আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে পাকিস্তানের ভয়াবহ বিমান হামলার দুদিন পার হয়ে গেলেও এখনও নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন পরিবার ও বন্ধুরা। সোমবার রাতের এই হামলাটি দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার কয়েক মাসের সংঘাতের মধ্যে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘটনা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এ খবর জানিয়েছে।
আফগান তালেবান সরকার জানিয়েছে, পবিত্র রমজান মাস শেষ হওয়ার কয়েক দিন আগে যখন নিরাময় কেন্দ্রের রোগী ও কর্মীরা নামাজে ছিলেন, তখনই এই হামলা চালানো হয়। এতে এখন পর্যন্ত ৪ শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন অন্তত ২৬৫ জন।
পাকিস্তান এই হামলার দায় স্বীকার করলেও হতাহতের তথ্য নিয়ে ভিন্ন দাবি করেছে। ইসলামাবাদ বলছে, তারা অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে ‘সামরিক স্থাপনা এবং সন্ত্রাসী সহায়তা অবকাঠামো’ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের দাবি, হামলার পর যে ভয়াবহ বিস্ফোরণ দেখা গেছে, তা প্রমাণ করে সেখানে বড় ধরনের গোলাবারুদের মজুদ ছিল।
তবে আফগান কর্তৃপক্ষ বলছে, হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল একটি সুপরিচিত নিরাময় কেন্দ্র। এটি প্রায় এক দশক আগে ক্যাম্প ফিনিক্স নামক একটি ন্যাটো সামরিক বেস থেকে বেসামরিক সুবিধাসম্পন্ন নিরাময় কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছিল। ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে যখন পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল, ঠিক সেই মুহূর্তে এই হামলা দুই প্রতিবেশী মুসলিম দেশের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটিয়েছে।
বুধবার সকালে নিরাময় কেন্দ্রের ধ্বংসস্তূপের সামনে ভিড় জমান বহু মানুষ। স্বজনদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তারা কি বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।
মাজার (৫০) নামের এক ব্যক্তি তার নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে এসে বলেন, আমরা আমাদের রোগীকে খুঁজতে এসেছি। জীবিতদের তালিকায় তার নাম নেই। তিনি আহত না কি নিহত, কিছুই জানি না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ব্যক্তি বলেন, গতকাল সারাদিন খুঁজেও তার মরদেহ বা আহতদের তালিকায় নাম পাইনি। আজ আবার তথ্যের আশায় এসেছি।
ঘটনাস্থলে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, হামলার ৩৬ ঘণ্টা পরও ধ্বংসস্তূপের কিছু অংশ থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে আসবাবপত্র, তোশক আর রক্তমাখা পোশাক।
আফগান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আব্দুল মতিন কানি জানান, বুধবার নিহতদের কয়েকজনের জানাজা সম্পন্ন হবে। তবে মরদেহগুলোর অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, কিছু দেহ চেনার উপায় নেই, সেগুলো ফরেনসিক বিভাগে আছে। কিছু মরদেহ অক্ষত অবস্থায় পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আর বাকিগুলো সংগ্রহ করতে হয়েছে মাংসের পিণ্ডের মতো করে।
আফগানিস্তানের আইনি চিকিৎসা অধিদফতরের প্রধান নাজিবুল্লাহ ফারুকী জানান, মঙ্গলবার গভীর রাত পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ বের করা হয়েছে। অনেক মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা এখনও সম্ভব হয়নি।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, যুদ্ধের সময় বেসামরিক এবং চিকিৎসা স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা উচিত নয়। সংস্থাগুলো অবিলম্বে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছর ইসলামাবাদ অভিযোগ করেছিল যে কাবুল তাদের দেশে হামলাকারী জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে। তালেবান সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করার পর থেকেই দুই মিত্র দেশের সম্পর্ক শত্রুতায় রূপ নেয়। চীনের মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও গত মাস থেকে পাকিস্তান সরাসরি আফগান তালেবানকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু করলে সংঘাত আবার তীব্র আকার ধারণ করে।








