জন্মের ৫ দিন পর মাতৃহারা, এবার ডেঙ্গুতে বাবাকেও হারালো আরফা

ছালমা আক্তার সারমিন
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩:৫০আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩:৫০

‘আমি তো এতিম হয়ে গেলাম। আমি এখন কার কাছে থাকব? সবার বাবা-মা আছে। আমার তো আগে মা ছিল না, কিন্তু বাবা ছিল। মানুষের হয় বাবা থাকে, না হয় মা থাকে। কিন্তু এখন আমার বাবা-মা কেউই নেই।’

কথাগুলো বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিল ৯ বছরের আরফা। জন্মের মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় মাকে হারিয়েছিল সে। মায়ের কোনো স্মৃতি তার মনে নেই। বাবা তাজুল ইসলাম তাজুই ছিলেন তার বাবা, আবার মা-ও। বাবার বুকেই ছিল তার পুরো পৃথিবী। কিন্তু ডেঙ্গুতে বাবাকেও হারিয়ে এখন সত্যিই এতিম আরফা।

“স্কুলে গেলে বন্ধুদের যখন মা নিতে আসত, তখন আমার মন খারাপ হতো, মায়ের অভাব বুঝতাম। কিন্তু আমার বাবা তো আমাকে নিতে আসত। মা না থাকলেও ভাবতাম, আমার বাবা আছে। এখন তো বাবাও নেই। আর কোনোদিন বাবা আমাকে স্কুলে নিয়ে যাবে না, ঘুরতে নিয়ে যাবে না।”

২০১৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নড়াইল সদর হাসপাতালে সিজারের মাধ্যমে জন্ম হয় আরফার। জন্মের পর শারীরিক দুর্বলতার কারণে তার মা মারুফা হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।

১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে ছোট্ট আরফাকে পাশে শুইয়ে রেখে পানি খেতে উঠতেই হঠাৎ মাথা ঘুরে মেঝেতে পড়ে যান মারুফা। একই কক্ষে থাকা মারুফার মা ছুটে এসে দেখেন, সিজারের সেলাই ফেটে শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে জানান, মারুফা আর বেঁচে নেই।

পৃথিবীতে আসার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় মায়ের স্নেহ হারায় আরফা। এরপর বাবা তাজুল ইসলাম তাজুই হয়ে ওঠেন তার পুরো পৃথিবী।

রামপুরার ওয়াপদা রোড এলাকায় বাবা ও দাদা-দাদির সঙ্গে বড় হতে থাকে আরফা। প্রতিদিন বাবা তাকে স্কুলে দিয়ে আসতেন, আবার ছুটি শেষে নিয়ে আসতেন। ছুটির দিনে ঘুরতে নিয়ে যেতেন। মা না থাকলেও বাবার ভালোবাসায় মায়ের অভাব বুঝতে দেননি তাজুল। শুধু মেয়ের কথা চিন্তা করে আর বিয়েও করেননি তিনি।

তাজুল ইসলামের মা ছকিনা বেগম বলেন, ১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে দোকান থেকে বাসায় ফিরে ছেলে বলেছিল, “মা, আমার শরীর খুব খারাপ লাগছে। মাথায় পানি ঢেলে দাও।”

তিনি ছেলের মাথায় পানি ঢেলে দেন ও শরীর মুছে দেন। পরে ভাত মেখে খেতে দিলে তাজুল অল্প একটু ভাত খেয়ে একটি নাপা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন।

পরদিন মঙ্গলবার সকালেও জ্বর ছিল। ফজরের নামাজ পড়ে তাজুল মাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘মা, আরফাকে তুমি স্কুলে নিয়ে যাবে, না আমি নিয়ে যাব?’ ছকিনা বেগম তাকে বিশ্রাম নিতে বলেন।

সকাল ৭টার দিকে কলা ও পাউরুটি খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক বমি শুরু হয় তাজুলের। ভাই ও বাবা মিলে বমি পরিষ্কার করেন। আরফাকে স্কুলে দিয়ে ফেরার পথে তাজুলের মা এক বন্ধুকে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে অনুরোধ করেন। কিন্তু বাসায় ফিরে তাজুল তখনও বলছিলেন, ‘লাগবে না, এমনিতেই ভালো হয়ে যাব।’

সকাল ১০টার দিকে জানা যায়, তিনি দোকানের পাশের হলি ফ্যামিলির এক চিকিৎসকের কাছে গেছেন। চিকিৎসক ওষুধ ও স্যালাইন লিখে দেন। বাসায় ফিরেই স্যালাইন দেওয়া শুরু হয়।

একটি স্যালাইন শেষ হতে হতে সন্ধ্যা ৬টা বাজে। এরপর তাজুল তার ভাইকে বলেন, ‘আরেকটা স্যালাইন দিয়ে দাও। যত তাড়াতাড়ি শেষ হয় ততই ভালো। সারারাত শুয়ে থাকতে ভালো লাগবে না।’

কিন্তু দ্বিতীয় স্যালাইন চলাকালেই আবার অনবরত বমি শুরু হয়। বুকব্যথা বাড়তে থাকলে তাকে দ্রুত খিদমা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা জানান, আইসিইউ সুবিধা না থাকায় অন্য হাসপাতালে নিতে হবে।

পরে তাকে ভর্তি করা হয় বেটার লাইফ হাসপাতালে। ভর্তির পরপরই তার টেস্ট করা হয়। মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে রিপোর্ট আসে, তাজুলের ডেঙ্গু হয়েছে এবং তার অবস্থা গুরুতর। প্রেসার কমে যায়, শ্বাসকষ্টও দেখা দেয়। স্যালাইন চললেও বমি থামছিল না।

বুধবার সকালে ছেলেকে দেখতে গিয়ে ছকিনা বেগম দেখেন, কয়েকজন মিলে তাকে ধরে রেখেছে। তাজুল শুধু ছটফট করছিল।

‘দেখেই বুঝছিলাম, আমার ছেলের সময় শেষের দিকে,’ কাঁদতে কাঁদতে বলেন ছকিনা বেগম।

পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সেদিনই তাকে এভার কেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে লাইফ সাপোর্টে রাখা হলেও তাকে আর সুস্থ করা যায়নি।

১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৫৫ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তাজুল ইসলাম তাজু (৩৬)। পরদিন সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বারে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

মারুফার চাচি ফারহানা আক্তার বলেন, ‘তাজু ভাই অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই আরফা কান্নাকাটি করছিল। আমরা বারবার বলতাম, তোমার বাবা সুস্থ হয়ে যাবে। কিন্তু মৃত্যুর খবর শোনার পর মেয়েটা পাগলের মতো হয়ে যায়। তার কান্নায় পুরো পরিবেশ ভারী হয়ে গিয়েছিল। এমন কোনো মানুষ ছিল না, যে তাকে দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পেরেছে।’

আরফার দাদু বলেন, ‘আমার নাতি এতদিন এতিম ছিল না। বাবাকে হারিয়ে এবার এতিম হয়ে গেল। এখন আমি তাকে দেখে রাখবো। আমারও বয়স হয়েছে, কতটুকু পারবো জানি না।’

জন্মের সময়ই মাকে হারিয়েছিল আরফা। এরপর বাবার হাত ধরেই গড়ে উঠেছিল তার ছোট্ট পৃথিবী। নয় বছর বয়সে বাবাকেও হারিয়ে সেই পৃথিবীটাও এখন শূন্য। মাথার ওপর থেকে সরে গেছে তার শেষ আশ্রয়টুকুও।

/ইউএস/
সম্পর্কিত
আর নোটিশ নয়, এবার হঠাৎই উচ্ছেদ অভিযানে নামবে ডিএনসিসি
পলিথিনের ভেতর থেকে শোনা যাচ্ছিল কান্না, ৯৯৯-এ ফোনে নবজাতক উদ্ধার
বুড়িগঙ্গায় নিখোঁজ দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার
সর্বশেষ খবর
আর নোটিশ নয়, এবার হঠাৎই উচ্ছেদ অভিযানে নামবে ডিএনসিসি
আর নোটিশ নয়, এবার হঠাৎই উচ্ছেদ অভিযানে নামবে ডিএনসিসি
হামে ভয়াবহতম প্রাদুর্ভাবের মুখে দেশ
হামে ভয়াবহতম প্রাদুর্ভাবের মুখে দেশ
বাসার দরজা ভেঙে এনসিপি নেতার মরদেহ উদ্ধার
বাসার দরজা ভেঙে এনসিপি নেতার মরদেহ উদ্ধার
হোয়াইট হাউস ছাড়লেন শি, বৈঠককে ‘দুর্দান্ত’ বললেন ট্রাম্প
হোয়াইট হাউস ছাড়লেন শি, বৈঠককে ‘দুর্দান্ত’ বললেন ট্রাম্প
সর্বাধিক পঠিত
ইলিশের দাম কেজিতে কমেছে ৩০০ টাকা, বাজারে বেড়েছে সরবরাহ
ইলিশের দাম কেজিতে কমেছে ৩০০ টাকা, বাজারে বেড়েছে সরবরাহ
চাকরি পাওয়ার খুশিতে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে জড়ালেন হত্যা মামলায়
চাকরি পাওয়ার খুশিতে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে জড়ালেন হত্যা মামলায়
আগাম কর দিয়েও ৫ শতাংশ ছাড় থেকে বঞ্চিত করদাতারা
আগাম কর দিয়েও ৫ শতাংশ ছাড় থেকে বঞ্চিত করদাতারা
দেশে জ্বালানি তেলের দাম কখন কমবে, জানালেন প্রতিমন্ত্রী
দেশে জ্বালানি তেলের দাম কখন কমবে, জানালেন প্রতিমন্ত্রী
স্লিপার বাসে ‘পোড়া গন্ধ’ পেয়েও থামাননি চালক, আগুনে প্রাণ হারালেন ৯ জন 
স্লিপার বাসে ‘পোড়া গন্ধ’ পেয়েও থামাননি চালক, আগুনে প্রাণ হারালেন ৯ জন