধরেই স্বীকার করতে অনাগ্রহী: দক্ষিণ এশিয়ার পানির নিরাপত্তার মানচিত্র রাজনৈতিক মানচিত্রের সঙ্গে মেলে না।
জলবায়ুর অনিশ্চয়তার এই সময়ে তাই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়তো শুধু পানি নয়। তথ্যের ওপর দাঁড়ানো আস্থাও।









