নেতাদের পারস্পরিক সম্পর্কের উষ্ণতা বা টানাপোড়েন অনেক সময়ই বোঝা যায় তাদের শারীরিক অঙ্গভঙ্গিতে। দীর্ঘ ১৬ মাস পর ফ্রান্সের জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মুখোমুখি হলেন, তখন তাদের সেই চিরচেনা কোলাকুলিটি একেবারেই গায়েব ছিল। এমনকি তাদের আগের সেই ব্যক্তিগত উষ্ণতারও কোনও দেখা মেলেনি। এর বদলে অত্যন্ত আনুষ্ঠানিক একটি করমর্দন হয়েছে, যেখানে ট্রাম্পকে কেবল তার ‘বন্ধু’ মোদির বাহুতে আলতো চাপ দিতে দেখা গেছে। এর আগে গ্রুপ ছবি তোলার সময়ও তাদের মধ্যে কোনও চোখাচোখি বিনিময় হতে দেখা যায়নি। সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের স্পষ্ট ইঙ্গিতই সেখানে প্রকাশ পেয়েছে।
অবশ্য এই সম্পর্কের বরফ গলার আশা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। বুধবার ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর এই প্রথম মুখোমুখি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন মোদি ও ট্রাম্প। ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদিই ছিলেন প্রথম বিশ্বনেতাদের একজন, যিনি তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কিন্তু এর পর থেকেই সম্পর্ক উল্টো দিকে মোড় নেয়। ট্রাম্প ভারতের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেন, পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান এবং এমন কিছু অভিবাসন নীতি কার্যকর করেন যা যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ভারতীয় শিক্ষার্থী ও কর্মীদের ওপর বড় আঘাত হানে।
জি-৭ সম্মেলনে ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে মোদির কড়া বার্তা
বহু প্রতীক্ষিত একটি বাণিজ্য চুক্তিও এখনও অধরা রয়ে গেছে। এর ওপর সম্প্রতি ওমান উপসাগরে মার্কিন হামলায় তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ককে বড় ধাক্কা দেয়, যা গত মে মাসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সফরের মাধ্যমে কিছুটা স্থিতিশীল হতে শুরু করেছিল। এমন এক পটভূমিতেই গত মঙ্গলবার ফ্রান্সে জি-৭ সম্মেলনে মুখোমুখি হন মোদি ও ট্রাম্প। তবে কোলাকুলি বা উষ্ণতার অভাবের চেয়েও ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে নরেন্দ্র মোদির করা কিছু তীব্র মন্তব্য ভারত-মার্কিন সম্পর্কের ফাটলকে বেশি উসকে দিয়েছে।
ট্রাম্পকে পাশে বসিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি জোর দিয়ে বলেন, আজকের বিশ্ব বিশ্বাসের সংকটে ভুগছে এবং আমাদের অংশীদারত্বের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই বিশ্বাস পুনরায় গড়ে তোলার ওপর। মোদি বলেন, বিশ্ব সম্পদের ঘাটতিতে ভুগছে না; এটি ভুগছে বিশ্বাসের ঘাটতিতে।
ভারতীয় নাবিকদের মৃত্যুর কথা সরাসরি উল্লেখ না করলেও মোদি ইঙ্গিত দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে ভারতীয়দের জীবন দিতে হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন, সব দেশকে অবশ্যই সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং নাবিকদের জীবন রক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ভাষণে কোনও নির্দিষ্ট দেশের নাম না নিলেও মোদির এই বার্তা কার উদ্দেশ্যে ছিল, তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না।
ফাটল আরও স্পষ্ট হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আকস্মিক পদক্ষেপে। তারা তাদের সবচেয়ে বড় সামরিক কমান্ড ‘ইউএস ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’-এর নাম থেকে ‘ইন্দো’ শব্দটি বাদ দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এই ঘোষণার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত মানচিত্রে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরকে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই এই কমান্ডের নাম পরিবর্তন করে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড’ রাখা হয়েছিল, যা তখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে ‘ট্রাম্প ২.০’ সম্পূর্ণ আলাদা এবং বেশ কিছুটা যুদ্ধংদেহী।
ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান এই পরিস্থিতি নিয়ে টুইট করে বলেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদির বৈঠক কোনও বড় পরিবর্তন আনবে না। মার্কো রুবিওর সাম্প্রতিক ক্ষত-বিক্ষত মেরামতের সফর এবং মার্কিন দূত সার্জিও গোরের অক্লান্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ভারতের পক্ষে এখনও তীব্র অবিশ্বাস রয়েছে। সম্পর্ক সম্প্রতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে, তবে ট্রাম্পের মেয়াদের পর না যাওয়া পর্যন্ত এটি হয়তো পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরবে না।
কীভাবে ভারত-মার্কিন সম্পর্কে ফাটল ধরলো?
এশিয়ায় আগ্রাসী চীনকে মোকাবিলার জন্য ভারতকে সবসময়ই একটি প্রধান মিত্র হিসেবে দেখে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু রাজনৈতিক নাটক ও তোষামোদে বিশ্বাসী ট্রাম্পের মেয়াদে ভারতকে তার ক্রমাগত আস্ফালনের শিকার হতে হয়েছে।
এর শুরু হয় গত বছর, যখন ট্রাম্প একতরফাভাবে দাবি করেন যে তিনি দুই দেশকেই চড়া শুল্কের হুমকি দিয়ে মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটিয়েছেন। যদিও ভারত বরাবরই বলে এসেছে যে পাকিস্তানের অনুরোধেই যুদ্ধ বন্ধ হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী মোদি ট্রাম্পের এই দাবি মেনে নিতে বারবার অস্বীকৃতি জানান এবং ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত না করায় দুই পক্ষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে অর্থনৈতিক খাতে। গত বছর রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনার বিষয়টিকে নিশানা করে ট্রাম্প ভারতের ওপর সামগ্রিক শুল্কের হার দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশ করে দেন। এমনকি ভারতকে একটি ‘মৃত অর্থনীতি’ বলে কটূক্তি করেন এবং দিল্লিকে একটি ‘নরক’ হিসেবে বর্ণনা করা একটি পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন। অবশ্য গত ফেব্রুয়ারিতে দুই পক্ষ একটি ফ্রেমওয়ার্ক বাণিজ্য চুক্তিতে সম্মত হওয়ার পর এই শুল্কের হার ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ক্ষেত্রেও স্থবিরতা বিরাজ করছে। ভারতের তেজস এমকে১এ যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিন সরবরাহে মার্কিন বিমান প্রস্তুতকারক সংস্থা জিই-এর বিলম্ব দুই দেশের মধ্যে একটি বড় বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে ভারত ট্রাম্পের এসব পদক্ষেপ বাস্তবসম্মত উপায়ে মোকাবিলা করে আসছে। মোদি গত এক বছরে ট্রাম্পের সঙ্গে কোনও ধরনের বাকযুদ্ধে জড়াননি। চলতি বছরের শুরুর দিকে ভারতের মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সার্জিও গোর জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘প্রকৃত বন্ধুদের মধ্যে দ্বিমত হতে পারে, তবে শেষ পর্যন্ত তারা সবসময়ই তাদের মতভেদ দূর করে নেয়।’ মোদি ও ট্রাম্পের বন্ধুত্বে টানাপোড়েন চললেও তা এখনও ভেঙে যায়নি।
গত সপ্তাহেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট মোদিকে ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘এবং তিনি একজন দুর্দান্ত প্রধানমন্ত্রী!’ এই কারণেই বুধবার সন্ধ্যার মোদি-ট্রাম্প দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটির ওপর সবার নজর থাকবে। এই বৈঠকই নির্ধারণ করবে মোদি ও ট্রাম্পের ব্যক্তিগত রসায়ন আবারও ভারত-মার্কিন সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারবে কি না।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে

আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাঙালিদের পুশব্যাক করছে ভারত
আট বছর পর পুরনো নামে ফিরলো মার্কিন প্যাসিফিক কমান্ড
যে বিখ্যাত রেস্তোরাঁয় চীনা কর্মকর্তাদের প্রবেশ নিষেধ
ট্রাম্পের ইরান চুক্তির যে ৮ প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি







