রাখাইন রাজ্যের 'বিদ্রোহী রোহিঙ্গা'রা বৃহস্পতিবার (২৪ আগস্ট) ২৪টি পুলিশ চেকপোস্টে সমন্বিত হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে মিয়ানমার। দাবি অনুযায়ী হামলাকারীরা সেনাবাহিনীর একটি ঘাঁটিতে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। রাতভর সংঘর্ষে রোহিঙ্গা-পুলিশ-সেনাসনদস্য মিলে অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছে বলে সেনা-গণতান্ত্রিক ডি-ফ্যাক্টো সরকারের এক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। রয়টার্স-এর এক প্রতিবেদন থেকে এসব কথা জানা গেছে। কিছু স্থানে সংঘর্ষ অব্যাহত থাকার খবর দিয়েছে ওই ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা।
মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে উদ্ধৃত করে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা চলতি মাসের ১২ তারিখ জানিয়েছিল, মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে নতুন করে কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেখানকার সেনা-গণতান্ত্রিক ডিফ্যাক্টো সরকার। একই সময়ে মোতায়েনকৃত সেনার সংখ্যা বাড়ানোর খবর দিয়েছিল ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ১৭ আগস্ট সাউথ এশিয়া মনিটর-এর প্রতিবেদনে সেনা অভিযান শুরুর কথা জানানো হয়। ঘটনার কয়েকদিনের মাথায় পুলিশ চেকপোস্টে হামলা এবং রোহিঙ্গা-পুলিশ সংঘর্ষের খবর পাওয়া পেল।
মিয়ানমার সরকারের তথ্যবিষয়ক কমিটির এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, প্রায় ১৫০ রোহিঙ্গা একটি সামরিক ঘাঁটিতে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করলে সেনাবাহিনী তাদেরকে প্রতিহত করে।বিদ্রোহীদের হামলা এবং পাল্টা অভিযানে এক সেনা সদস্য, ১০ পুলিশ ও ২১ বিদ্রোহী নিহত হয়েছেন বলে দাবি করে তারা।
গত বছরের অক্টোবরে একই ধরনের হামলায় ৯ পুলিশ নিহত হওয়ার পর রাখাইন রাজ্যে বড় আকারের সামরিক অভিযান হয়েছিল। তখন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ করার অভিযোগ ওঠে। জাতিসংঘ মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকাণ্ডকে জাতিগত নিধনযজ্ঞ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের সামিল বলে উল্লেখ করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা স্যাটেলাইট ইমেজ প্রকাশের মধ্য দিয়ে রাখাইনের দমনপীড়ন ও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়ার তথ্য হাজির করে। তবে মিয়ানমার ওইসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে শুরু থেকেই। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কফি আনানের নেত্বত্বে আলাদা তদন্ত কমিশন গঠন করে তারা। সেই তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের একদিনের মাথায় নতুন করে হামলা ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেল। । দুই সেনা সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স প্রকশিত প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের আলাদা কোনও জাতিগোষ্ঠীই মনে করে না। বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত ওই জনগোষ্ঠীকে তারা বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করে দায়িত্ব অস্বীকার করতে চায়। তবে রোহিঙ্গারা নিজেদের মিয়ানমারের নাগরিক বলেই জানে। নাগরিকত্বকে তারা অধিকার হিসেবেই দেখে। তবে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে গিয়েও তারা অজ্ঞাত হামলার শিকার হচ্ছেন বলে জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক পর্যবেক্ষণে উঠে আসে। বৃহস্পতিবারের সংঘর্ষের পর দেওয়া বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের বাঙালি উল্লেখ করে বলা হয়, ‘বাঙালি উগ্রপন্থীরা রাত একটার দিকে রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকা মংদোর একটি পুলিশ স্টেশনে হাত বোমা বিস্ফোরণ করেছে এবং বেশ কয়েকটি পুলিশ পোস্টে হামলা চালিয়েছে।’
মিয়ানমারএর ডি-ফ্যাক্টো সরকারের আমন্ত্রণেই রাখাইন পরিস্থিতি তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছিল কফি আনানের নেতৃত্বাধীন কমিশন। সেই তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনেও সংখ্যার বিচারে রোহিঙ্গাদেরকে‘বিশ্বের সবথেকে বড় রাষ্ট্রহীন সম্প্রদায়’ হিসেবে অভিহিত করে নাগরিকতা নিশ্চিতের আহ্বান জানানো হয়। প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয় আরোপিত সমস্ত বিধিনিষেধ। এতে সতর্ক করা হয়, স্থানীয় জনগনের বৈধ অভিযোগ উপেক্ষিত হলে তারা জঙ্গিবাদে ঝুঁকতে পারে। নতুন করে সেনা অভিযান শুরুর পর বৃহস্পতিবার চেকপোস্টে হামলার ঘটনা যেন কফি আনান কমিশনের আশঙ্কার প্রতিধ্বনি। এদিন হামলার শিকার ২৪টি পুলিশ পোস্টকে তালিকাবদ্ধ করা হয়েছে । ডি ফ্যাক্টো সরকারের বিবৃতিতে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে পুলিশ এবং সেনাবাহিনীও লড়াই অব্যাহত থাকার খবর দেওয়া হয়েছে।
গত বছর অক্টোবরে নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পরবর্তী দমন অভিযানের সময় অন্তত ৮০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এদিকে বুধবার রোহিঙ্গা নেতাদের উদ্ধৃত করে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি সাম্প্রতিক উত্তেজনার কালে অন্তত ৩৫০০ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে প্রবেশের খবর জানায়।








