শুক্রবার ছুটির দিনে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর দেখতে ভিড় করেছেন শত শত দর্শনার্থী। সময় না জেনে প্রবেশের নির্ধারিত সময়ের আগেই এসে উপস্থিত হন তারা। অনলাইনে টিকিট কাটার সময় দেওয়া স্লটের সঙ্গে শুক্রবার জাদুঘর খোলার সময়ের অসামঞ্জস্যের কারণে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে দর্শনার্থীদের। এতে পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে। যদিও দর্শনার্থীদের চাপ সামলাতে প্রবেশ ব্যবস্থাপনায় নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সরেজমিনে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে গিয়ে এই ভোগান্তির চিত্র দেখা যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, দুপুর সাড়ে ১২টা থেকেই জুলাই জাদুঘর দেখতে আসতে থাকেন দর্শনার্থীরা। যদিও শুক্রবার জাদুঘর খোলার সময় বিকেল ৩টায়। কিন্তু সব দর্শনার্থীর কাছে এই তথ্য এখনো পৌঁছেনি। আর এর ফলশ্রুতিতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে তাদের। এছাড়া অনলাইনে টিকিট কেটে আসা দর্শনার্থীদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। জাদুঘর খোলার এক ঘণ্টা আগে তাদের প্রবেশের সময় দেওয়া থাকলেও তারা এসে প্রবেশ করতে পারেন না। তাই তাদের এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এ নিয়ে ক্ষোভও ঝেড়েছেন কেউ কেউ।
তবে জাদুঘরে প্রবেশে শৃঙ্খলা আনতে কর্তৃপক্ষের কিছু পদক্ষেপও চোখে পড়ে। আগে একটি টিকিট কাটার বুথ থাকলেও আজ দেখা যায় মহিলা, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের আলাদা বুথসহ একাধিক বুথ। পাশাপাশি বাঁশ দিয়ে একাধিক কিউ (সারি) করে দেওয়া হয়েছে। ফলে দর্শনার্থীরা আগের মতো বিশৃঙ্খলভাবে না গিয়ে সারিবদ্ধভাবে প্রবেশ করছেন। এছাড়া জাদুঘরের বাইরের বিভিন্ন দেয়ালে জাদুঘর খোলার ও বন্ধের সময়সূচি টানিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
‘গণভবনে কখনো ঢোকার সুযোগ হয়নি, এটা দেখাই মূল উদ্দেশ্য’
মো. মুরাদ হোসেন বগুড়া থেকে ঢাকায় এসেছেন চাকরির ইন্টারভিউ দিতে। এর মধ্যেই ঘুরতে এসেছেন জুলাই জাদুঘর দেখতে। তিনি বলেন, ‘আসলে গণভবনে কখনো ঢোকার সুযোগ হয়নি। এটা দেখাই মূল উদ্দেশ্য। এরপর অন্য যা আছে দেখবো।’
কেরানীগঞ্জ থেকে জুমার নামাজ পড়ে জাদুঘর দেখতে এসেছেন মো. নাইমুর রহমান ও তার দুই বন্ধু। তিনি জানান, গণভবন কখনো দেখার সুযোগ হয়নি। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনে যারা নিহত হয়েছেন, তাদের জিনিসপত্র রাখা আছে, সেগুলো দেখতে এসেছেন।
নাইমুর বলেন, ‘জুমার নামাজ পড়ে চলে এসেছি এখানে। জীবনে তো গণভবন দেখার সৌভাগ্য হয়নি, সেটা দেখবো। আর আমাদের যে ভাই-বোনরা জুলাই আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন, তাদের স্মৃতি দেখতেই এসেছি।’
মাহবুব ইসলাম বন্ধুদের নিয়ে এসেছেন গাজীপুর থেকে। উদ্দেশ্য জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ের স্মারক দেখা। তিনি বলেন, ‘আমরা তিন বন্ধু মিলে গাজীপুর থেকে এসেছি জুলাই জাদুঘর দেখতে। আগে কখনো দেখা হয়নি। শুনেছি জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন জিনিসপত্র এখানে আছে। কী কী আছে, সেগুলো দেখতেই এসেছি।’
অনলাইনে টিকিট কেটেও ভোগান্তিতে দর্শনার্থীরা
পরিবার নিয়ে সাভার থেকে এসেছেন আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, ‘আমি অনলাইনে টিকিট কেটেছিলাম। আমার তো সময় দেওয়া ছিল দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। তাই আমি ২টার আগেই এসেছি। এখন এসে দেখি ৩টার আগে ঢুকতে দেবে না। এখন এক ঘণ্টার বেশি হয়ে গেছে দাঁড়িয়ে আছি।’
সাজ্জাদুল ইসলাম রিপন তার পরিবার নিয়ে রাজধানীর গোপীবাগ থেকে এসেছেন দুপুর দেড়টার দিকে। তিনি অনলাইনে টিকিট কেটেছিলেন। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার টিকিটে সময় দেওয়া ২টা থেকে ৪টা। সেই হিসেবে আমি এসেছি দেড়টার দিকে। একজন এসে তো আমার দেড় ঘণ্টা শেষ হয়ে গেল। আমি একা হলে চলে যেতাম। এত সময় নষ্ট করে এই জাদুঘর দেখার ইচ্ছা আমার নাই। শুধু স্ত্রী-বাচ্চাদের নিয়ে আসছি বলে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারা অনলাইনে টিকিটের ব্যবস্থা করতে পেরেছে আর সেখানে বিকেল ৩টা থেকে ঢুকতে হবে, সেটা উল্লেখ করতে পারেনি! আমাদের টিকিট কাটার যে স্লট ২টা থেকে ৪টা আছে, সেটাকে ৩টা থেকে করে দিলেই তো হয়। তাহলেই তো এই হাজার হাজার মানুষের কষ্ট করতে হয় না। এটা পুরাপুরি একটা মিস ম্যানেজমেন্ট।’
যা বলছে কর্তৃপক্ষ
দর্শনার্থীদের শৃঙ্খলায় আনতে নেওয়া উদ্যোগ ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয় জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাবের সঙ্গে।
দর্শনার্থীদের শৃঙ্খলায় আনতে নেওয়া উদ্যোগ প্রসঙ্গে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রথমত হচ্ছে, আমরা জাদুঘর ৫ আগস্ট আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করার পর ৬ আগস্ট থেকে এটা জনসাধারণের উদ্দেশ্যে খুলে দিয়েছি। ৬ আগস্ট আমরা অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছি। কিন্তু সেদিন দর্শনার্থীদের সামাল দিতে আমরা হিমশিম খেয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘৭ আগস্ট থেকেই আমরা সম্পূর্ণ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছি জাদুঘরে। মূলত দুইটা কারণে, দুইভাবে। একটা হচ্ছে, আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় অনলাইনে একটা ক্যাম্পেইন করেছি, “জুলাই জাদুঘর আপনার, তাই এটা সুরক্ষার দায়িত্ব আপনাদের।” এটা খুবই সফল একটা ক্যাম্পেইন। জনসাধারণ নিজেরাও এখন অনেক সচেতনভাবে জাদুঘর দেখছে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আমরা টিকিট কাউন্টার ভেতর থেকে বাইরে নিয়ে পাঁচটি টিকিট কাউন্টার বানিয়েছি। যেহেতু বাইরে টিকিট কাউন্টার করেছি, আর ওই যে দেখলেন, বাঁশ দিয়ে আমরা যেভাবে লাইন করে দিয়েছি; সারিবদ্ধভাবে এখন দর্শনার্থীরা খুবই সুশৃঙ্খলভাবে ঢুকছে।’
মহাপরিচালক বলেন, ‘মূল ভবনের ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক আমরা ১০ জন দিয়ে শুরু করেছিলাম, এখন ৫০ জনের বেশি করেছি। প্রায় প্রত্যেকটা ঘরেই স্বেচ্ছাসেবক আছে। এছাড়া আমাদের এখানে আনসার, আর্মড পুলিশ; বাকি নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আরও মজবুত করা হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে ৬ আগস্টের পর ৭ আগস্ট থেকে আমাদের আর কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবে দর্শনার্থী প্রচুর আসছে।’
প্রতিদিন গড়ে কেমন দর্শনার্থী আসছে জানতে চাইলে তানজিম ওয়াহাব বলেন, ‘প্রতিদিন গড়ে ৫ হাজারের উপরে দর্শনার্থী আসছে। ১০ হাজারও হয়েছে মাঝে মাঝে। ছুটির দিনগুলোতে বেশি দর্শনার্থী আসে। শুক্রবারে সবচেয়ে বেশি আসে। এজন্য আমরা আবার শুক্রবারে গানের বিশেষ ব্যবস্থা রাখি। আজকে পুরো সময়জুড়েই আমাদের যে জুলাই মঞ্চ আছে, ওপেন ফিল্ড; ওখানে আবার গান হচ্ছে।’
দর্শনার্থীরা অভিযোগ করেছেন সময় নিয়ে। অনেকেই জানেন না যে শুক্রবার ৩টা থেকে খোলা। আবার অনেকে অনলাইনে টিকিট কাটেন, তাদের দেখা গেছে স্লট ২টা থেকে ৪টা। কিন্তু জাদুঘর খোলে ৩টায়। এই বিষয়ে দর্শনার্থীদের অভিযোগ আছে। এ বিষয়ে আপনাদের কী প্ল্যান, জানতে চাইলে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক বলেন, ‘অনলাইনের এই স্লটটা আমরা আগে যে পরিকল্পনা করেছিলাম, ওখান থেকে একটু সরে এসেছি। আমরা অনলাইন-অফলাইন দুইভাবে দর্শনার্থী আসতে পারে, শুক্রবারে ৩টা থেকে সাড়ে ৬টা। এটা আমরা সোশ্যাল মিডিয়াতেও দিয়েছি, জাদুঘরের বাইরেও দিয়েছি। তবে এটার আমরা আরও প্রচারণা বাড়ানোর ব্যবস্থা করছি। শুক্রবারটাতেই ঝামেলা হয়, বাকি সবগুলো দিন ঠিক আছে। শুক্রবারটা আমরা ঝামেলামুক্ত করার চেষ্টা করছি।’
এ বিষয়ে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে আপাতত ৩টা থেকে সাড়ে ৬টাই থাকবে। আমরা আমাদের সোশ্যাল মিডিয়াতে লিখেছি, পোস্ট দিয়েছি, আরও ঘন ঘন পোস্ট দেব। আর অনলাইন সিস্টেমটাকে আপগ্রেড করে ফেলব।’
এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘আরেকটা কথা জানিয়ে রাখি যে, আমরা কিন্তু পরীক্ষামূলকভাবে এই ১১টা থেকে ৬টা করেছি। সিজন ভেদে পরবর্তীতে আমরা যদি দেখি আরও চাপ, তাহলে আমরা সময়সীমাও পরিবর্তন করতে পারি। আপাতত সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা, সপ্তাহে পাঁচ দিন; আর শুক্রবার হাফবেলা, ৩টা থেকে সাড়ে ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।’
এখন পর্যন্ত কোনো কিছুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বা কোনো কিছু হারিয়েছে, এরকম কোনো ঘটনা ঘটেছে কিনা জানতে চাইলে তানজিম ওয়াহাব বলেন, ‘না, না। আমরা আসলে অনেক বেশি শঙ্কিত ছিলাম ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে। যদি সর্বোচ্চ ক্ষয়ক্ষতির কথা বলি, তাহলে আমাদের ছোট একটা গ্লাসের টেবিল ছিল, সেটা খুলে গিয়েছিল। লাগিয়েছি। ছোটখাটো এর বাইরে কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা জাদুঘরের কোনো স্মারকের কোনো ক্ষতি হয়নি এই পর্যন্ত।’
এ সময় দর্শনার্থীদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক বলেন, ‘আমরা বলছি যে সচেতন হতেই হবে। মনে রাখতে হবে যে জুলাই জাদুঘর ভবনটা কিন্তু জাদুঘর হিসেবে নির্মাণ করা হয়নি। বাংলাদেশের আর বাকি বেশিরভাগ জাদুঘরই তো হচ্ছে গিয়ে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহারের জন্য বানানো হয়েছে। এটা তো একটা রেসিডেন্স, তাই না? এটা যেহেতু একটা আবাসের জায়গা, একটা ভবনের জায়গায় আমরা চাইলেও খুব বেশি লোক একই সময়ে ভবনে জায়গা দিতে পারি না। এখন দর্শনার্থীরা বুঝছে। তাই একটু ধৈর্য সহকারে লাইনে দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া এই জাদুঘরে কোনো উপায় নেই।’









