যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার ক্ষেত্রে নেপথ্যে বড় ভূমিকা পালন করেছে তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থা। পাকিস্তান এই সমঝোতার প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সামনে থাকলেও আঙ্কারা তার নিজস্ব নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষায় ওয়াশিংটন, তেহরান ও ইসলামাবাদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রেখে উত্তেজনা প্রশমনে কাজ করেছে। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটরের এক প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে।
গত বুধবার থেকে কার্যকর হওয়া এই যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে দীর্ঘ ৪০ দিনের লড়াইয়ে সাময়িক বিরতি এসেছে। যদিও মূল বিরোধগুলো এখনও অমীমাংসিত। এ বিষয়ে একটি স্থায়ী চুক্তির লক্ষ্যে শনিবার ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ইরানি কর্মকর্তাদের দীর্ঘ বৈঠক হলেও কোনও চুক্তি হয়নি।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই যুদ্ধবিরতিতে সহায়তার জন্য তুরস্কসহ চীন, মিসর, কাতার ও সৌদি আরবকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে আল-মনিটরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক মাসে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মার্কিন ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে ১৫০ বারের বেশি ফোনে কথা বলেছেন। এর মধ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গেই কথা হয়েছে অন্তত ১২ বারের বেশি।
নেপথ্যে আরও বড় ভূমিকা পালন করেছে তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এমআইটি)। তুরস্কের সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির আলোচনার সময় এমআইটি সরাসরি পশ্চিমা দেশগুলো এবং ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে। তাদের লক্ষ্য ছিল ভুল বোঝাবুঝি রোধ করা এবং দুপক্ষের বার্তা একে অপরের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থা এমন এক বিরল পক্ষ, যারা একই সঙ্গে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ, ইরানের আইআরজিসি এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে সক্ষম। যদিও গাজা যুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে, তবু গোয়েন্দা চ্যানেলগুলো এখনও সচল রয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরেও গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার জন্য এমআইটি প্রধান ইব্রাহিম কালিন ও ইসরায়েলি শিনবেট প্রধান রোনেন বার আঙ্কারায় বৈঠক করেছিলেন।
বার্সা টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা আলি বুরাক দাউরিলি বলেন, “হাকান ফিদানের সময় থেকে শুরু হওয়া এই ‘গোয়েন্দা কূটনীতি’ এখন ইব্রাহিম কালিনের অধীনেও সমানভাবে কার্যকর।”
যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ায় তুরস্কের বিশেষ আগ্রহের একটি কারণ ছিল কুর্দি ইস্যু। তুর্কি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ইরান সরকারের বিরুদ্ধে লড়তে যুক্তরাষ্ট্র যেন কুর্দি যোদ্ধাদের অস্ত্র না দেয়, সে বিষয়ে ওয়াশিংটনকে নিরুৎসাহিত করেছে এমআইটি। আঙ্কারা মনে করে, কুর্দি যোদ্ধাদের সশস্ত্র করা তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
এমআইটি প্রধান ইব্রাহিম কালিন গত ২৮ মার্চ এক বক্তৃতায় জনসমক্ষে সতর্ক করে বলেছিলেন, কুর্দিদের সশস্ত্র করার পরিকল্পনা এই অঞ্চলে তুর্কি, কুর্দি, আরব ও পারস্যদের মধ্যে কয়েক দশকের ভ্রাতৃঘাতী রক্তক্ষয়ী সংঘাত উসকে দিতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনও এই অস্থির অঞ্চলে তুরস্ককে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে, যাদের মাধ্যমে ইরান ও ইরাকি মিলিশিয়াদের কাছে বার্তা পৌঁছানো সম্ভব।









