সম্মিলন দিয়ে হিংসা রুখেছে দিল্লির এক মহল্লা

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৮:৫০, ফেব্রুয়ারি ২৯, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:০০, ফেব্রুয়ারি ২৯, ২০২০

লাঠি, রড বা অস্ত্র হাতে নয়, সম্মিলনের মধ্য দিয়ে গত সপ্তাহের হিন্দুত্ববাদী তাণ্ডব রুখে দিয়েছে দিল্লির একটি মহল্লা। হিন্দু, মুসলমান আর শিখ বাসিন্দারা ঐক্যবদ্ধ পাহারা বসিয়ে সশস্ত্র হামলাকারীদের রুখে দিয়ে রক্ষা করেছেন নিজেদের বাড়ি, দোকানপাট আর যানবাহন। তাণ্ডবের তীব্রতা কমে এলেও এখনও সতর্ক অবস্থায় থেকে পাহারা চালু রেখেছেন যমুনা বিহারের বি-ব্লক কলোনির বাসিন্দারা।জানালা দিয়ে পুলিশ টহল দেখছেন দিল্লির বাসিন্দারা

বিজেপি নেতা কপিল মিশ্রের উসকানির পর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে হিন্দুত্ববাদী তাণ্ডব শুরু হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) যেখানে নিহতের সংখ্যা ছিল ২৭, বৃহস্পতিবার বিকালে তা ৩৮-এ পৌঁছায়। আর ২৮ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার) নাগাদ এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪২। আশঙ্কা করা হচ্ছে, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এই তাণ্ডবে গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছে দুই শতাধিক মানুষ।

যমুনা বিহারে বি-ব্লক কলোনির এক পাশে হিন্দু অধ্যুষিত ভজনপুর আর অন্যপামে মুসলমান অধ্যুষিত গন্ধা এলাকা। কলোনির ৩০ বছর বয়সী দাঁতের চিকিৎসক আরিব জানান, এখানে বসবাসকারী সব বিশ্বাসের মানুষই রাতের বেলা নিজেদের বাড়ির বাইরে বসে থাকে আর সন্দেহভাজন বহিরাগত দেখলেই তাকে মোকাবিলা করে। তিনি বলেন, ‘রাতের বেলা সংঘবদ্ধ স্লোগান দিতে থাকা মানুষেরা মৃত্যুর ভয় ছড়াতে থাকে। দুই দিক থেকেই এই স্লোগান শোনা যায় আর আমরা শুনতে পাই মানুষ যাওয়া আসার পথে স্লোগান দিতে দিতে যাচ্ছে’। আরিব জানান, ‘আমরা বহিরাগত মুসলমান গ্রুপগুলোকে ঠেকাতে স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দাদের পাঠাই আর হিন্দুগ্রুপগুলোকে ঠেকাতে হিন্দুদের পাঠাই’।

গত সপ্তাহের সোম ও মঙ্গলবারের সহিংসতার পর ২৪ ঘণ্টা জুড়েই মহল্লায় পাহারা দিচ্ছেন ব্যবসায়ী, চিকিৎসক ও সরকারি চাকুরিজীবীসহ সব পেশার মানুষ। আগে পুলিশি টহল নিয়ে মহল্লার বাসিন্দাদের উদ্বেগ থাকলেও গত দুই দিনে তা বাড়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন তারা।

বি-ব্লক কলোনির বাসিন্দা চিরঞ্জিত সিং একটি পরিবহন প্রতিষ্ঠান চালান। তিনি বলেন, রাতের বেলা কলোনির মধ্যে একসঙ্গে বেশি মানুষ যেন জড়ো হতে না পারে তা নিশ্চিত করেন বাসিন্দারা। তিনি জানান, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে শান্তি বজায় রাখতে লাঠি বা রড ব্যবহার করা হবে না।  চিরঞ্জিত বলেন, ‘১৯৮২ সালে উত্তর প্রদেশের মিরাট থেকে যখন দিল্লিতে আসি তখন আমার বয়স দশ বছর। ১৯৮৪ সালের দাঙ্গা দেখেছি, ২০০২ সালের উত্তেজনার সময়ও দেখেছি আমাদের এলাকায় শান্তি বিঘ্নিত হয়নি। আমরা সব সময়ই ঐক্যবদ্ধ ছিলাম আর সেভাবেই আমরা পরস্পরকে সাহায্য করি’।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ফয়সাল (৩০) জানান দুই দিন সহিংসতার পর আমাদের এলাকায় উত্তেজনা টলমল করে ওঠে। তিনি বলেন, বুধ ও বৃহস্পতিবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসলেও রাতের বেলা কেউই ঘুমাতে পারেনি।  তিনি জানান, বুধবার ভোর চারটার দিকে তিন-চার দুর্বৃত্ত একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় কিন্তু পাহারায় থাকা বাসিন্দারা তাদের ধাওয়া দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। তারা অন্যদের সতর্ক করলে আশেপাশের বাসিন্দারাও নিজেদের গাড়ি রক্ষা করে।

পাহারার সময়ে লাঠি না রাখার বিষয়ে চিরঞ্জিত বলেন, ‘সহিংসতা কেবল সহিংসতা আর ভিড় কেবল ভিড়ই বাড়ায়। আমরা মনে করেছি দূর থেকে যদি কেউ আমাদের লাঠি হাতে এবং বড় জমায়েত দেখে তাহলে তারা ভাবতে পারে আমরা হয়তো প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি। সেকারণে তারাও হয়তো প্রস্তুত হয়ে আসতে পারে। আর তাতে উত্তেজনা বাড়তে পারে’। ‘এখন রাতে বেলা যদি কোন তরুণ ফিরে আসে তাহলে আগে আমরা তাতকে চিহ্নিত করি সে আমাদের এলাকার কিনা। যদি না হয় তাহলে আমরা স্বাভাবিকভাবে তাকে পরিস্থিতি জানাই আর প্রয়োজন পড়লে তাকে তার গন্তব্য অবধি নিয়ে যাই,’ বলেন তিনি।

৭০ বছর বয়সী ভি কে শর্মা বলেন, এই কলোনিতে বসবাস করা মানুষদের নিজেদের মধ্যে কোনও সমস্যা নেই। উত্তর-পূর্ব দিল্লির সহিংসতার জন্য বহিরাগতদের দায়ী করলেন তিনি। কিছু লোকের কোনও কোনও প্রতীক নিয়ে সমস্যা আছে। তারা যদি কোনও দোকান, বাড়ি বা গাড়িতে ওই প্রতীক দেখতে পায় তাহলে তারা তা ধ্বংস করে। তিনি বলেন, ‘এটা হিন্দু-মুসলমান দুই পক্ষেই আছে। তবে সব ধর্মের সব মানুষই এক নয়। ভালো মানুষের তুলনায় সহিংসতা করা মানুষের সংখ্যা খুবই কম’। নিজের দুই নাতিকে আইসক্রিম কিনে দিতে বের হওয়া শর্মা বলেন, ‘বাড়ির বাইরের উত্তেজনা তো আমি কমাতে পারবো না কিন্তু এই শিশুদের আইসক্রিম কিনে দিয়ে তো অন্তত তাদের কিছুটা ভালো লাগাতে পারি’।

কলোনির বাসিন্দা শিব কুমার ও সরকারি চাকুরিজীবী ওয়াসিম জানান, তারাও রাত জেগে স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে পাহারা দেন।

/জেজে/

লাইভ

টপ