করোনাভাইরাসের ‘হার্ড ইমিউনিটি’র গাণিতিক নির্মমতা

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১২:২৩, মে ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৪৮, মে ১৬, ২০২০

হার্ড ইমিউনিটি কি করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সহযোগিতা করবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি এতো সহজ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জরুরি বিষয়ক পরিচালক ড. মাইক রায়ান হার্ড ইমিউনিটির বিষয়ে বেশ কিছু তিক্ত সত্য হাজির করেছেন। তিনি বলেছেন, মানুষরা পশু নয়।

গত কিছুদিন ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হার্ড ইমিউনিটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে যারা মনে করছেন, করোনার বিস্তার ঠেকাতে জারি করা লকডাউন অনেক বেশি কঠোর ও প্রত্যাহার করা উচিত, তারা জোরেশোরে হার্ড ইমিউনিটির কথা তুলে ধরছেন।

হার্ড কথার অর্থ হলো জনগোষ্ঠী। আর ইমিউনিটি হল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। সমাজের বেশিরভাগ মানুষের শরীরে যখন কোনও বিশেষ জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা তৈরি হয়ে যায়, হয় টিকা গ্রহণ করে, নয়তো জীবাণু সংক্রমণের মাধ্যমে, আর তাতে সুবিধায় পায় অন্যরা, এপিডেমিওলজিতে এই ধারণাকেই বলা হয় হার্ড ইমিউনিটি।

করোনাভাইরাস মহামারিতে হার্ড ইমিউনিটির বাস্তবতা এখনও অনেক দূর, বিশেষ করে টিকা ছাড়া। ড. রায়ান জানান, হার্ড ইমিউনিটি শব্দবন্ধের প্রচলন পশুচিকিৎসার মহামারি বিদ্যা থেকে। মূলত এর মাধ্যমে বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, পুরো পালের স্বার্থে কিছু পশুকে মরতে দেওয়ার। তিনি বলেন, নির্মম অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কোনও একক পশু এখানে বিবেচ্য না। ফলে আমরা যখন এই কথা মানুষের সংক্রমণের বিষয়ে বলি তখন সত্যিকার অর্থেই আমাদের সতর্ক হতে হবে। কারণ এর ফলে নির্মম গাণিতিক সিদ্ধান্তের দিকে আমাদের নিয়ে যেতে পারে যাতে মানুষের জীবন ও কষ্ট সমীকরণের মূলকেন্দ্রে থাকে না।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলছেন, করোনা মহামারি থেকে বের হওয়ার দ্রুত কোনও উপায় নই। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব এলাকায় লকডাউন শিথিল করা হচ্ছে। এমনকি মহামারিতে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত এলাকাতেও হার্ড ইমিউনিটি বহু দূরের গন্তব্য।

কোনও জনগোষ্ঠীতে উচ্চ মাত্রায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনের দুটি উপায় রয়েছে। একটি হলো, যথেষ্ট সংখ্যক মানুষ ইতোমধ্যেই আক্রান্ত হয়েছে এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অ্যান্টিবডি তৈরি করেছে যাতে ভবিষ্যতে সংক্রমণ রোধ হবে, অন্তত স্বল্প মেয়াদে হলেও। আর অপর পদ্ধতি হলো টিকা। হার্ড ইমিউনিটি বা কার্যকর চিকিৎসা ব্যবস্থা ছাড়া এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার অনুপস্থিতির ফলে টিকা আবিষ্কার হওয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশকে ধাপে ধাপে অপ্রত্যাশিত সংক্রমণ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

করোনাভাইরাসে সৃষ্ট কোভিড-১৯ রোগের ক্ষেত্রে ধারণা করা হচ্ছে, হার্ড ইমিউনিটির জন্য  মোট জনগোষ্ঠীর ৫০ থেকে ৭০ শতাংশকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। বিশ্বে এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৩ লাখ পার হলেও কোনও দেশই সংক্রমণ ঠেকাতে যে মাত্রায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করা দরকার সেই পথে আগাচ্ছে না।

চীনের উহানে এপ্রিলে কাজে ফেরা কয়েক হাজার মানুষের অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা হয়েছে। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ মানুষ তা অর্জন করতে পেরেছেন। স্পেনজুড়ে পরিচালিত একটি প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০ হাজার মানুষের মধ্যে অ্যান্টিবডি পরীক্ষায় মাত্র ৫ শতাংশ পজিটিভ এসেছে। আর নিউ ইয়র্কের মতো সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত এলাকায় প্রাথমিক পরীক্ষায় ১ হাজার ৩০০ মানুষের মধ্যে ২১ দশমিক ২ শতাংশ অ্যান্টিবডি পজিটিভ হয়েছেন।

হিউস্টনের বেইলর কলেজ অব মেডিসিনের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. রবার্ট আটমার বলেন, এর অর্থ হলো জনগোষ্ঠীর অন্তত ৮০ শতাংশ এখনও ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন। ফলে এমনকি সবচেয়ে খারাপভাবে আক্রান্ত এলাকাতেও হার্ড ইমিউনিটির জন্য প্রত্যাশিত মাত্রা আমরা পাচ্ছি না।

ভাইরাসের প্যাথোজেনের ওপর নির্ভর করে হার্ড ইমিউনিটি। কোনও রোগের সংক্রমণক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে তা হিসাব করা হয়। আক্রান্ত একজন মানুষ কতজনকে আক্রান্ত করতে পারেন। সাধারণভাবে, যদি কোনও রোগ দ্রুত সংক্রমিত হয় তাহলে জনগোষ্ঠীর তত বেশি সংখ্যক মানুষকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করতে হবে হার্ড কমিউনিটির জন্য।

আটমার বলেন, হামের মতো রোগের ক্ষেত্রে কোনও জনগোষ্ঠীর ৯৫ শতাংশের বেশি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করতে হয়। কিন্তু অন্য প্যাথোজেনের ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ অর্জন আবশ্যক মানুষের সংখ্যা কম হতে পারে।

জনস হপকিন্স স্কুল অব পাবলিক হেলথের সংক্রামক রোগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ডেভিড ডাউডি মনে করেন, এর ফলে লকডাউন শিথিল করা দেশগুলোকে নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

মহমারিবিদ্যার বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সাধারণভাবে একমত যে, স্বাভাবিক সংক্রমণের মাধ্যমে করোনাভাইরাসের হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের পরিকল্পনার ফল হবে ভয়াবহ বিপর্যয়মূলক।

ডাউডি বলেন, এখন নিউ ইয়র্ক সিটি ছাড়া পাঁচ শতাংশ বা এর চেয়ে কম মানুষ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছে। ফলে করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করতে হলে বর্তমান আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যাকে ১৫ দিয়ে গুণ করতে হবে। আমরা যদি স্বল্প সময়ে এমনটি ঘটতে দেই তাহলে নিশ্চিতভাবে জনস্বাস্থ্যের জন্য তা সর্বনাশা হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্ব বৃদ্ধির পর লকডাউনবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। অনেক বিক্ষোভকারী ও আইনপ্রণেতা কঠোর সামাজিক দূরত্বের বিধান ছাড়াই ভাইরাস মোকাবিলায় সুইডেন মডেলের কথা তুলে ধরছেন। এটিকে তারা হার্ড ইমিউনিটির জন্য সম্ভাব্য উপায় হিসেবেও দেখছেন।

সুইডেন রাষ্ট্রীয়ভাবে লকডাউন জারি করেনি এবং ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য স্কুল খোলা রেখেছে। তবে অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে কঠোর লকডাউনের পথে হেঁটেছে। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শ্রম ও পেনশন কমিটির বৈঠকে সিনেটর র‍্যান্ড পল পরামর্শ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত সুইডেনকে অনুসরণ করা। পেশায় তিনি নিজেও একজন চিকিৎসক।

করোনা মোকাবিলায় ‘সুইডিশ মডেল’ সাফল্যগাঁথা হিসেবে বিবেচিত হলেও বিস্তারিত তথ্য সামনে আসার পর দেখা যাচ্ছে সেখানেও সংকট রয়েছে। দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২৮ হাজারের বেশি এবং মৃত্যু হয়েছে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষের। যদিও যুক্তরাষ্ট্রে ১৪ লাখ আক্রান্ত ও ৮৫ হাজার মৃত্যুর তুলনায় এই সংখ্যা নগণ্য। তবে প্রতি দশ লাখে মৃত্যুর হার যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে সুইডেনে বেশি। এমনকি দেশটি যে হার্ড ইমিউনিটির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে এমন কোনও ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে না। এপ্রিলের শেষ দিকে দেশটির জনস্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, স্টকহোমের ১০ লাখ বাসিন্দার এক-তৃতীয়াংশ হয়ত ভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছে। যা হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের দিকে কিছুটা অগ্রগতি। কিন্তু প্রয়োজনীয় ৭০ শতাংশের চেয়ে অনেক কম। আর সুইডেনের এই পদক্ষেপে মানুষের প্রাণহানি বেড়েছে।

ডাউডি বলেন, সুইডেনে ইউরোপের মধ্যে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। তাদের পদক্ষেপের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে।

আরেকটি আশঙ্কার বিষয় হলো বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন যে করেনাভাইরাসের অ্যান্টিবডি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় রূপান্তরিত হয়। আটমার বলেন, এটি হতে পারে। তবে আমরা এখনও নিশ্চিত নই। আমি মনে করি এটি প্রত্যাশা করা যায় যে পুনরায় সংক্রমণ থেকে কিছু মাত্রায় রোগ প্রতিরোধ ও সুরক্ষা পাওয়া যাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে এমন নির্দিষ্ট তথ্য নেই।

এমনকি অ্যান্টিবডি যদি পুনরায় সংক্রমণ ঠেকাতে পারলেও কতদিন এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কার্যকর থাকবে তা জানা যায়নি। ডাউডি বলেন, যদি ভাইরাসটি প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে চলে যায় তাহলে হার্ড ইমিউনিটি নিয়ে কথা বলারই কোনও প্রয়োজনীয়তা নেই। সূত্র: এনবিসি

 

/এএ/

লাইভ

টপ