ইরান যুদ্ধ বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম নির্ধারণে চীনের বিশাল প্রভাবকে সামনে এনেছে। বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক হিসেবে দেশটির নেওয়া কৌশল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করেছে।
হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার পর বাজার বিশ্লেষকরা তেলের বাজারে যে ভয়াবহ দরবৃদ্ধির আশঙ্কা করেছিলেন, চীনের পদক্ষেপ তা রুখে দিয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে চরম মূল্যবৃদ্ধির পর চীন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল কেনা অনেকাংশে কমিয়ে দেয়, যা তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। শুরুতে বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে চীনের স্বাভাবিক দর-সংবেদনশীল আচরণ বলে মনে করলেও, দেশটি নিজেদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ক্ষতি না করেই কীভাবে দীর্ঘদিন আমদানি এত কম বজায় রাখল তা সবাইকে অবাক করেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুন মাস পর্যন্ত চীনের তেল আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪০ শতাংশেরও বেশি কম ছিল। অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের চীন বিষয়ক প্রধান গবেষক মাইকেল মিদান বলেন, চীনের চাহিদা কতটা নিচে নামতে পারে সেটাই বিস্ময়ের বিষয় ছিল। কিন্তু অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি ব্যাহত না করেই তারা চাহিদা এত কম রাখতে সক্ষম হয়েছে।
গোল্ডম্যান স্যাকস-এর বিশ্লেষকদের মতে, নীতি নির্ধারকরা অভ্যন্তরীণ প্রভাব সামলাতে বেশ কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছেন। চীন তাদের নিজস্ব কয়লা, তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের সংরক্ষিত ভাণ্ডার ব্যবহার করেছে। পাশাপাশি যেসব জ্বালানিতে আমদানি নির্ভরতা কম। যেমন কয়লা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া চীনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) সর্বোচ্চ সুবিধা নেওয়া হয়েছে, যার ফলে পেট্রোলের ব্যবহার অনেক কমলেও দেশটির সড়কগুলোতে যান চলাচল স্বাভাবিকই ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন এসব সিদ্ধান্ত নিজেদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির সুরক্ষার কথা ভেবে নিলেও এর সুবিধা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে এসেছে। পণ্যের বৈশ্বিক বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর অর্থনীতিবিদ রিড আইআনসন বলেন, সংকটপূর্ণ সময়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে দিকনির্দেশনা দিতে চীন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা সিএসআইএস-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো জেন নাকানো জানান, চীন নিশ্চিতভাবেই বিশ্ব তেলের বাজারে চাহিদার সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
তবে বৈশ্বিক অর্থনীতির এই সংকট সামলে ওঠার পেছনে চীনের পাশাপাশি ধনী দেশগুলোর নিজেদের কৌশলগত মজুদ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ছেড়ে দেওয়া এবং মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর রফতানি বৃদ্ধিও বড় ভূমিকা রেখেছে।
টনি ব্লেয়ার ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল চেঞ্জের চীন বিশেষজ্ঞ রুবি ওসমান মন্তব্য করেন, চীন মূলত নিজেদের স্বার্থেই এই পদক্ষেপগুলো নিয়েছে, তবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় একটি বৈশ্বিক জনকল্যাণমূলক কাজ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
এদিকে বাজার পর্যবেক্ষকরা নজর রাখছেন চীনের আমদানিকারকরা আবার বৈশ্বিক বাজারে বিপুল পরিমাণে ফিরে আসেন কি না। তবে প্রাথমিক সংকেত অনুযায়ী, চলতি জুলাই মাসে দেশটির তেল ক্রয়ে সামান্য বৃদ্ধির পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সূত্র: অ্যাক্সিওস

প্রথম পরীক্ষাতেই সফল চীনের নতুন উড়োজাহাজ, নজর এবার পাহাড়ি রুটে
যুক্তরাষ্ট্র থামার পরও কেন নতুন করে লড়াইয়ে জড়ালো ইরান
ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী ইউয়ান
ইরান-মার্কিন সংঘাতে প্রথমবার আক্রান্ত মিসর






