ট্রাভেলগজমিদার বাড়ি দেখি…

Send
শান্তনু চৌধুরী
প্রকাশিত : ১০:০০, জুন ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৩৭, জুন ১২, ২০২০

মহেড়া জমিদার বাড়িটাঙ্গাইল থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে মহেড়া জমিদার বাড়ি। টিকিট কেটে ভেতরে ঢোকার পর সুন্দর ফুলের বাগান দেখে মন ভরে গেলো। চারদিকে নানান জাতের ফুল ফুটে রয়েছে।

প্রথমে ঢুকলাম কালীচরণ লজে। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির শেষের দিকে এটি নির্মিত। অন্য ভবন থেকে অনেকটা আলাদা। বর্তমানে এই লজ পুলিশের জাদুঘর হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। এখানে আছে পুলিশের ব্যবহহৃত পুরনো দিনের হাতিয়ার। বিভিন্ন ছবিতে লেখা জমিদার বাড়ির ইতিহাস। জমিদারদের ব্যবহার করা নানান সামগ্রী রয়েছে এখানে। জমিদার বাড়িতে প্রবেশের একটা আলাদা শিহরণ থাকে। কারণ এগুলোর একেকটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক ইতিহাস।

পাশের চৌধুরী লজ গোলাপি রঙা। সুন্দর নকশাখচিত ভবনটির পিলারগুলো রোমান স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। ভেতরে ঢেউ খেলানো ছাদ। দোতলা ভবনটির সামনে সুন্দর বাগান ও সবুজ মাঠ।

মহেড়া জমিদার বাড়িএরপর আমরা গেলাম আনন্দ লজে। মহেড়া জমিদার বাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা এটি। তিন তলা বিশিষ্ট ভবনের সামনে আটটি সুদৃশ্য কলাম। এখানকার ঝুলন্ত বারান্দা দৃষ্টিনন্দন। আনন্দ লজের সামনে হরিণ, বাঘ ও পশু-পাখির ভাস্কর্যসহ একটি চমৎকার বাগান আছে।

সবশেষে থাকা মহারাজ লজ বাইজেনটাইন স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। এর সামনে ছয়টি কলাম। এছাড়া ভবনের শোভা বাড়িয়েছে সিঁড়ির বাঁকানো রেলিং ও ঝুলন্ত বারান্দা। এতে মোট কক্ষ আছে বারোটি। সামনে বাগান ও পেছনে একটি টেনিস কোর্ট। এসব ভবন শুটিং স্পট হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে।

মহেড়া জমিদার বাড়িজমিদার বাড়ির পেছনের দিকে মিনি চিড়িয়াখানা। এতে দেখা যায় হরিণ, খরগোশ, ময়ূরসহ বিভিন্ন প্রাণী। একেবারে শেষ প্রান্তে শিশু পার্ক। ‘পাসরা পুকুর’ ও ‘রানী পুকুর’ নামে দুটি পুকুর মনোরম। এছাড়া জমিদারদের আরও স্থাপনা ছড়িয়ে আছে আশেপাশে।

ইতিহাস বলছে, ১৮৯০ সালের আগে স্পেনের করডোভা নগরীর আদলে প্রতিষ্ঠিত হয় মহেড়া জমিদার বাড়ি। স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকবাহিনী এতে হামলার পাশাপাশি বাড়ির কূলবধূসহ গ্রামের পাঁচজনকে নির্মমভাবে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। পরবর্তী সময়ে তারা লৌহজং নদীর নৌপথে দেশত্যাগ করেন।

মহেড়া জমিদার বাড়িজমিদার বাড়িতে প্রবেশের জন্য রয়েছে দুটি সুরম্য ফটক। প্রবেশপথের আগে ‘বিশাখা সাগর’ নামে বিশাল একটি দীঘি। এর দক্ষিণ পাশে বিস্তৃত আম্রকানন। এছাড়া বড় আকারের তিনটি ভবনের সঙ্গে রয়েছে নায়েব সাহেবের ঘর, কাছারি ঘর ও গোমস্তাদের ঘর।

আমাদের এবারের যাত্রা টাঙ্গাইলের করটিয়া জমিদার বাড়ির দিকে। কিন্তু ঢোকার পথেই বাধা। ভেতরে যাওয়ার অনুমতি নেই। তবে এখানে দায়িত্বপ্রাপ্তদের হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিলেই ঢোকা যায়। পুরো জায়গার দৈর্ঘ্য প্রায় ১ কিলোমিটার। চারপাশ প্রাচীরঘেরা। এখানে মেলে প্রাকৃতিক ও নিরিবিলি পরিবেশ।

করটিয়া জমিদার বাড়িআমরা ঢোকার পর পুকুরের পাড় দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। এটি রোকেয়া মহলে যাওয়ার পথ। রোকেয়া মহলের সামনে রানির পুকুরঘাট। আশেপাশে তখনকার সময়ের নানান স্থাপনা ও কুয়ো। এর মধ্যে চোখে পড়ে লোহার ঘর, ছোট তরফ দাউদ মহল এবং বাড়িসংলগ্ন মোগল স্থাপত্যের আদলে গড়া মসজিদ।

ভারত থেকে আসা পন্নী বংশের লোকজনই এখানে বংশ পরস্পরায় জমিদারি করে গেছেন। নিজেদের মধ্যে মামলা-মোকাদ্দমায় জড়ালেও এই অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারে তাদের ভূমিকা ছিল ব্যাপক। তারাই প্রতিষ্ঠা করেছেন স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা। মোগল ও চৈনিক স্থাপত্যের মিশেলে গড়া জমিদার বাড়িটি এককথায় মনকাড়া। রোকেয়া মহল এখন বিদ্যালয় ও কোচিং সেন্টার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।

করটিয়া জমিদার বাড়ি‌‘আটিয়ার চাঁদ’ নামক গ্রন্থ থেকে জানা যায়, আফগান অধিপতি সোলায়মান খান পন্নী কররানির ছেলে বায়েজিদ খান পন্নী ভারতে আগমন করেন। তার পুত্র সাঈদ খান পন্নী আটিয়ায় বসতি গড়েন। সাঈদ খানের হাত ধরে ১৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে আটিয়ার বিখ্যাত মসজিদ নির্মিত হয়।

পন্নী বংশের ১১তম পুরুষ ছিলেন সা'দত আলী খান পন্নী। তিনি টাঙ্গাইলের করটিয়ায় এসে পন্নী বংশের ভিত প্রতিষ্ঠা করেন। ঊনিশ শতকের গোড়ার দিকে সাদত আলী খান পন্নী সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে মামলায় জড়িয়ে পড়েন। ঢাকার জমিদার খাজা আলীমুল্লাহর সহায়তায় তিনি পৈতৃক সম্পত্তি উদ্ধার করেন। কিন্তু শর্তভঙ্গের কারণে পাল্টা মামলা করে খাজা আলিমুল্লাহ ভোগ-স্বত্বের ডিক্রি পান। তখন সা'দত আলী খান সম্পত্তি রক্ষার জন্য স্ত্রী জমরুদুন্নেসা খানমের নামে তা দানপত্র করে দেন। পরে অবশ্য উভয় পক্ষের মধ্যে আপস-মীমাংসা হয়।

করটিয়া জমিদার বাড়িসা'দত আলী খান সম্পত্তির ৭ আনা অংশ খাজা আলিমুল্লাহকে ছেড়ে দেন। অতঃপর ১২২৭ সনের ৯ পৌষ সা'দত আলী খান ও তার স্ত্রী জমরুদুন্নেসা খানম যৌথভাবে একটি দলিল করেন। এতে সমস্ত সম্পত্তি দুটি ভাগে বিভক্ত করে একভাগ পরিবারের ব্যয় ও অন্য ভাগ ওয়াকফ্ করে ধর্মীয় ও দাতব্য কাজে ব্যয় করার জন্য রাখা হয়। ওয়াকফ্ সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য মুতাওয়াল্লী নিয়োগের বিধান ছিল। সা'দত আলী খান পন্নীর মৃত্যুর পর তার পুত্র হাফেজ মাহমুদ আলী খান পন্নী মুতাওয়াল্লী ছিলেন। মাহমুদ আলী খান পন্নীর মৃত্যুর পর মুতাওয়াল্লী কে হবেন তা নিয়ে তার পুত্র ওয়াজেদ আলী খান পন্নী (চাঁদ মিয়া) ও পিতামহী জমরুদুন্নেসা খানমের মধ্যে বিবাদ ও মামলা-মোকদ্দমা হয়। পরিশেষে ওয়াজেদ আলী খান পন্নী জয়ী হন এবং দক্ষতার সঙ্গে জমিদারি পরিচালনা করেন।

পন্নী পরিবারের ১৩তম পুরুষ দানবীর জমিদার ‘আটিয়ার চাঁদ’ হিসেবে খ্যাত ওয়াজেদ আলী খান পন্নী অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে ১৯২১ সালের ১৭ ডিসেম্বর কারারুদ্ধ হন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অনমনীয় মনোভাব ও দৃঢ়ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ আজও লন্ডন মিউজিয়ামে সংরক্ষিত ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর তৈলচিত্রের নিচে লেখা রয়েছে 'ওয়ান হু ডিফাইড দি ব্রিটিশ।'

করটিয়া জমিদার বাড়িতে লেখক১৯২২ সালে জেল থেকে মুক্ত হয়ে সমাজ ও শিক্ষা সংস্কারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন ওয়াজেদ আলী খান পন্নী। ১৯২৬ সালে ‘বাংলার আলীগড়’ নামে খ্যাত করটিয়ায় সা'দত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি তিনি স্থাপন করেন রোকেয়া সিনিয়র মাদ্রাসা, এইচএম ইনস্টিটিউশন (স্কুল অ্যান্ড কলেজ) এবং দাতব্য চিকিৎসালয়সহ জনকল্যাণকর বহু প্রতিষ্ঠান। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের ব্যয় নির্বাহের জন্য তিনি সমস্ত সম্পত্তি, বসতবাড়িসহ এলাহীর উদ্দেশে ১৯২৬ সালের ৯ এপ্রিল এক ওয়াকফ্ দলিল সৃষ্টি করেন।

স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময় থেকে পন্নী পরিবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেশ পরিচিত মুখ। ওয়াজেদ আলী খানের দৌহিত্র খুররম খান পন্নী পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের চিফ হুইপ ও রাষ্ট্রদূত ছিলেন। অপর দৌহিত্র হুমায়ন খান পন্নী বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ছিলেন। খুররম খান পন্নীর পুত্র ওয়াজেদ আলী খান পন্নী (দ্বিতীয়) বাংলাদেশ সরকারের উপমন্ত্রী ছিলেন।

টাঙ্গাইল তাঁত পল্লীইতিহাসের জ্ঞান ছেড়ে সবশেষে আমরা গেলাম টাঙ্গাইলের তাঁত পল্লীতে। যদিও সেদিন বন্ধ ছিল জায়গাটি। পরে একটি কারখানা ঘুরেফিরে দেখলাম। কেনাও হলো বেশকিছু কাপড়।

ছবি: লেখক

/জেএইচ/
টপ