লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের স্থল অভিযান ও বৈরুতসহ বিভিন্ন স্থানে হিজবুল্লাহর ঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলা বাড়ার ফলে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা দেশটি থেকে চলে যেতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে বৃহস্পতিবার রাজধানী বৈরুতে হিজবুল্লাহর অবস্থানগুলোতে ইসরায়েলি হামলার পর বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সরকার তাদের নাগরিকদের লেবানন থেকে দ্রুত সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
কয়েকটি দেশ বিমানযোগে তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নিলেও অন্যরা জাহাজ বা ফেরিতে করে দেশ ছেড়েছেন। এদিকে, ইসরায়েল বৃহস্পতিবার দক্ষিণ লেবাননের ২০টিরও বেশি শহরের বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
বৈরুত বিমানবন্দরে গ্রিক ও গ্রিক সাইপ্রিয়টদের গ্রিসের একটি সামরিক বিমানে উঠতে দেখা গেছে। বিমানে চড়া মানুষদের শিশুদের খেলনা ও স্কুল ব্যাগ বহন করতে দেখা যায়। সীমিত জায়গায় কয়েকজন শিশু তাদের বাবা-মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আর অন্যরা খেলছিল। বৈরুতের ধোঁয়ায় আচ্ছাদিত শহরটি পেছনে ফেলে তাদের বিমানটি সাইপ্রাসের লারনাকা বিমানবন্দরে ৩৮ জন সাইপ্রিয়টকে নামিয়ে দেয়। তারপর এথেন্সে অবতরণ করে। সেখানে ২২ জন গ্রিক নাগরিক নেমে যান।
বিমানে থাকা যাত্রীরা জানান, কীভাবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ক্রমবর্ধমান হামলা এবং হিজবুল্লাহর নেতৃত্বের ওপর চালানো আঘাতের ফলে শহরে বিশৃঙ্খলা ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
সাইপ্রাসের লারনাকা বিমানবন্দরে নেমে জর্জ সেইব নামের ব্যক্তি জানান, আমরা ফেঁসে গিয়েছিলাম, কোনও বিকল্প উপায় ছিল না। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের বিমানের সব সিট পূর্ণ ছিল এবং ১০ দিনের আগে থেকে কোনও ফ্লাইট পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রতিদিন পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে এবং আমরা জানি না কাল কী ঘটবে।
লেবাননের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ফিরাস আবিয়াদ বৃহস্পতিবার জানান, ইসরায়েলের হামলায় সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রায় ২ হাজার জন নিহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে ১২৭ জন শিশু। এই পরিসংখ্যানগুলোতে বেসামরিক ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সংখ্যা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
৮ অক্টোবর থেকে হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা প্রতিদিন সীমান্তবর্তী ইসরায়েলি জনপদ ও সামরিক ফাঁড়িতে আক্রমণ চালাচ্ছে। গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে ও ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে এই হামলার চালানোর দাবি করে আসছে গোষ্ঠীটি। ইসরায়েল ঘোষণা করেছে, তারা হিজবুল্লাহকে সীমান্ত থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চায়। এর মাধ্যমে দেশটির সীমান্ত অঞ্চল থেকে হাজার হাজার উদ্বাস্তু মানুষ তাদের বাড়িতে নিরাপদে ফিরতে পারবে।
লেবাননে অবস্থারনত প্রবাসীরা দেশ ছাড়তে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। চীন থেকে ইউরোপ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের উদ্ধার করতে পরিকল্পনা করছে। রাশিয়া বৃহস্পতিবার তাদের কূটনীতিকদের পরিবারকে সরিয়ে নিতে একটি বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করেছে। অস্ট্রেলিয়া নিজের নাগরিকদের লেবানন ছাড়ার জন্য বিমানের শতাধিক সিটের ব্যবস্থা করেছে।
স্পেনের সামরিক বিমান বৃহস্পতিবার ২০৪ জন যাত্রী নিয়ে মাদ্রিদের টোরেজন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছায়। অপর একটি বিমান ৪০ জন যাত্রী নিয়ে আসার কথা রয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্গারিটা রবলেস জানিয়েছেন, স্পেন আরও বিমান পাঠাতে পারে এবং অন্য দেশের নাগরিকদেরও উদ্ধার করতে পারে।
তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলীয় তাসুকু বন্দরে এক মার্কিন নাগরিক গ্রেচেন জানান, তিনি একটি বাণিজ্যিক ফেরিতে করে লেবানন ছেড়েছেন। কারণ বৈরুত থেকে ফ্লাইটগুলো কয়েকদিনের জন্য বাতিল করা হয়েছিল। ফেরি থেকে নেমে তিনি বলেন, আমরা প্রায় সব সময় গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম, যা সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। আমি দ্রুত দেশ ছাড়তে চেয়েছিলাম।
লেবাননের নাগরিকরাও সেই ফেরিতে ছিলেন। তাসুকুতে নেমে অনেকেই তুরস্কের মাধ্যমে অন্য কোনও দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। কেউ কেউ জানিয়েছেন, তারা অন্য দেশের নাগরিকত্বও পেয়েছেন। লেবানন থেকে ঘানার উদ্দেশে রওনা দেওয়া সামি আল কিং বলেন, আমার পরিবারের সদস্যরা লেবাননের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তাই, তাদের ফেলে রেখে যাওয়া নিয়ে আমি চিন্তিত।
অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, গ্রিস, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের লেবানন থেকে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম জোরদার করছে। বেশিরভাগ দেশ বিমানের মাধ্যমে এই উদ্ধার কাজ চালাচ্ছে। তবে কেউ কেউ ফেরি বা বাণিজ্যিক জাহাজও ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে তাদের নাগরিকদের দ্রুত লেবানন ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে।









