যেভাবে এরদোয়ানের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন ইস্তাম্বুলের মেয়র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৪ মার্চ ২০২৫, ২০:২২আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২৫, ২০:২২

ছয় বছর আগের কথা। ইস্তাম্বুলের নবনির্বাচিত মেয়র একরেম ইমামোগুলু নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের ‘মূর্খ’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন, যখন তারা তাকে বিজয়ী ঘোষণা করার পর ফলাফল বাতিল করে। তখনই প্রেসিডে রজব  তাইয়্যেব এরদোয়ান তাকে রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন। 

ওই মন্তব্যের জন্য ইমামোগলুর বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়, যা এখনও আপিলের অপেক্ষায়। এরপর থেকে একের পর এক মামলা, তদন্ত ও অভিযোগের মুখে পড়েছেন তিনি। গত রবিবার দুর্নীতির অভিযোগে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, যা বিরোধীপক্ষ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও গণবিরোধী। 

এই দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং নির্বাচনী সাফল্য মিলিয়ে ইমামোগলুকে এরদোয়ানের ২২ বছরেরও বেশি সময়ের শাসনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত করেছে। 

ইমামোগলুর রাজনৈতিক লড়াই শুরু হয় ২০১৯ সালে, যখন তিনি বছরের পর বছর ধরে নিষ্ক্রিয় থাকা বিরোধী জোটকে নিয়ে ইস্তাম্বুলের স্থানীয় নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেন। মার্চে তিনি নির্বাচনে জয়ী হলেও মে মাসে প্রযুক্তিগত ত্রুটির অজুহাতে (যেমন—অস্বাক্ষরিত ফলাফল দলিল ও অননুমোদিত ব্যালট বক্স কর্মকর্তা) ফলাফল বাতিল করে কর্তৃপক্ষ। 

জুন মাসে, পুনর্নির্বাচনের ঠিক আগে, এরদোয়ান ইমামোগলুকে হুমকি দেন। কারণ, ইমামোগলু নির্বাচনি প্রচারণার সময় কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের ওরদু প্রদেশের গভর্নরকে অপমান করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। 

তবুও, পুনর্নির্বাচনে ইমামোগলু ৫৪ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন, যেখানে ক্ষমতাসীন একে পার্টির প্রার্থী পেয়েছিলেন ৪৫ শতাংশ ভোট। এটি এরদোয়ানের ১৬ বছরের শাসনামলের অন্যতম বড় ধাক্কা ছিল। 

২০২১ সালে ইমামোগলুর বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ আসে। ২০১৯ সালের মার্চে নির্বাচন বাতিলের পর তিনি নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের ‘মূর্খ’ বলেছিলেন—এই মন্তব্যের জন্য তাকে চার বছরের কারাদণ্ড দাবি করে রাষ্ট্রপক্ষ। ২০২২ সালে আদালত তাকে দুই বছর সাত মাসের জেল দেওয়ায় হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করে। 

মজার বিষয় হলো, ইমামোগলুর আইনি লড়াই অনেকটা এরদোয়ানের নিজের অতীতের মতোই। ১৯৯৯ সালে, ইস্তাম্বুলের মেয়র থাকাকালে, একটি ধর্মনিরপেক্ষতাবিরোধী কবিতা পাঠ করার অভিযোগে এরদোয়ানকে চার মাস জেল খাটতে হয়েছিল। এর দুই বছর পর তিনি একে পার্টি গঠন করেন, যা ২০০২ সালে ক্ষমতায় আসে। 

প্রবীণ কলামিস্ট ফিকরেত বিলা বলেছেন, রাজনীতিবিদরা আইনি সংকট কাটিয়ে ফিরে আসেন—এরদোয়ান তার একটি উদাহরণ মাত্র। তিনি সুলেমান ডেমিরেল, বুলেন্ত এজেভিত ও নাজমুদ্দিন এরবাকানের উদাহরণ টেনেছেন, যারা ১৯৮০ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ ও কারাবন্দি হয়েও পরে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। 

বিলা বিরোধীপন্থী হাল্ক টিভির ওয়েবসাইটে লিখেছেন, সরকার ইমামোগলুকে নির্বাচনে দাঁড়াতে বাধা দিলেও, তাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে পারবে না।

গত দুই বছরে ইমামোগলুর বিরুদ্ধে মামলার তীব্রতা বেড়েছে। জুন ২০২৩ সালে, ইস্তাম্বুলের বেয়লিকদুজু জেলার মেয়র থাকাকালীন (২০১৪-২০১৯) একটি দরপত্র কারচুপির মামলার শুনানি শুরু হয়। 

তবুও, ২০২৪ সালের মার্চে তিনি পুনরায় ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচিত হন। তার রিপাবলিকান পিপলস পার্টি (সিএইচপি) ও বিরোধী জোট সারা দেশে ব্যাপক বিজয় অর্জন করে, যা এরদোয়ান ও তার দলের জন্য সবচেয়ে বড় নির্বাচনি পরাজয় হিসেবে চিহ্নিত হয়। 

গত বছরের শেষদিকে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ইমামোগলুসহ অসংখ্য বিরোধী নেতার বিরুদ্ধে ব্যাপক আইনি অভিযান শুরু হয়, যার ফলে কেউ কেউ তাদের নির্বাচিত পদ হারান। 

ফেব্রুয়ারিতে, ইস্তাম্বুলের প্রসিকিউটরকে সমালোচনা করার জন্য ইমামোগলুর বিরুদ্ধে তৃতীয় অভিযোগ আনা হয়। তাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া দাবি করা হয়েছিল একজন সরকারি কর্মকর্তাকে অপমান করার অভিযোগে। 

অবশেষে, গত সপ্তাহে পুলিশ তাকে দুর্নীতি ও একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সহায়তা করার অভিযোগে আটক করে। চার দিন পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়, যা দেশটিতে এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের জন্ম দেয়। 

ইমামোগলুর জনপ্রিয়তা ও আইনি লড়াই তাকে তুরস্কের রাজনীতিতে একটি অনিবার্য শক্তিতে পরিণত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এরদোয়ান তাকে নিষ্ক্রিয় করতে চাইছেন। 

ইমামোগলু কারাগারে থেকেও বলেছেন, ‘আমি লড়াই চালিয়ে যাব’। তার এই সংগ্রাম তুরস্কের গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

সূত্র:  রয়টার্স

/এএ/
সম্পর্কিত
রাস্তায় তোশক আর মুখে মুখ, দিল্লির আগুনে যেভাবে ‘হিরো’ হলেন স্থানীয়রা
উচ্চ ক্ষমতার কার্বন ফাইবারের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু চীনে
শেষ মুহূর্তেও একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলেন তারা
সর্বশেষ খবর
‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ কী, কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার 
‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ কী, কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার 
আসামিপক্ষের আইনজীবী নিয়ে সমালোচনা, যা বললেন মূসা কালিমুল্লাহ
শিশু রামিসা হত্যা মামলাআসামিপক্ষের আইনজীবী নিয়ে সমালোচনা, যা বললেন মূসা কালিমুল্লাহ
প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে বিমানের ছয় হাজার কর্মীর ভাতা
প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে বিমানের ছয় হাজার কর্মীর ভাতা
পুলিশের পোশাকে ‘ধর্ষককে’ নেওয়া হলো থানায়, ১৩ দিনে আদালতে অভিযোগপত্র
পুলিশের পোশাকে ‘ধর্ষককে’ নেওয়া হলো থানায়, ১৩ দিনে আদালতে অভিযোগপত্র
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী