বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মহাকবি কায়কোবাদ এক উজ্জ্বল নাম। ১৮৫৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার নবাবগঞ্জের আগলা পূর্বপাড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই কবির শৈশব, কর্মজীবন ও সাহিত্যচর্চার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এ অঞ্চলের নানা স্থান। সময়ের পরিবর্তনে সেই স্মৃতিচিহ্নগুলোর অনেকটাই আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। তাই কায়কোবাদের স্মৃতি অনুসরণ করে নবাবগঞ্জ ঘুরে দেখা হতে পারে ইতিহাস ও সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য ভিন্নধর্মী এক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।
আগলা পূর্বপাড়ায় পৌঁছালে প্রথমেই খুঁজে পাওয়া যায় কবির জন্মভিটার স্মৃতি। এখানেই তাঁর জন্ম ও পারিবারিক বসতবাড়ি ছিল। বর্তমানে সেই বাড়ির পুরোনো স্থাপনা অনেকটাই জীর্ণ। কোথাও টিনের ঘর, কোথাও গাছপালায় ঘেরা ফাঁকা জায়গা। অতীতের সেই আবাসের অস্তিত্ব যেন কেবল কিছু অস্পষ্ট চিহ্নে টিকে আছে। স্থানীয়দের কাছ থেকে পথনির্দেশ নিয়ে সেখানে পৌঁছানো গেলেও কবির আসল বসতঘরটি কোনটি, তা নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা কঠিন।
জন্মভিটার পাশেই রয়েছে কায়কোবাদ স্মৃতি মসজিদ। আশপাশের মানুষের কাছে এটি কবির স্মৃতির সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। পুরোনো স্মৃতিচিহ্নগুলোর মধ্যে মসজিদটিই তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় রয়েছে এবং এখনও সেখানে নিয়মিত নামাজ আদায় করা হয়।
কায়কোবাদের জীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানা আগলা ডাকঘর। দীর্ঘ সময় তিনি সেখানে পোস্টমাস্টারের দায়িত্ব পালন করেন। চাকরির পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাও চালিয়ে গেছেন। ফলে ডাকঘরটি শুধু তাঁর কর্মস্থল নয়, তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
কবির স্মৃতি ধরে রাখতে ১৯৭২ সালে তাঁর কর্মস্থলের কাছাকাছি প্রতিষ্ঠা করা হয় কায়কোবাদ বালিকা উচ্চবিদ্যালয়। তৎকালীন সংসদ সদস্য সুবিদ আলী খানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান।
আগলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ইছামতি নদীও কায়কোবাদের স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। নদীর পাড়ের শান্ত, সবুজ পরিবেশ তাঁর সাহিত্যসৃষ্টিতে প্রভাব ফেলেছিল বলে স্থানীয়ভাবে স্মরণ করা হয়। তাঁর বিখ্যাত ‘আযান’ কবিতার প্রসঙ্গেও এই এলাকার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা উঠে আসে। কবির নামকে স্মরণীয় করে রাখতে জেলা পরিষদের উদ্যোগে ২০০৬ সালে নির্মিত একটি সড়কের নাম দেওয়া হয় ‘কায়কোবাদ সড়ক’।
তবে নবাবগঞ্জে কায়কোবাদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো ঘুরতে গেলে আনন্দের পাশাপাশি আক্ষেপও তৈরি হয়। যথাযথ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তাঁর জন্মভূমির অনেক স্মৃতিচিহ্ন ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে মহাকবি কায়কোবাদ স্মৃতি সংসদসহ কয়েকটি সংগঠন বিভিন্ন সময়ে জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেও স্থায়ী সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা থেকেই যাচ্ছে।
নবাবগঞ্জের আগলা যদি কায়কোবাদের জন্ম ও কর্মজীবনের স্মৃতি বহন করে, তবে ঢাকার আজিমপুর কবরস্থান ধারণ করে তাঁর শেষ ঠিকানা। এখানেই সমাহিত আছেন মহাকবি কায়কোবাদ। কবরের সামনে থাকা ফলকে তাঁর কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি উৎকীর্ণ রয়েছে। সাহিত্যপ্রেমী কিংবা ইতিহাস অনুসন্ধানী ভ্রমণকারীরা চাইলে আজিমপুর কবরস্থান ঘুরে কবির সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে পারেন।
আজিমপুর কবরস্থানের দক্ষিণ পাশের গেট দিয়ে প্রবেশ করলে কায়কোবাদের সমাধি খুঁজে পাওয়া তুলনামূলক সহজ। নবাবগঞ্জের জন্মভূমি থেকে আজিমপুরের সমাধি এই পথ ধরে একজন সাহিত্যপ্রেমীর ভ্রমণ হতে পারে বাংলা সাহিত্যের এক বিস্মৃত অধ্যায়কে নতুন করে জানার সুযোগ।









