‘গ্রাম ছাড়ার’ অপেক্ষায় ছিলেন উন্নাওয়ে ধর্ষণের শিকার নারী

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৫:৪০, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৬, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯

কাঠের বাড়িটিতেই স্বপ্ন দানা বেঁধেছিল। ঘরের ভেতর, ফুটো থাকা ছাদের নিচে শুয়ে শুয়ে বৃষ্টির দিনে দুই বোন তাদের আশা ও নিরাশার কথা বলতেন একে অপরকে। বড় বোন বেশিরভাগ সময় ছোট বোনের কথা শুনতেন। ছোট বোনটি বলতেন তার ভালোবাসার মানুষের কথা, ভবিষ্যতে কী হতে চান- আইনজীবী না ডাক্তার। তারা কথা বলতেন, একদিন গ্রাম ছেড়ে চলে যাবেন, অর্থ উপার্জন করবেন এবং এই জীর্ণ ঘরটি ভেঙে নতুন ঘর বানাবেন। যে জীর্ণ ঘরের দেয়াল মাটির তৈরি, ছাদে ফুটো।

এরপর, গত বছরের একদিন তাদের স্বপ্ন থেমে গেলো। শুরু হলো দুঃস্বপ্ন। ২০১৮ সালের ১২ ডিসেম্বর দুই বোনের মধ্যে ছোটজনকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠলো দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এদের একজন যাকে তিনি ভালোবাসতেন। কয়েকদিন আগে ডিসেম্বর রায় বারেলিতে নিপীড়নের শিকার ২৩ বছরের মেয়েটির পরিবার মামলা দিতে গেলে পথরোধ করে পাঁচ ব্যক্তি, এদের মধ্যে দুজন তাকে ধর্ষণে অভিযুক্ত। তারা মেয়েটির গায়ে আগুন দেয়। একদিন পর হেলিকপ্টারে দিল্লির হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর দগ্ধ মেয়েটির জীবন থেমে যায়।

বোনের সমাধির পাশে পরিবারের অন্যদের সঙ্গে বসে থাকা বড় বোন বলেন, ‘সে উকিল হতে চেয়েছিল। শুধু যে নিজের জন্য তা নয়, সে তার মতো অন্যদের মেয়ের জন্য লড়াই করতে চেয়েছিল। ধর্ষণ মামলায় হয়ত আমি রায় বারেলিতে মাঝে মাঝে সঙ্গ দিতাম। যখন আমরা উকিল হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তখন এসব ভাবতাম।’

২৫ বছরের বড় বোনটি আরও বলেন, ‘সে ছিল আমার খুব ঘনিষ্ঠ। পরিবারে আমরাই ছিলাম দুজন স্নাতক পাস করা। আমরা অনেক কিছুই করতে চাইতাম, আরও পড়াশোনা, ভ্রমণ’।

পাঁচ বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে নিহত মেয়েটি ছিলেন সবার ছোট। দুই বোন জামা ও ব্লাউজ সেলাই করে যা উপার্জন করতেন তা কুমোর বাবার আয় কম হওয়ায় পরিবারের খরচ মেটাতেই চলে যেত।

স্কুল থেকে ঝরে পড়া তাদের বড়ভাই আহমেদাবাদের একটি কারখানায় কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘আমার বোন দুটি সবকিছুই জানতো। তারা আমাকে বলত কী পরতে হবে। বলতো কাজে যাওয়ার পর জিন্স ও জ্যাকেট পরে যেতে। ছোটটি আমাকে সব সময় এমন কিছু কথা বলত জগৎ সম্পর্কে, যেসব বিষয়ে আমার তেমন কোনও ধারণাই ছিল না’।

প্রতিবেশী নারীদের ঘেরাটোপে এখনও বোনের সমাধীর পাশে বসে থেকে তারা কথা বলেন। ধর্ষণের শিকার মেয়েটির শেষকৃত্যের দিন কীভাবে পুরো গ্রামের মানুষ তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন সেসব কথা বলছিলেন পরিবারের লোকেরা।

২৫ বছরের বোনটি লাল রঙের কাভারে মোড়ানো নিজের মোবাইল ফোন বের করে ওইদিনের ভিডিও দেখাচ্ছিলেন। মানুষের জমায়েত, ক্ষুব্ধ স্লোগানের মাঝেই দাদুর পাশে তার বোনকে সমাহিত করা হয়।

ভেতরে ঘরে তাদের বাবা বিদ্যুতের সকেটে লাগানো চার্জারে মোবাইল লাগাচ্ছেন। সাধারণ কালো রঙের মোবাইল, একটি রাবার ব্যান্ড দিয়ে প্যাচানো। যাতে করে মাটির দেয়াল থেকে পড়ে না যায়। কাছেই ধুলোময়লা জড়ানো কয়েকটি চুড়ি মাটির দেয়ালে ঝুলানো রয়েছে।

শোকার্ত বাবা প্রায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, ‘দুই মেয়ে যাতে পড়াশোনা করে তা নিশ্চিত করেছিলাম। ভবিষ্যতের জন্য তারাই ছিল আমার আশা। কিন্তু কী অবস্থা হলো দেখতেই পাচ্ছেন’।

আধা কিলোমিটার দূরের যে ডিগ্রি কলেজ থেকে কয়েক বছর আগে দুই বোন বিএ-তে স্নাতক পাস করেছিলেন সেখানকার ফটকেও কয়েকজন মেয়ের জটলা। বেশিরভাগই তারা নিজেদের বাইসাইকেলের পাশে হাঁটছিলেন। এখানে বিএ জনপ্রিয় কারণ কোনও কলেজেই বাণিজ্য পড়ানো হয়। এক মেয়ে বলেন, ‘তাই আপনি যদি বিজ্ঞান না পড়তে চান, তাহলে একমাত্র উপায় হলো বিএ’।

এই মেয়েদের মধ্যে একমাত্র ইশা সিং বিজ্ঞান নিয়ে পড়ছেন। তার মতে, ‘আমি জীববিজ্ঞান নিয়েছি কারণ স্নাতক পাসের পর আমি নার্সিং ও ধাত্রী বিদ্যা শিখতে চাই। আমার এক আত্মীয় নার্স। শুনেছি মেয়েদের জন্য এটি খুব ভালো কোর্স এবং সহজে চাকরি পাওয়া যায়। পাশের বাজারে আমি কোচিং ক্লাস করতে যাই। বাবা-মা চান আমি যেন ভালো করে পড়াশোনা করি। পড়া ও যাতায়াতে যাতে ক্লান্ত না হয়ে পড়ি সেজন্য তারা আমাকে এই বাইসাইকেল কিনে দিয়েছেন’।

ইশার বাবা একজন কৃষক। তার বন্ধু অনামিকা সিংয়ের বাবা আহমেদাবাদে একটি কারখানায় কাজ করেন। অনামিকা শিক্ষক হতে চান এবং আশা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কোর্স করে একদিন গ্রাম ছেড়ে যাবেন। স্কুল শেষে যে কাছের একটি বাজারে গিয়ে বন্ধুর সঙ্গে কম্পিউটার টাইপ শিখছেন তিনি।

উন্নাও এবং কাছের গ্রামে মেয়েদের জন্য এভাবে এগিয়ে যাওয়া খুব কঠিন। বাইসাইকেল চালিয়ে সাধারণ কম্পিউটার কোচিং ক্লাস বা গ্রামীণ পথ ধরে সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেওয়া। সস্তা স্মার্টফোনে ফোর-জি নেটওয়ার্কের কল্যাণে তারা গ্রাম থেকে পালিয়ে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ার ‘বড় স্বপ্ন’ দেখেন। বড় কিছুর জন্য তাদের এই স্বপ্ন গ্রামের পুরুষ ও ছেলেদের ছাড়িয়ে গেছে। স্থানীয় পুরুষ ও ছেলেরা বেশিরভাগই শহরে দিনমজুরি করেন। কিন্তু কিছুদিন পরপরই এই ‘মেয়েদের সীমাবদ্ধতার’ কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়। ২৩ বছরের মেয়েকে ধর্ষণের পর পুড়িয়ে হত্যা এমন ঘটনার সর্বশেষ উদাহরণ।

ওমানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করা বাবার মেয়ে প্রিয়া শুকলা বলেন, ‘আমাদেরকে বলা হয়েছে দলবেঁধে চলতে এবং কলেজ থেকে যেন সোজা বাড়িতে চলে আসি। কেউ যদি আমাদের হয়রানি করে কিছু না বলে মাথা নিচু করে চলে আসতে’।

তিন ভাই-বোনের মধ্যে একমাত্র শুক্লাই স্টাফ সিলেকশন কমিশনের পরীক্ষা পাসের স্বপ্ন দেখেন। বলেন, ‘এসএসসি’র কোচিং ক্লাসের জন্য আমি ১৬ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে যেতাম। এখানে কিছুই নেই। সড়ক নেই, খাবার পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই, কোনও চাকরিও নেই। কারও যদি চাকরি প্রয়োজন হয়, কেউ যদি এখান থেকে চলে যেতে চায়, তাহলে তাকে রায় বারেলি, কানপুর, এলাহাবাদ বা লকনৌ যেতে হবে।

গ্রাম থেকে ‘বাইরে যাওয়া’র একটি পথ হলো রেল স্টেশন। যেখান থেকে কানপুর, লকনৌ, রায় বারেলি ও এলাহাবাদ ধীরগতির লোকাল ট্রেন সকালে থামে। ২৩ বছরের ধর্ষণের শিকার মেয়েটিকে যখন আগুন দেওয়া হয় তখন তিনি এই স্টেশনে আসার পথেই ছিলেন।

এখনও ফুলে ঘেরা সমাধির পাশে বসে থাকা বড় বোন তার শেষ কথাগুলোর স্মৃতিচারণ করেন। বলেন, ‘সে আমাকে বলত, দিদি আমি বাঁচব না। আমার খুনিরা যেন মৃত্যুদণ্ড পায় তা নিশ্চিত করো। এটি নিশ্চিত করার পর আমি বোন ও নিজের স্বপ্ন পূরণ করব। একজন উকিল হব’। সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

 

 

/এএ/

লাইভ

টপ