X
মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২২, ৪ মাঘ ১৪২৮
সেকশনস

কয়লার ব্যবহার বাদ দেওয়া এত কঠিন কেন?

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২১, ১৬:৪৫

প্রতিদিন রাজু নিজের বাইসাইকেলে চড়ে এবং অনিচ্ছার সঙ্গে প্যাডেল মেরে বিশ্বের একটি ছোট্ট জলবায়ু বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যান।

প্রতিদিন তিনি খনি থেকে অর্ধেক ডজন কয়লার বস্তা– ২০০ কেজির মতো সাইকেলের ধাতব ফ্রেমে ঝুলিয়ে নেন। পুলিশ ও গরম এড়াতে রাতে তিনি সাইকেলে ১৬ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে এক ব্যবসায়ীর কাছে মাত্র ২ ডলারে এগুলো বিক্রি করেন।

হাজারো মানুষ একই কাজ করছেন।

কয়লার ব্যবহার বাদ দেওয়া এত কঠিন কেন?

ধানবাদে আসার পর থেকে এটিই রাজুর জীবন। ২০১৬ সালে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় ঝাড়খণ্ড রাজ্যে তিনি প্রথম আসেন। তার এলাকায় প্রতি বছর বন্যার কারণে চিরাচরিত কৃষি কাজে মানুষ উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। এখন একমাত্র কয়লাই আছে তার।

আর এই কয়লার বিরুদ্ধেই স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে শুরু হয়েছে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন, যা কপ২৬ নামে পরিচিত।

গ্রিন হাউসের জন্য এককভাবে সবচেয়ে বেশি দায়ী কয়লা, তাই পৃথিবীর জন্য কয়লা পোড়ানো বন্ধ করাটা জরুরি। ভারতে তীব্র বন্যায় কৃষিকাজে ব্যয়বৃদ্ধির জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের বিপর্যয় এড়াতেও এটি ভীষণ জরুরি। কিন্তু মানুষ কয়লার ওপর নির্ভরশীল। এটিই বিশ্বের বৈদ্যুতিক জ্বালানির বৃহত্তম উৎস। রাজুর মতো বেপরোয়া মানুষের জীবন এর ওপর নির্ভরশীল।

রাজুর মতে, দরিদ্রদের দুঃখ ছাড়া আর কিছু নেই… কিন্তু অনেক মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে কয়লার জন্য।

কয়লার ব্যবহার বাদ দেওয়া এত কঠিন কেন?

জলবায়ু সম্মেলনে যুক্তরাজ্যের মনোনীত সভাপতি অলোক শর্মা মে মাসে বলেছিলেন, তিনি আশা করছেন সম্মেলনে কয়লা অতীত করে ফেলা হবে।

বিশ্বের কয়েকটি উন্নত দেশে এমনটি সম্ভব হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিষয়টি এত সহজ না। তাদের যুক্তি হচ্ছে, উন্নত দেশের মতো বিকাশের জন্য তাদের কার্বন ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে। স্টিল উৎপাদনসহ বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদনে সস্তা জ্বালানি কয়লা পোড়ানো হয়। গড়ে একজন মার্কিন নাগরিক একজন ভারতীয়ের তুলনায় ১২গুণ বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। ভারতের ২ কোটি ৭০ লাখ মানুষের বিদ্যুৎ সুবিধাই নেই।

আগামী দুই দশকে ভারতে বিদ্যুতের চাহিদা বিশ্বের যে কোনও স্থানের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মূলত অর্থনৈতিক বিকাশ ও চরম উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে এয়ার কন্ডিশনারের চাহিদা বাড়ায় বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তাও বেশি দেখা দেবে।

এই চাহিদা বৃদ্ধিতে রাজুর মতো মানুষের কিছু যায় আসে না। বিশ্বের বৃহত্তম কয়লা খননকারী কোল ইন্ডিয়া ২০২৪ সালের মধ্যে বছরে ১০০ কোটি টন উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

রাচিঁভিত্তিক সেন্টার অব ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নের সেক্রেটারি ডি.ডি. রামানন্দন বলেছেন, কয়লার ব্যবহার বাদ দেওয়ার বিষয়টি শুধু প্যারিস, গ্লাসগো বা নয়া দিল্লিতে আলোচিত হচ্ছে। ১০০ বছর ধরে কয়লা চলছে। শ্রমিকরা মনে করে এভাবেই চলবে।

কয়লার ব্যবহার বাদ দেওয়া এত কঠিন কেন?

ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ-এর মতে, এর পরিণতি বৈশ্বিক ও স্থানীয়ভাবে ভোগ করতে হবে। বিশ্ব যদি নাটকীয়ভাবে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে না পারে তাহলে আগামীতে আরও চরম উষ্ণতা, টানা বৃষ্টি ও ধ্বংসাত্মক ঝড়ের মুখোমুখি হবে পৃথিবী।

২০২১ সালে ভারত সরকারের একটি গবেষণা অনুসারে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা ভারতীয় রাজ্য হলো ঝাড়খণ্ড, যা দেশটির দরিদ্র রাজ্যগুলো একটি এবং এখানেই রয়েছে বৃহত্তম কয়লার মজুত।

ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করা সন্দিপ পাই জানান, সরকারি মালিকানাধীন কয়লা খনি প্রায় ৩ লাখ মানুষ কাজ করছেন, পাচ্ছেন নিয়মিত বেতন ও সুবিধা। এছাড়া দেশটির ৪০ লাখ মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষাভাবে কয়লার সঙ্গে সম্পর্কিত।

তিনি বলেন, কয়লা একটি বাস্তুসংস্থান।

কয়লার ব্যবহার বাদ দেওয়া এত কঠিন কেন?

‘কিছুই নেই এখানে’

মহামারিতে ভারতের অর্থনৈতিক মন্থর গতির কারণে নরেশ চৌহান ও তার স্ত্রী রিনা দেবির কয়লার ওপর নির্ভরশীলতা আরও বেড়েছে। ধানবাদের ঝারিয়া কয়লার খনির কাছে একটি গ্রামে এই দম্পতির বাস। চার বস্তা কয়লা বিক্রি করে দিনে তারা ৩ ডলার আয় করেন।

বছরের পর বছর ধরে কয়লা খনির ওপর নির্ভর করে বাস করা মানুষের চাষ করার মতো জমি থাকা বিরল। নরেশ আশা করছেন, তার ছেলে গাড়ি চালানো শিখবে। এতে করে অন্তত সে এখান থেকে চলে যেতে পারবে। যদিও তা যথেষ্ট নয়, শহরে ট্যাক্সি চালকদেরও কাজ কম। আগের চেয়ে মানুষ কম আসে শহরে। বিয়ের অনুষ্ঠানের অতিথির বহনও কমে গেছে।

নরেশ বলেন, এখানে শুধু কয়লা, পাথর ও আগুন। এছাড়া কিছুই নেই এখানে।

এর অর্থ হলো বিশ্ব যদি কয়লা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে ধানবাদের মানুষের জন্য আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।

কয়লার ব্যবহার বাদ দেওয়া এত কঠিন কেন?

সন্দিপ পাই বলেন, এমনটি ঘটতে শুরু করেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির দাম কমে যাওয়াতে কয়লাতেও মুনাফা কমে যাচ্ছে। ভারতসহ কয়লা নির্ভর দেশগুলোকে তাদের অর্থনীতিকে আরও বহুমুখী এবং শ্রমিকদের পুনরায় প্রশিক্ষিত করতে হবে। শ্রমিকদের জীবিকরা রক্ষা ও কয়লা বাদ নতুন সুযোগ দিতে এমনটি করতে হবে।

তা না হলে মুরতি দেবির মতো অনেককেই পড়তে হবে। চার সন্তানের মা ৩২ বছর বয়সী এই নারী সারা জীবন ধরে করে আসা কাজ হারিয়েছেন চার বছর আগে। যে খনিতে তিনি কাজ করতেন তা বন্ধ হয়ে যায়। কয়লা কোম্পানির প্রতিশ্রুতি অনুসারে কোনও পুনর্বাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে অনেকের মতো তিনিও কয়লা কুড়ানো শুরু করেন। কপাল ভালো হলে দিনে এক ডলার আয় করেন। অন্য দিন প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় বেঁচে থাকতে হয়।

তিনি বলেন, যদি কয়লা থাকে তাহলে আমরা বাঁচব। যদি কোনও কয়লা না থাকে তাহলে আমরাও বাঁচব না।

সূত্র: এপি

/এএ/
সম্পর্কিত
চীনের প্রথাগত ওষুধ করোনা চিকিৎসায় সফল: পাকিস্তান
চীনের প্রথাগত ওষুধ করোনা চিকিৎসায় সফল: পাকিস্তান
প্রতিবেশীদের শাসাতে চায় না চীন: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
প্রতিবেশীদের শাসাতে চায় না চীন: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
টোঙ্গায় সুনামি: বড় ক্ষয়ক্ষতির খবর, বিচ্ছিন্নতা নিয়ে উদ্বেগ
টোঙ্গায় সুনামি: বড় ক্ষয়ক্ষতির খবর, বিচ্ছিন্নতা নিয়ে উদ্বেগ
সৌদি আরবে ওআইসির প্রতিনিধি অফিস খুলবে ইরান
সৌদি আরবে ওআইসির প্রতিনিধি অফিস খুলবে ইরান

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
চীনের প্রথাগত ওষুধ করোনা চিকিৎসায় সফল: পাকিস্তান
চীনের প্রথাগত ওষুধ করোনা চিকিৎসায় সফল: পাকিস্তান
প্রতিবেশীদের শাসাতে চায় না চীন: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
প্রতিবেশীদের শাসাতে চায় না চীন: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
টোঙ্গায় সুনামি: বড় ক্ষয়ক্ষতির খবর, বিচ্ছিন্নতা নিয়ে উদ্বেগ
টোঙ্গায় সুনামি: বড় ক্ষয়ক্ষতির খবর, বিচ্ছিন্নতা নিয়ে উদ্বেগ
সৌদি আরবে ওআইসির প্রতিনিধি অফিস খুলবে ইরান
সৌদি আরবে ওআইসির প্রতিনিধি অফিস খুলবে ইরান
একজনের ওমিক্রন শনাক্তের পর পুরো বিল্ডিং লকডাউন
একজনের ওমিক্রন শনাক্তের পর পুরো বিল্ডিং লকডাউন
© 2022 Bangla Tribune