রাজশাহীর পুঠিয়া যেন বাংলাদেশের ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক জীবন্ত জাদুঘর। রাজবাড়ি, দিঘি আর একের পর এক প্রাচীন মন্দিরে ঘেরা এই জনপদে ছড়িয়ে আছে বাংলার পুরোনো স্থাপত্যশৈলীর নানা নিদর্শন। এর মধ্যেই স্বতন্ত্র নির্মাণশৈলী ও পোড়ামাটির অলংকরণের কারণে নজর কাড়ে বড় আহ্নিক মন্দির।
পুঠিয়া উপজেলা সদরের ঐতিহাসিক মন্দিরসমষ্টির অংশ এই মন্দির। এটি শ্যামসাগর দিঘির পশ্চিম পাড়ের চারআনি জমিদারবাড়ি এলাকার কাছে অবস্থিত। একই অঙ্গনে বড় আহ্নিক মন্দিরের পাশাপাশি ছোট গোবিন্দ ও গোপাল মন্দিরও রয়েছে।
তিন কক্ষের ব্যতিক্রমী স্থাপত্য
বড় আহ্নিক মন্দিরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক এর নির্মাণশৈলী। পূর্বমুখী আয়তাকার মন্দিরটিতে পাশাপাশি রয়েছে তিনটি কক্ষ। মাঝের কক্ষটি আয়তাকার এবং এর পূর্বদিকে রয়েছে তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ।
মাঝের কক্ষের দুই পাশে থাকা উত্তর ও দক্ষিণের কক্ষ দুটি তুলনামূলক ছোট ও বর্গাকার। এসব কক্ষের সামনে রয়েছে পৃথক খিলানপথ। মাঝের অংশে দোচালা ছাদ এবং দুই পাশের অংশে চৌচালা ছাদের ব্যবহার মন্দিরটির স্থাপত্যে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে।
বাংলার স্থানীয় ঘরবাড়ির ছাদশৈলী থেকে বিকশিত দোচালা ও চৌচালা নকশার এমন সমন্বিত ব্যবহারই মন্দিরটিকে আলাদা করে তুলেছে। স্থাপত্য গবেষণায় এটিকে ‘এক-বাংলা দুই চৌচালা’ ধরনের একটি বিরল উদাহরণ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
পোড়ামাটির ফলকে ইতিহাসের গল্প
মন্দিরটির সামনের দেয়ালজুড়ে রয়েছে অসংখ্য পোড়ামাটির ফলক। এসব টেরাকোটা অলংকরণ পুঠিয়ার মন্দির স্থাপত্যের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। সময়ের প্রভাবে কিছু ফলক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মন্দিরটির অলংকরণ এখনো দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়।
শুধু ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে নয়, এসব টেরাকোটা কাজ তৎকালীন বাংলার শিল্পরুচি, কারিগরি দক্ষতা ও স্থাপত্যচর্চারও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে।
কয়েক শতাব্দীর পুরোনো ঐতিহ্য
বড় আহ্নিক মন্দিরের নির্মাণকাল নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। পুঠিয়া উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরটি চারআনি জমিদারদের উদ্যোগে ১৭ থেকে ১৮ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে নির্মিত বলে জানা যায়। অন্যদিকে স্থাপত্য গবেষণায় এর নির্মাণকালকে ১৮ শতকের প্রথমার্ধের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
যে সময়েই নির্মিত হোক, কয়েক শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এই মন্দির পুঠিয়ার ঐতিহাসিক স্থাপত্যভান্ডারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এক মন্দির ঘুরতে এসে দেখা যাবে আরও অনেক কিছু
বড় আহ্নিক মন্দির দেখতে গেলে শুধু এই একটি স্থাপনা দেখেই ফিরে আসার প্রয়োজন নেই। পুঠিয়ার মন্দিরপল্লিতে কাছাকাছি রয়েছে আরও বেশ কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা।
পুঠিয়া মন্দির কমপ্লেক্সে রয়েছে বড় গোবিন্দ মন্দির, ছোট গোবিন্দ মন্দির, ছোট আহ্নিক মন্দির, গোপাল মন্দির, বড় শিব মন্দির, দোল মন্দির ও জগন্নাথ মন্দিরসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা। শ্যামসাগরসহ প্রাচীন দিঘিগুলোও এই এলাকার দৃশ্যপটকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
কীভাবে যাবেন?
রাজশাহী শহর থেকে সড়কপথে পুঠিয়ায় যাওয়া যায়। পুঠিয়া শহর রাজশাহী শহরের কাছেই অবস্থিত এবং মন্দিরগুলো মূলত পুঠিয়া রাজবাড়ি ও দিঘিকে ঘিরে বিস্তৃত। ফলে একদিনের ভ্রমণেই রাজবাড়ি, মন্দির, দিঘি ও আশপাশের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে।
ইতিহাস, স্থাপত্য আর পুরোনো বাংলার সংস্কৃতি একসঙ্গে দেখতে চাইলে পুঠিয়ার বড় আহ্নিক মন্দির হতে পারে ভ্রমণতালিকার আকর্ষণীয় একটি গন্তব্য। বিশেষ করে মন্দিরটির দোচালা-চৌচালা স্থাপত্যের সমন্বয় ও পোড়ামাটির কারুকাজ এটিকে পুঠিয়ার অন্য অনেক স্থাপনার মাঝেও আলাদা পরিচয় দিয়েছে।








