পাথরের স্তূপে হারাচ্ছে নদীর সৌন্দর্য, সংকটে পর্যটন ও হাজারো শ্রমিকের জীবিকা

ফিচার ডেস্ক
১১ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:০৭ আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:০৭

নদীর স্বচ্ছ জলধারা, পাথরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর পাহাড়ঘেরা মনোমুগ্ধকর পরিবেশ প্রকৃতির এই অপরূপ রূপ দেখতে প্রতিবছরই সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর এলাকায় ছুটে আসেন অসংখ্য পর্যটক। কিন্তু সেই চিরচেনা সৌন্দর্যে এখন যেন ছন্দপতন। পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকলেও নদীতে জমে থাকা পাথরের স্তূপ বাধাগ্রস্ত করছে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ, কমছে নাব্যতা। এর প্রভাব পড়ছে নদীকেন্দ্রিক পর্যটন, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা এবং পরিবেশের ওপর।

নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মূল আকর্ষণ স্বচ্ছ জল, পাথরের বিছানা, নৌভ্রমণ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। কিন্তু নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হলে বদলে যায় তার চিরচেনা রূপ। কোথাও পাথরের স্তূপে সংকুচিত হচ্ছে পানির চলাচলের পথ, কোথাও নৌযান চলাচলে তৈরি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা। ফলে পর্যটকদের কাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

পর্যটনে পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব

প্রকৃতির টানে পর্যটকেরা ছুটে যান নদী ও পাথরঘেরা এসব এলাকায়। স্বচ্ছ পানিতে নৌভ্রমণ, নদীর বুকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা পাথর দেখা এবং সবুজ পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করাই তাদের অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া এবং পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলে এসব পর্যটন কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।

নদীর সৌন্দর্য ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে দীর্ঘমেয়াদে পর্যটন গন্তব্যের আকর্ষণও কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে পর্যটক কমে যাওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন নৌকার মাঝি, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, হোটেল-রিসোর্টের কর্মী এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা।

নদীভাঙন ও ফসলি জমি নিয়ে উদ্বেগ

পাথর জমে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নিয়েও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। নদীর গতিপথ ও পানির প্রবাহে পরিবর্তন এলে কোনও কোনও স্থানে ভাঙন কিংবা জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে এসব প্রভাবের প্রকৃত কারণ ও মাত্রা নির্ধারণে প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ।

নদী রক্ষা শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় মানুষের বসতি, কৃষি, অর্থনীতি এবং পর্যটননির্ভর জীবিকা।

কর্মহীন হাজারো শ্রমিক, বাড়ছে জীবিকার সংকট

 পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকায় সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের সংকটে পড়েছেন বলে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পাথর উত্তোলন ও পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না থাকলে তাদের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

একদিকে নদীর পরিবেশ ও স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা করা জরুরি, অন্যদিকে শ্রমিকদের জীবিকার প্রশ্নটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দুটিকে সমন্বয় করেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে এগোতে হবে।

সমাধান কোথায়?

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে নদীর নাব্য, পাথর জমার কারণ এবং পানিপ্রবাহের ওপর এর প্রভাব নিরূপণ করা জরুরি। পাশাপাশি নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং বিদ্যমান আইন বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

 একই সঙ্গে পাথর উত্তোলনের ওপর নির্ভরশীল শ্রমিকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন খাতে কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে নদীকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা গেলে প্রকৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।

নদী বাঁচলে বাঁচবে পর্যটন

নদী একটি অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, যোগাযোগ ও পর্যটন অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বহু ক্ষেত্রে।

বিভিন্ন সংবাদ মাদ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসা নদীর প্রবাহ, নাব্য, বসতি, ফসলি জমি ও শ্রমিকদের জীবিকার সংকট নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে। এখন প্রয়োজন সমস্যার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ।

প্রকৃতি রক্ষা করে পর্যটনকে টিকিয়ে রাখা এবং শ্রমিকদের জন্য টেকসই জীবিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হতে পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ। কারণ নদীর সৌন্দর্য হারিয়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু পর্যটন নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে একটি অঞ্চলের সামগ্রিক জীবন ও অর্থনীতি।

/এমএএল/
সম্পর্কিত
সাজেকে সড়ক অবরোধ করলো কারা? কীভাবে ফিরবেন দেড় হাজার পর্যটক
বিনা টিকিটে ভ্রমণ, পরে চিরকুটে ৩০ টাকা দিয়ে যা লিখলেন যাত্রী
প্রার্থনা, প্রশান্তি আর আধ্যাত্মিক ভ্রমণের ঠিকানা মা মারিয়া ধর্মপল্লী
সর্বশেষ খবর
সাজেকে সড়ক অবরোধ করলো কারা? কীভাবে ফিরবেন দেড় হাজার পর্যটক
সাজেকে সড়ক অবরোধ করলো কারা? কীভাবে ফিরবেন দেড় হাজার পর্যটক
ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্ষোভ
ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্ষোভ
‘তানহাজি’কে ছাড়িয়ে ৪৫০ কোটির পথে অজয়ের ‘দৃশ্যম ৩’
‘তানহাজি’কে ছাড়িয়ে ৪৫০ কোটির পথে অজয়ের ‘দৃশ্যম ৩’
প্রযুক্তিকে দেশের বাস্তবতায় কাজে লাগানোর আহ্বান শিক্ষামন্ত্রীর
প্রযুক্তিকে দেশের বাস্তবতায় কাজে লাগানোর আহ্বান শিক্ষামন্ত্রীর
সর্বাধিক পঠিত
ম্যাকবুক উপহার দি‌য়ে জার্মান পর্যট‌কের দুঃখ ঘোচা‌লেন একজন
ম্যাকবুক উপহার দি‌য়ে জার্মান পর্যট‌কের দুঃখ ঘোচা‌লেন একজন
আলহামদুলিল্লাহ, আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন: কেয়া পায়েল
আলহামদুলিল্লাহ, আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন: কেয়া পায়েল
স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা, কার ডাকে কক্সবাজার গেলো কিশোরী?
স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যা, কার ডাকে কক্সবাজার গেলো কিশোরী?
মৌখিক পরীক্ষা না দিয়েও চূড়ান্ত তালিকায় বিএনপি নেতার স্ত্রীর নাম
মৌখিক পরীক্ষা না দিয়েও চূড়ান্ত তালিকায় বিএনপি নেতার স্ত্রীর নাম
বাস নিয়ন্ত্রণে এবার রাস্তায় মালিকরা
বাস নিয়ন্ত্রণে এবার রাস্তায় মালিকরা