টাঙ্গনের তীরে শালবনের হাতছানি

ফিচার ডেস্ক
১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩০আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩০

উত্তরের জনপদ ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ। সীমান্তঘেঁষা এই উপজেলার প্রকৃতির সঙ্গে মিশে আছে শালবনের সবুজ, টাঙ্গন নদীর ছুটে চলা জল, রেলসেতুর নান্দনিকতা, দিঘীর শান্ত জল আর গ্রামীণ জনপদের নির্মল সৌন্দর্য। এখানে নেই সমুদ্র, নেই পাহাড়। তবু প্রকৃতির নিজস্ব সাজে পীরগঞ্জ হয়ে উঠেছে ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য এক অন্যরকম গন্তব্যস্থল।

পীরগঞ্জের সৌন্দর্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, একই ভ্রমণে পাওয়া যায় শালবন, নদী, রেলসেতু, রাবার ড্যাম ও গ্রামীণ প্রকৃতি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় রয়েছে সাগুনী শালবন ও থুমনিয়া শালবনের মতো বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল। জেলা প্রশাসনের তথ্যে থুমনিয়া শালবনের আয়তন প্রায় ৫০৩ দশমিক ৬২ একর এবং সাগুনী শালবনের আয়তন প্রায় ১৫২ দশমিক ৩২ একর। প্রকৃতির এই সৌন্দর্যের টানে পীরগঞ্জে ঘুরে দেখার মতো ১০টি জায়গা তুলে ধরা হলো।

১. সাগুনী শালবন, সবুজের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়ার গল্প: পীরগঞ্জের অন্যতম আকর্ষণ সাগুনী শালবন। উপজেলা প্রশাসনের পর্যটন তালিকায়ও সাগুনীর শালবনের উল্লেখ রয়েছে। পীরগঞ্জের পূর্ব চৌরাস্তা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বোচাগঞ্জ সড়ক ধরে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে এ শালবনের অবস্থান। শালগাছের সারি, মাটির পথ আর বাতাসে পাতার মর্মরধ্বনি মিলে এখানে তৈরি হয় এক অন্যরকম পরিবেশ। ফাল্গুন-চৈত্রে শালপাতা ঝরার সময় বন যেন শুকনো পাতার কার্পেটে ঢেকে যায়। এই শালপাতা শুধু সৌন্দর্যই নয়, আশপাশের নিম্নআয়ের মানুষের জীবিকারও অংশ। শালপাতা সংগ্রহ ও বিক্রি করে পীরগঞ্জের অনেক শ্রমজীবী মানুষ মৌসুমি বাড়তি আয় করেন।

২. সাগুনী রেলব্রিজ, রেললাইন, নদী আর শালবনের অপূর্ব মিলন: সাগুনী শালবনের পূর্ব পাশ দিয়ে বয়ে গেছে আঁকাবাঁকা টাঙ্গন নদী। সেই নদীর ওপর দাঁড়িয়ে আছে সাগুনী রেলব্রিজ। সেতুর ওপর দিয়ে চলে ট্রেন, নিচে নদীর জল, আর দুই পাশে শালবনের সবুজ দৃশ্য নিঃসন্দেহে পীরগঞ্জের অন্যতম আকর্ষণ।

সরকারি পর্যটন তথ্যে বলা হয়েছে, সাগুনী রেলব্রিজের দক্ষিণ পাশে শালবনের নদীতে রয়েছে রাবার ড্যাম। ঠাকুরগাঁও শহর থেকে জায়গাটির দূরত্ব প্রায় ৩৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার। ট্রেন যাওয়ার মুহূর্তে সেতু ও নদীর দৃশ্যটি হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয়।

৩. সাগুনী রাবার ড্যাম, টাঙ্গনের বুকে পানির আয়না: সাগুনী রাবার ড্যাম শুধু সেচব্যবস্থার অংশ নয়, আশপাশের মানুষের কাছে এটি একটি মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যের জায়গাও। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গন নদীর ওপর সাগুনী রাবার ড্যাম নির্মাণের ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি ধরে রেখে আশপাশের বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে সেচ দেওয়া হয়। এর আওতায় টাঙ্গনের দুই পাড়ের বহু গ্রামের কৃষিকাজ পরিচালিত হচ্ছে। বর্ষা কিংবা শীত, ঋতু বদলের সঙ্গে ড্যাম ও নদীর দৃশ্যও বদলে যায়। পানির ওপর আকাশের প্রতিবিম্ব আর দূরের সবুজ মিলিয়ে তৈরি হয় চমৎকার প্রাকৃতিক দৃশ্য।

৪. টাঙ্গন নদীর পাড়, নদীর সঙ্গে বিকালের গল্প: পীরগঞ্জের সৌন্দর্যের কথা বলতে গেলে টাঙ্গন নদীকে বাদ দেওয়া যায় না। নদীটি পীরগঞ্জের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এ অঞ্চলের প্রকৃতি, কৃষি ও জনজীবনের সঙ্গে মিশে আছে।

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গন নদী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে পঞ্চগড়ের পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রুহিয়া, পীরগঞ্জ ও বোচাগানজের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখা, বর্ষায় পানির স্রোত উপভোগ করা কিংবা শীতের বিকালে নির্মল বাতাসে কিছুক্ষণ বসে থাকা পীরগঞ্জ ভ্রমণের অন্যতম আনন্দ হতে পারে এটি।

৫. থুমনিয়া শালবাগান, সবুজের সঙ্গে টিকে থাকার লড়াই: পীরগঞ্জের থুমনিয়া শালবাগান প্রকৃতির এক অসাধারণ সম্পদ। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, থুমনিয়া শালবনের আয়তন প্রায় ৫০৩ দশমিক ৬২ একর। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে শালপাতা ঝরে পড়লে বনভূমির মাটিতে তৈরি হয় পাতার বিছানা। এই ঝরা পাতাকে ঘিরে আশপাশের বহু শ্রমজীবী মানুষের মৌসুমি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। তবে এই শালবনের সামনে রয়েছে বড় সংকট টাঙ্গন নদীর ভাঙন। বছরের পর বছর নদীভাঙনে শালবনের বড় একটি অংশ নদীগর্ভে চলে গেছে। কয়েক দফা বর্ষায় শালগাছ উপড়ে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। তাই এটি সংরক্ষণের প্রয়োজন জরুরি হয়ে পড়েছে।

৬. চেরকু ঘাট, নদীর ধারে নিরিবিলি এক ঠিকানা: স্থানীয়ভাবে পরিচিত চেরকু ঘাট পীরগঞ্জের নদীঘেঁষা সৌন্দর্যের একটি আকর্ষণ। টাঙ্গনের জল, নদীর পাড়ের সবুজ আর গ্রামের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এ জায়গাটিকে স্থানীয় দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকা কিংবা বিকালের আলোয় নদীপাড়ের দৃশ্য উপভোগ করার জন্য এমন ঘাটের আলাদা আবেদন রয়েছে।

৭. সুকান দিঘী, নাম নিয়ে সতর্কতা: সুকান দিঘী নামটি স্থানীয় আলোচনায় পীরগঞ্জের সঙ্গে কখনও কখনও যুক্ত হলেও সরকারি রংপুর বিভাগীয় তথ্যসূত্রে এটি লালমনিরহাট জেলার ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত।

৮. রাজভিটা, প্রাচীনতার খোঁজে: পীরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের পর্যটন তালিকায় রাজ ভিটার নাম রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পীরগঞ্জ পশ্চিম চৌরাস্তা থেকে দক্ষিণ দিকে জাবরহাট ইউনিয়নে এর অবস্থান। নামটির মধ্যেই যেন অতীতের কোনও রাজকীয় অধ্যায়ের ইঙ্গিত রয়েছে। তবে প্রাচীন রাজভিটা এতটাই পুরাতন যে সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায়নি।

৯. পীরগঞ্জের গ্রামীণ টাঙ্গনপাড়, প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ: পীরগঞ্জের টাঙ্গনপাড়ের সৌন্দর্য কোনও নির্দিষ্ট একটি ঘাটে সীমাবদ্ধ নয়। নদীর দুই পাড়ের গ্রাম, কৃষিজমি, গাছপালা, নৌকা, জেলেদের কর্মব্যস্ততা এবং বিকালের আলো পুরো নদী অববাহিকাই যেন একটি জীবন্ত প্রাকৃতিক দৃশ্যপট। জাবরহাট ইউনিয়নও টাঙ্গন নদীর পাশেই অবস্থিত বলে সরকারি ইউনিয়ন তথ্যসূত্রে উল্লেখ আছে। সেখানে নদীপাড়ের পরিবেশ দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে। তাই পীরগঞ্জে গেলে শুধু নির্দিষ্ট পর্যটনকেন্দ্র নয়, টাঙ্গনপাড়ের গ্রামীণ জনপদ ঘুরে দেখাও হতে পারে চমৎকার অভিজ্ঞতা।

১০. শালবন ঘেরা পীরগঞ্জ, একটি পুরো অঞ্চলের সৌন্দর্য: পীরগঞ্জের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়তো কোনও একক পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং শালবন ও টাঙ্গন নদীকে ঘিরে তৈরি পুরো প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য। সাগুনী ও থুমনিয়ার পাশাপাশি পীরগঞ্জ অঞ্চলের বিভিন্ন শালবাগানকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা গড়ে উঠেছে। থুমনিয়া, সাগুনী, শতহা ও পূর্ব হাজিপুর এই চারটি শালবাগানের কথা সবচেয়ে বেশি আলোচিত। শীতের কুয়াশা, বসন্তের ঝরা শালপাতা, বর্ষার টাঙ্গন আর শরতের নীল আকাশ ঋতু বদলের সঙ্গে পীরগঞ্জের সৌন্দর্যও যেন নতুন রূপ নেয়।

পর্যটনের সম্ভাবনা আছে, দরকার পরিকল্পিত সংরক্ষণ: ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে পর্যটনের সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে বড়। কারণ এখানে প্রকৃতি ও জনজীবন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। সাগুনী শালবন থেকে টাঙ্গন নদী, রেলব্রিজ থেকে রাবার ড্যাম একটি ছোট ভ্রমণেই পাওয়া যায় বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা। কিন্তু এই সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন শালবন রক্ষা ও নদীভাঙন প্রতিরোধ। বিশেষ করে থুমনিয়া শালবন রক্ষায় নদীভাঙন ঠেকানোর ব্যবস্থা না হলে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ বনভূমি হারিয়ে যেতে পারে।

যেসব ভ্রমণপ্রেমী প্রকৃতির কাছে যেতে চান, মানুষের জীবন দেখতে চান এবং শহরের ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে গিয়ে উত্তরবঙ্গের নিজস্ব সৌন্দর্য অনুভব করতে চান, তাদের জন্য পীরগঞ্জ হতে পারে এক অনন্য স্থান।

/এমএএল/
সম্পর্কিত
মেঘ-পাহাড়ের রাজ্যে সুংসাংপাড়া, যেখানে পথের প্রতিটি বাঁকেই নতুন গল্প
নদীমাতৃক বাংলাদেশে ব্যাকওয়াটার ট্যুরিজম ঘিরে নতুন সম্ভাবনা
তিন্দু, দুর্গম পথের শেষে যেন এক টুকরো স্বর্গ
সর্বশেষ খবর
জনবল নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলো বিকাশ
জনবল নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলো বিকাশ
বিদেশ ভ্রমণে পাসপোর্ট হারালে যেভাবে সামলাবেন পরিস্থিতি
বিদেশ ভ্রমণে পাসপোর্ট হারালে যেভাবে সামলাবেন পরিস্থিতি
ইরানের বিরুদ্ধে ‘কখনও না দেখা’ ব্যবস্থা নেবে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের বিরুদ্ধে ‘কখনও না দেখা’ ব্যবস্থা নেবে যুক্তরাষ্ট্র
২০০ মেগাপিক্সেল রোবোটিক ক্যামেরাযুক্ত বিশ্বের প্রথম ‘রোবট ফোন’ আনলো অনার
২০০ মেগাপিক্সেল রোবোটিক ক্যামেরাযুক্ত বিশ্বের প্রথম ‘রোবট ফোন’ আনলো অনার
সর্বাধিক পঠিত
আদালতে ঢুকে সেই ওসির ৩ স্যালুট, বিচারক বললেন ‘আপনি এখানে কেন’
আদালতে ঢুকে সেই ওসির ৩ স্যালুট, বিচারক বললেন ‘আপনি এখানে কেন’
বিএনপির মহাসচিব পদে কে আসছেন, আলোচনায় ৪ নেতা
বিএনপির মহাসচিব পদে কে আসছেন, আলোচনায় ৪ নেতা
দলে নতুন পদ পেলেন এমপি মাহমুদুল হোসাইন
দলে নতুন পদ পেলেন এমপি মাহমুদুল হোসাইন
বন্ধ হলো সামিটের এলএনজি সরবরাহ, ‘বাড়বে’ ভোগান্তি
বন্ধ হলো সামিটের এলএনজি সরবরাহ, ‘বাড়বে’ ভোগান্তি
অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুত: ডমিনোস পিৎজার আউটলেটের লাইসেন্স স্থগিত
অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুত: ডমিনোস পিৎজার আউটলেটের লাইসেন্স স্থগিত