ইউরোপজুড়ে জেঁকে বসা প্রাণঘাতী নজিরবিহীন দাবদাহের কারণে হাসপাতালগুলো রোগী ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে উন্মুক্ত স্থানে মদ্যপান নিষিদ্ধ করেছে কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার তীব্র গরমে পুড়তে থাকা ইউরোপের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষগুলোর সতর্কবার্তার প্রতিধ্বনি করে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
বর্তমানে অন্তত ১০ কোটি ১০ লাখ ইউরোপীয় ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার মুখোমুখি হচ্ছেন। রেকর্ড ভাঙা এই দাবদাহে ইতোমধ্যে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ জানিয়েছে, তীব্র গরমে বিশেষ করে বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা বেশি আক্রান্ত হওয়ায় জরুরি চিকিৎসাসেবার ডাক ও হাসপাতালে রোগী আসার সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়েছে।
তীব্র এই তাপমাত্রার কারণে ফ্রান্স ও স্পেনে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। প্যারিস পুলিশের প্রিফেক্ট প্যাট্রিস ফোরে বলেন, আমরা হাসপাতালগুলোতে ধারণক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছে যাচ্ছি। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টিফানি রিস্টের কার্যালয় জানিয়েছে, বুধবার প্যারিসে ২৪ ঘণ্টায় ২৫টি হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে এই সংখ্যা থাকে ১০টিরও কম। জাতীয় পর্যায়ে গরমজনিত কারণে জরুরি বিভাগে রোগী আসার সংখ্যা চার গুণ বেড়েছে।
লন্ডন অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস জানিয়েছে, বুধবারের তীব্র গরমের কারণে এক দিনে তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি জীবনঝুঁকিপূর্ণ জরুরি কল এসেছে।
জার্মান আবহাওয়া দফতর ও ইউরোপীয় জয়েন্ট রিসার্চ সেন্টারের ২০২৫ সালের জনসংখ্যার পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে করা হিসাবে দেখা গেছে, ৩৮ কোটিরও বেশি মানুষ ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। জাতিসংঘের জলবায়ু প্রধান সাইমন স্টিল বলেন, এই দাবদাহের পরতে পরতে জলবায়ু সংকটের ছাপ স্পষ্ট। অনুপযোগী ভবন ও অবকাঠামোর কারণে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যতক্ষণ না মানবজাতি বিপুল পরিমাণে কয়লা, তেল এবং গ্যাস পোড়ানো বন্ধ করবে, ততক্ষণ চরম গরমের এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হতেই থাকবে।
উত্তর ফ্রান্সের পাস-ডি-ক্যালাইস অঞ্চলে তিনজনের মৃত্যু সম্ভবত গরমের কারণেই হয়েছে। একজন প্রসিকিউটর জানিয়েছেন, প্যারিসের শহরতলিতে একটি গাড়ির ভেতর থেকে তিন বছরের এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যেখানে বুধবার তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এই সপ্তাহে ফ্রান্সে একই পরিস্থিতিতে আরও দুটি শিশু মারা গেছে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে পুলিশ প্রিফেক্ট ফোরে জানিয়েছেন, শুক্রবার থেকে ফরাসি রাজধানীতে উন্মুক্ত স্থানে মদ্যপান এবং মদ বিক্রি নিষিদ্ধ থাকবে।
স্পেনে জুন মাসের তাপমাত্রার আগের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে। সেখানকার মৃত্যুহার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা মোমো জানিয়েছে, রবিবার থেকে বুধবারের মধ্যে ২১২টি মৃত্যুর পেছনে এই গরমের সম্পর্ক থাকতে পারে। ইতালীয় দৈনিক পত্রিকা কোরিয়ারে ডেলা সেরা দাবদাহে পাঁচজনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে।
জার্মানিতে তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রির ঘরে রয়েছে এবং সপ্তাহান্তে তা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পূর্বাভাস থাকায় বেশ কয়েকটি উন্মুক্ত স্থানের অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। রেল অপারেটর ডয়চে বান দাবদাহের কারণে সৃষ্ট দাবানল, ভারী বৃষ্টি ও বজ্রঝড়ের ফলে রেল পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকির কথা জানিয়ে গ্রাহকদের ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। সুইজারল্যান্ডে জুনের রেকর্ড ভেঙে তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে, অন্যদিকে নেদারল্যান্ডস ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গরমের কারণে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে।









