করোনা ভাইরাসের টিকা উদ্ভাবনে কত দিন লাগবে?

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৪:২৯, জানুয়ারি ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৪, জানুয়ারি ৩০, ২০২০

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের বিজ্ঞানী নতুন করোনা ভাইরাসের টিকা উদ্ভাবনে কাজ শুরু করেছেন। সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে গেলে তিন মাসের মধ্যে মানবদেহে এই টিকার পরীক্ষা চালানো সম্ভব হবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সংবাদ পর্যালোচনা করে জানা গেছে, ব্যবহারের জন্য ওই টিকা হাতে পেতে অন্তত ২০২০ সালের গ্রীষ্ম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। তবে বিশ্বের স্বাস্থ্য ও মহামারি সংক্রান্ত সংস্থাগুলোর প্রত্যাশা, কয়েক মাসের মধ্যেই অন্তত একটি কার্যকরী চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার হবেই।

ভাইরাসের টিকা উদ্ভাবনের সাধারণ প্রক্রিয়া হলো- সংশ্লিষ্ট ভাইরাসটির জিনগত তথ্য সংগ্রহ, গবেষণাগারে তা পুনরায় তৈরি এবং দ্রুততর সময়ে তা বিজ্ঞান জার্নালে আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশ করা। চীন ভাইরাসটি শনাক্ত ও জিনগত বিশ্লেষণ সম্পন্ন করেছে, যার মানে হলো গবেষকরা টিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশে টিকা উদ্ভাবনের কাজ চলছে।

ছড়িয়ে পড়া নতুন করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা উদ্ভাবনের প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে চীনে। সে দেশের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এর বিজ্ঞানীরা বেশ দ্রুত ভাইরাসটির জেনেটিক ক্রম (জেনেটিক সিকুয়েন্স) শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই তা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে, যাতে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা এর টিকা আবিষ্কারে কাজ শুরু করতে পারে। জেনেটিক সংকেত জানা থাকলে টিকা তৈরিতে বিজ্ঞানীদের আর ভাইরাসটির নমুনার প্রয়োজন পড়বে না।

সিডিসি’র ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ভাইরাল ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের প্রধান জু ওয়েনবো স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, গবেষকরা খুব দ্রুতই ভাইরাসটিকে পৃথক করে এর জিনগত কাঠামো বিশ্লেষণ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছেন। কোনও ভাইরাসকে বুঝতে পারা ও ঠেকানোর পদ্ধতি আবিষ্কারের প্রাথমিক পদক্ষেপ এটি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও দ্য ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদন অনুসারে, তিন মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (এনআইএইচ)-এর একটি নতুন গবেষণা দল করোনা ভাইরাসের সম্ভাব্য টিকা নিয়ে পরীক্ষা শুরু করতে পারে। দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইউএস ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশনস ডিজিসেস-এর পরিচালক ড. অ্যান্থনি ফওসি। তিনি ১৯৮৪ সাল থেকে এনআইএইচ’র ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজের পরিচালক ছিলেন। এই সংস্থার পক্ষ থেকে যেসব ভাইরাস নিয়ে কাজ করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে এইচআইভি, ইবোলা ও জিকা।

ডা. অ্যান্থনি এস. ফাউসি জানান, তিন মাসে সম্ভব হলে এ ধরনের টিকা তৈরির ক্ষেত্রে জেনেটিক ক্রম থেকে প্রাথমিক মানব পরীক্ষায় যাওয়ার দ্রুততম ঘটনা হবে এটি। জার্নাল অব দ্য আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনে (এফএএমএ) এক লেখায় ডা. ফাউসি বলেছেন, সার্স ও মার্স নামে পরিচিত দুটি ভিন্ন ধরনের করোনা ভাইরাসের টিকা উদ্ভাবন করা হয়েছে। নতুন ভাইরাসের টিকা উদ্ভাবনে তা ভিত্তি হতে পারে।  ‘ভ্যাকসিন প্ল্যাটফর্মস’ ব্যবহার করে গবেষকরা ঝুঁকিমুক্ত ভাইরাস নিয়ে তাতে করোনা ভাইরাসের উপাদান যুক্ত করবেন। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিষেধক ব্যবস্থায় কেমন প্রতিক্রিয়া পড়ে তা পর্যবেক্ষণ করা হবে।

ভিআইআর বায়োটেকনোলজির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হারবার্ট ভারজিন জানান, তার প্রতিষ্ঠানে সংক্রমণ-বিরোধী প্রোটিনের একটি বিশাল সংগ্রহ আছে যেগুলো সারস ও মারসের বিরুদ্ধে পরীক্ষায় কিছুটা সফলতা দেখিয়েছে। তিনি বলেন, এসব অ্যান্টিবডিগুলোর কয়েকটি করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সক্ষমতা দেখিয়েছে। উহানের করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ ও চিকিৎসায়ও এগুলো কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ফওসি’র সংস্থা ইউএস বায়োটেক মডার্ন ইনকরপোরেশনের সঙ্গে মিলে কাজ করছে। ওই প্রতিষ্ঠানটি রিবোনিউক্লেইক এসিড (আরএনএ) থেকে টিকা তৈরিতে বিশেষজ্ঞ। আরএনএ হচ্ছে এমন একটি রাসায়নিক উপাদান যাতে প্রোটিন তৈরির নির্দেশনা থাকে। দলটি করোনা ভাইরাসের মুকুটসদৃশ পৃষ্ঠের ওপর ভিত্তি করে একটি আরএনএ টিকা তৈরির চেষ্টা করছে। প্রসঙ্গত, করোনা ভাইরাস দেখতে অনেকটা মুকুট বা সৌর করোনার মতো।

২০০৩ সালে মার্কিন মলিকিউলার গবেষক অ্যান্ড্রিয়া গ্যাম্বটের নেতৃত্বাধীন ইউনিভার্সিটি অব পিটসবার্গের একদল বিজ্ঞানী তিনটি আর্টিফিশিয়াল ভাইরাস তৈরি করেছেন। যা টিকা উদ্ভাবনে কাজে লাগতে পারে। এগুলো ভিন্ন ভিন্ন প্রোটিনের ভিত্তিতে তৈরি করা। প্রথমটি হলো স্পাইক প্রোটিন এস১। যা করোনা ভাইরাসের করোনাল স্পাইকের জন্য দায়ী। এটি মূলত মেমব্রেন প্রোটিন। দ্বিতীয়টি ক্যাপসিড প্রোটিন সার্স ভাইরাসের। ক্যাপসিড হলো প্রোটিনভিত্তিক ভাইরাসের খোসা (শেল)। তাদের এই দ্রুত অগ্রগতির সম্ভব হয়েছে সার্স ভাইরাসের পুরো জিনগত বৈশিষ্ট রেকর্ড ভাঙা সময়ে বিশ্লেষণ করা গেছে বলে। কিন্তু ২০০৩ সালে এই অগ্রগতির পরও সার্স ভাইরাসের টিকা মানব শরীরে কখনও পরীক্ষা করা হয়নি। কারণ হলো গবেষকরা এশীয় বানরের শরীরে টিকাটি পরীক্ষা করার পরই ভাইরাসটির সংক্রমণ কমে যায়।

এদিকে, অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড-এ বৈশ্বিক জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিষয়ক সংগঠন কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশনস (সিইপিআই) সমর্থিত বিজ্ঞানীরাও টিকা তৈরির কাজ করছে। বিজ্ঞানীরা জানায়, তারা ‘মলিউকুলার ক্ল্যামপ’ পদ্ধতি অবলম্বন করছে। এ পদ্ধতিতে বিষাক্ত প্রোটিনগুলোয় একটি জিন যোগ করে সেগুলোকে স্থিতিশীল করা হয়। ওই প্রোটিনগুলো শরীরে প্রবেশ করিয়ে শরীরকে বোকা বানানো হয় যে, ওটা আসলে একটি ভাইরাস। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তখন সেটার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। এর আগে ইবোলা ও অপর এক করোনা ভাইরাস মিডল ইস্ট রেসপাইরেটরি সিনড্রোম (মারস)-এর ক্ষেত্রে এটি বেশ কার্যকরী ফলাফল দেখিয়েছে। টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নোভাভাক্স ইতিমধ্যে মারস-এর বিরুদ্ধে একটি টিকা তৈরি করছে। প্রতিষ্ঠানটি নতুন করোনা ভাইরাস নিয়েও কাজ করবে বলে জানিয়েছে।

/এএ/বিএ/

লাইভ

টপ