যেভাবে মার্কেট থেকে করোনা ছড়াচ্ছে লাতিন আমেরিকায়

যেভাবে মার্কেট থেকে করোনা ছড়াচ্ছে লাতিন আমেরিকায়

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ২০:১৩, মে ১৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:১৭, মে ১৮, ২০২০

পেরুর গুরুত্বপূর্ণ ফলের বাজারের পাঁচ ব্যবসায়ীর মধ্যে চারজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছেন। এতে করে দেশটিতে সংক্রমণের মাত্রা কতটা ভয়াবহ তা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে লাতিন আমেরিকার প্রচলিত বাজারগুলো থেকে হয়ত পুরো অঞ্চলে কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ছে।

রাজধানী লিমার পাইকারি ফল বাজারের ৭৯ শতাংশ বিক্রেতা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। এছাড়া শহরের আরও ৫টি বড় ফল বাজারের অন্তত অর্ধেক বিক্রেতার শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি ধরা পড়েছে।

এমন সময় এই আক্রান্তের কথা জানা গেলো যখন মেক্সিকো সিটি থেকে রিও ডি জেনেইরো পর্যন্ত পাইকারি ও খুচরা বাজারে সামাজিক দূরত্ব ও পরিচ্ছন্নতার পদক্ষেপ বাস্তবায়নে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এই বাজারগুলো স্থানীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।

করোনা মহামারিতে মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় বড় সংকটে পড়তে যাচ্ছে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। মেক্সিকো ও ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে মহামারিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা না করার জন্য। উভয় দেশই গত সপ্তাহে একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু রেকর্ড করেছে। কিন্তু পেরুতে অঞ্চলটির মধ্যে সবচেয়ে কঠোর লডাউন দুই মাস জারি রাখার পরও সম্প্রতি মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে।

পেরুর প্রেসিডেন্ট মার্টিন ভিজকারা জানান, লিমাতে  আক্রান্ত ফল বিক্রেতাদের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। কিন্তু মার্কেট বন্ধ করতে রাজি হননি তিনি। তার দাবি, এতে করে খাবারের স্বল্পতা দেখা দিতে পারে। সেনা ও পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে বাজারে সব বিক্রেতা ও ক্রেতাদের শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপের জন্য।

লিমাভিত্তিক থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান গ্রেড-এর প্রধান তদন্তকারী এডুয়ার্ডো জেগারা বলেন, ‘পেরুতে কোয়ারেন্টিন যেমন কাজ করার কথা তেমনটি না করার পেছনে বাজারগুলোর হয়ত বড় ভূমিকা রয়েছে। যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে ভয়াবহ।’ সরকারের প্রতি বাজারটি বন্ধ ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক জরুরি অবস্থা জারির আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

কর্তৃপক্ষ লিমার প্রায় ১২০০ বাজার খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব বাজারে ঘটনাস্থলেই করোনা পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং আক্রান্ত বিক্রেতাদের বাজার থেকে বাসায় বা হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। আক্রান্তদের বেশিরভাগেরই কোনও উপসর্গ নেই।

কিন্তু জেগারার আশঙ্কা, লিমার বড় পাইকারি বাজার হয়ত ইতোমধ্যে সংক্রমণ বিস্তারের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সান্তা আনিতা বাজারে, এখানে প্রায় ৩০ হাজার ব্যবসায়ী, কুলি, বিতরণকারী কাজ করেন এবং প্রতিদিন ৮ হাজার টন খাবার বিক্রয় হয়।

কুলিদের মধ্যে কয়েক ডজন আক্রান্ত ও অন্তত একজনের মৃত্যুর পর আশঙ্কা করা হচ্ছে হয়ত এরই মধ্যে ভাইরাসটির সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু যে কয়েক হাজার বিক্রেতা ও ক্রেতা সংক্রমিত হবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে তা নয়, বিভিন্ন শহর ও দেশের নানা প্রান্ত ঘুরে বেড়ানো ট্রাক ও লরির চালকও আক্রান্ত হতে পারেন।

লিমার সাবেক ডেপুটি মেয়র জেগারা বলেন, আমি আশঙ্কা করছি এতে করে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় দফা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিক্রেতাদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। আমরা জানি না কতদিন ধরে তারা আক্রান্ত বা তাদের মাধ্যমে কতজনের কাছে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছ।

সরকারি তথ্য অনুসারে, শনিবার পেরুতে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৮৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। দেশটিতে মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ৫৭২ জনের। লাতিন আমেরিকার মধ্যে পেরুর চেয়ে শুধু ব্রাজিলের সংক্রমণের হার বেশি। আক্রান্তের হিসাবে বিশ্বের মধ্যে চতুর্থ স্থানে রয়েছে ব্রাজিল। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুসারে, দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫১১ জন। করোনায় মৃত্যুর হিসাবে বিশ্বের মধ্যে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে দেশটি, মোট মৃতের সংখ্যা ১৫ হাজার ৬৬২ জন।

লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় পাইকারি মার্কেট হলো ব্রাজিলের সাও পাওলোতে অবস্থিত সিয়াজেস্প। মার্কেটের সরবরাহকারীদের ইউনিয়নের সভাপতি ক্লডিও ফারকুইম জানান, এখন পর্যন্ত করোনায় প্রায় ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছেন অসংখ্য। তিনি বলেন, এই মানুষের মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। যদি বিবেচনা করেন প্রতিদিন এখানে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ আসেন তাহলে এই সংখ্যা অনেক কম বলতে হবে।

সংবাদমাধ্যমের খবরে দেখা গেছে, ব্রাজিলের মার্কেটগুলোতে মানুষের ভিড়। বেশিরভাগই কোনও মাস্ক পরেননি। টিভি রেকর্ড-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিয়েগো হিপোলিটো নামের এক ব্যক্তি জানান পেশায় চালক তার এক চাচা প্রতিদিন বাজারে যেতেন এবং করোনার লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগ পর্যন্ত কাজ করেছেন।

লাতিন আমেরিকার সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে বাজারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এমনকি ওয়ামার্টের মতো কোম্পানি অঞ্চলটিতে বাণিজ্য শুরু করলেও। কিন্তু এই বাজারগুলোই এখন করোনা বিস্তারের কেন্দ্রে পরিণত হতে হচ্ছে।

কলম্বিয়ার সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার করাবাস্তোস জধানী বোগোটার কেনেডি এলাকার পাশে অবস্থিত। এটি শহরটিতে করোনা বিস্তারের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

গত সপ্তাহে শহরের মেয়র ক্লডিও লোপেজ জানান, ৩০ জন আক্রান্ত শনাক্ত হওয়ার পর মার্কেটটির মাত্র ৩০ শতাংশ চালু রাখা হবে।

শহরের স্বাস্থ্যমন্ত্রী আলেহান্দ্র গোমেজ স্বীকার করেছেন, স্থানীয় সরকারের পক্ষে আরও ভালো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি খাবার সরবরাহের গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, করোবাস্তোসকে আমরা বোগোটার স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হতে দিতে পারি না। কিন্তু আমরা একই সঙ্গে খাবারের স্বল্পতা হোক তাও চাই না।

শহরটির বিরোধী দলীয় এক কাউন্সিলম্যান হোর্হে কলমেনারেস এক টুইট বার্তায় লিখেছেন, বোগোটার অমনোযোগিতার জন্য ধন্যবাদ, লাখো নাগরিকের খাবার সরবরাহে আঘাত হেনেছে করোনাভাইরাস।

মেক্সিকো সিটির বিশালাকার সেন্ট্রাল ডি আবাস্তো নামের মার্কেটে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা আসেন এবং রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে এখান থেকেই পণ্য সরবরাহ করা হয়। এই মার্কেটে অন্তত ২৫ জন করোনা আক্রান্ত শনাক্ত ও দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে আশঙ্কা করা হয়েছে, এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

মার্কেডো কয়োকানে একটি লন্ড্রি দোকানের মালিক ম্যানুয়েল কর্নেহো কারিলো। তিনি জানান, ৬০ শতাংশ দোকান বন্ধ রয়েছে এবং তার ব্যবসা কমেছে ৯০ শতাংশ। খুব কম ক্রেতাই মার্কেটে আসলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখেন ও মাস্ক পরেন।

সংক্ষিপ্ত লকডাউন শেষে মেক্সিকো এরই মধ্যে অর্থনীতি পুনরায় সচল করার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু কর্নেহোর মতো ব্যবসায়ীরা কাজে ফিরতে মরিয়া হলেও আশঙ্কা করছেন, এখনও করোনাভাইরাসের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব আসতে বাকি আছে। তিনি বলেন, অর্থনৈতিকভাবে পুনরায় চালু করার সময় এখন। কিন্তু স্বাস্থ্যগত বিবেচনায় আমি উদ্বিগ্ন। আমার মনে হয় চূড়ান্ত অবস্থা এখনও আসেনি। ২০০৯ সালের সুয়াইন ফ্লু মহামারি ও ভূমিকম্প দেখেছি আমি। কিন্তু কখনও এমন কিছু দেখিনি। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান।

/এএ/

লাইভ

টপ