মনোমুগ্ধকর সোচা নদীর ওপর সোলকান ব্রিজের স্থাপত্যশৈলী

Send
রাকিব হাসান, স্লোভেনিয়া
প্রকাশিত : ১১:০০, জুন ০৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:০০, জুন ০৭, ২০২০

সোচা নদীর ওপর সোলকান ব্রিজস্লোভেনিয়ায় সোচা নদীর ওপর সোলকান ব্রিজ যেন প্রকৃতির সঙ্গে স্থাপত্যশৈলীর অসাধারণ মেলবন্ধন। ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিচার মূল ক্যাম্পাস থেকে মাত্র সাড়ে চার কিলোমিটার দূরে জায়গাটি। গত ঈদে সেখানে বেড়িয়ে এলাম। নদী, পাথরের সেতু, পাহাড়, প্রকৃতি মিলিয়ে এককথায় অপূর্ব জায়গা।

ক্যাম্পাসের এত কাছে স্লোভেনিয়া ও ইতালির সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এমন মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য ডানা মেলে আছে, এদিকে পা না বাড়ালে জানাই হতো না। অথচ এর আগে দূর-দূরান্তে ঘুরে বেড়িয়েছি।

সোলকান ব্রিজকে স্লোভেনিয়ান ভাষায় ‘সোলকানস্কি মোস্ট’ নামে ডাকা হয়। এর ওপরে রয়েছে দেশটির বোহিনিজ পৌরসভার রেলপথ। সেতুটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৭২১ ফুটের কাছাকাছি। পাথরের তৈরি আর্ক আদলের পৃথিবীর দীর্ঘতম ব্রিজ হিসেবে এটি স্থান পেয়েছে গিনেস ওয়ার্ল্ড বুকে।

ব্রিজটির একটি স্প্যানের দৈর্ঘ্য ২৭৯ ফুটের কাছাকাছি। আনুমানিক ১৯০০ সালের দিকে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। তখন স্লোভেনিয়া অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিখ্যাত অস্ট্রিয়ান স্থপতি রুডলফ ইয়াউজনার ও লিওপোল্ড ওয়েরলি এই সেতুর নকশাপ্রণেতা।

১৯০৬ সালের ১৯ জুলাই সর্বপ্রথম ব্রিজটি রেল চলাচলের জন্য উনুক্ত করে দেওয়া হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন অস্ট্রিয়ার সৈন্যরা আশেপাশের এলাকাগুলো প্রতিপক্ষের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য সেতুটি ধ্বংস করে দেয়। যুদ্ধের পর অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে স্লোভেনিয়া যোগ দেয় যুগোস্লাভিয়া ফেডারেশনে। ১৯২৫ সালে তৎকালীন সরকার পুনরায় মূল স্থাপত্যকলার সঙ্গে মিল রেখে নতুনভাবে সেতুটি গড়ে তোলে। ১৯২৭ সালে এতে পুনরায় রেল চলাচল শুরু হয়।

আল্পস পর্বতমালাবিধৌত উপত্যকা থেকে উৎপন্ন হয়ে সোচা নদী পশ্চিম স্লোভেনিয়া ও উত্তর-পূর্ব ইতালির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ইতালির মনফালকোনের কাছাকাছি এসে এটি ভূমধ্যসাগরের শাখা আড্রিয়াটিক সাগরে পতিত হয়েছে।

স্লোভেনিয়ার অংশে নদীটির দৈর্ঘ্য ৬০ মাইলের কাছাকাছি। আর ইতালির অংশে প্রায় ২৭ মাইল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই এলাকায় উল্লেখযোগ্য কোনও সামরিক অভিযানের কথা শোনা না গেলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে একডজন সশস্ত্র যুদ্ধের সাক্ষী সোচা নদী। এসব ঘটনায় ইতালিসহ অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের অধীনে কাজ করা প্রায় পাঁচ লাখ সৈন্যের জীবনাবসান হয়।

স্লোভেনিয়া ও ইতালীয় সাহিত্যে সোলকান ব্রিজ ও সোচা নদী বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। পান্নার মতো সবুজাভ স্বচ্ছ জলরাশির রূপে মুগ্ধ হয়ে বিখ্যাত কবি সিমন গ্রেগরচ্চি লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘সোচি’। স্লোভেনিয়ার সাহিত্যে সর্বকালের সেরা কবিতার মধ্যে এটি অন্যতম। বিখ্যাত ইতালিয়ান কবি জিউসেপ্পে উঙ্গারেত্তির অনেক কবিতায় উঠে এসেছে নদীটির কথা।

সোচা নদীর ওপর সোলকান ব্রিজের সামনে লেখক২০০৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হলিউডের নার্নিয়া সিরিজের ‘দ্য ক্রনিকলস অব নারনিয়া: প্রিন্স ক্যাস্পিয়ান’-এর বেশকিছু দৃশ্যের চিত্রায়ন হয় নৈসর্গিক সৌন্দর্যমণ্ডিত সোচা নদীকে ঘিরে। পাশাপাশি সালমো মারমোরাটাসসহ অসংখ্য প্রজাতির মাছের অভয়াশ্রম এই নদী।

প্রতি বছর স্লোভেনিয়া, ইতালিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য পর্যটক সোচা নদীর ওপর নির্মিত পাথরের ব্রিজটির সৌন্দর্য উপভোগের জন্য ভিড় জমায়। সেখানে যেতে হলে স্লোভেনিয়া ও ইতালির সীমান্তবর্তী শহর নোভা গোরিচায় আসতে হবে। সেখান থেকে বাসে সোলকানে যাওয়া যায়। বারবার বেড়ানোর জন্য যেতে ইচ্ছে করে এই জায়গায়।

/জেএইচ/
টপ