X
শনিবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
২০ মাঘ ১৪২৯

টিকা নয়, টাকা দিলেও পাওয়া যাচ্ছে ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট

চৌধুরী আকবর হোসেন
৩১ অক্টোবর ২০২১, ১৮:২০আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২১, ১৮:৪৪

প্রবাসী পরিচয় দিয়ে শুক্রবার (২৯ অক্টোবর) রাতে ফেসবুকের একটি গ্রুপে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ হয় আলমগীর হোসেন নামে একজনের সঙ্গে। তিনি জানান, ১১ হাজার টাকা দিলে করোনার ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট পাওয়া যাবে। এর জন্য টিকা দেওয়া তো দূরে থাক, দুদিনও অপেক্ষা করতে হবে না। রাজি থাকলে পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি দিতে বলেন আলমগীর হোসেন।

আলমগীরের প্রস্তাবে ‘রাজি’ হয়ে শনিবার সকালে আবারও যোগাযোগ করা হয়। একটি নম্বর দিয়ে (০১৬৪৫-৪৪৪***) সেখানে হোয়াটসঅ্যাপে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি পাঠাতে বলেন আলমগীর হোসেন। অ্যাডভান্স হিসেবে কিছু টাকা পাঠাতে একটি মোবাইল ফাইন্যান্সিং নম্বরও (০১৬৪৫-৪৪৪***) দেন। তার কথামতো প্রতিবেদকের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি দেওয়া হয়। পরে অগ্রিম বাবদ এক হাজার টাকা পাঠানো হয় আলমগীরের দেওয়া একটি এজেন্ট নম্বরে (০১৭২৩-২০০***)।

আলমগীর হোসেনকে টাকা পাঠানোর স্ক্রিনশট

টাকা পাঠানোর পর আরেকজনের ফোনকল (০১৮১৩-৩১৯***) আসে প্রতিবেদকের নম্বরে। হোয়াটসঅ্যাপে তার প্রোফাইলে নাম দেখা যায় মাসুদ রানা। তবে আরেকটি সূত্রে জানা গেছে, তার নাম হোসেন আহমদ। এ প্রতিবেদকের কাছে নাম ও জন্মতারিখ যাচাই করে নেন তিনি। কিছু সময় পর পাঠালেন মিরপুরের ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল কেন্দ্রের নিবন্ধন করা একটি টিকা কার্ড। জানতে চাইলেন, কত তারিখের ফ্লাইট? সে হিসেবে ব্যাকডেটে টিকার সার্টিফিকেট করা হবে। আশ্বাস দিলেন, রাতের মধ্যেই মিলবে টিকার সনদ।

শনিবার বিকালের মধ্যেই ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট রেডি হওয়ার তথ্য জানালেন হোসেন আহমদ ওরফে মাসুদ রানা। একইসঙ্গে আলমগীর হোসেনও ফোন করে বাকি টাকা পরিশোধ করতে বললেন। তার কথামতো দুই ধাপে দুটি নম্বরে বাকি ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে প্রথম দফায় আলমগীরের নম্বরে (০১৬৪৫-৪৪৪***) পাঁচ হাজার ও দ্বিতীয় দফায় ০১৭৭১৭৬২*** নম্বরে ৫০০০ টাকা (এ নম্বরটি হাসান আহমদ নামে নিবন্ধিত) দেওয়া হয়।

সব টাকা পরিশোধ করতেই মূল সনদের পিডিএফ কপি পাঠিয়ে দিলেন আলমগীর হোসেন ও হোসেন আহমদ ওরফে মাসুদ রানা। তাতে দেখা গেলো টিকা কেন্দ্র মিরপুরের ঢাকা ডেন্টাল কলেজ। প্রথম ডোজের তারিখ দেওয়া ২০ জুলাই ২০২১ ও দ্বিতীয় ডোজের তারিখ ২৪ আগস্ট ২০২১। ভ্যাকসিনের নামের জায়গায় আছে মডার্না।

হোসেন আহমেদ ওরফে মাসুদ রানার কাছে বিকাশে টাকা পাঠানোর স্ক্রিনশট

কিউআর কোড স্ক্যান করে দেখা গেলো, সুরক্ষা ওয়েবসাইটে এটি ভ্যালিড (আসল) সার্টিফিকেট। অনলাইনে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দিয়ে যাচাই করেও সনদটির বৈধতা পাওয়া যায়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চক্রটি শুধু ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট নয়, টাকার বিনিময়ে ভ্যাকসিন দেওয়ার তারিখও বদলে দিতে পারে। সশরীরে কারও সঙ্গে দেখা করে না তারা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা থাকলেও তারা আদৌ কোনও পদে আছেন কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বিশ্বের অনেক দেশেই করোনার ভ্যাকসিন না নিলে প্রবেশের সুযোগ নেই। এ কারণে প্রবাসীদের ছুটতে হচ্ছে টিকার পেছনে। অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় পাসপোর্ট দিয়ে দুই ধাপে নিবন্ধন করতে হচ্ছে। এতে জটিলতা যেমন আছে তেমনি সময়ও নষ্ট হচ্ছে। টিকা নেওয়ার তারিখের মেসেজের জন্য বসে থাকতে হয় তীর্থের কাকের মতো। মাস যায়, তবু মেসেজ আসে না। এ সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে জালিয়াত চক্র।

এর আগে জেকেজির চেয়ারম্যান সাবরিনা আরিফ এবং রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. শাহেদ গ্রেফতার হয়েছিল পরীক্ষা নিয়ে জালিয়াতির কারণে। এখন সক্রিয় ভ্যাকসিন সনদ বাণিজ্যের চক্র। ট্রাভেল এজেন্সির অফিস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবাসীদের বিভিন্ন গ্রুপে প্রচারণা চালাচ্ছে তারা। ফেক আইডি ব্যবহার করে এ সংক্রান্ত পোস্ট দিচ্ছে অহরহ। ‘প্রবাসীদের ভ্যাকসিন দিতে সহায়তা করা হবে’ এমনটা বলে প্রচার চালায়। কেউ যোগাযোগ করলে তখন টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এসব আলাপ সরাসরি ফোনে না করে হোয়াটসঅ্যাপসহ অন্যান্য অ্যাপসের মাধ্যমে করছে তারা।

জানা গেছে, টিকা কার্যক্রম পরিচালনায় ‘সুরক্ষা’ সফটওয়্যারটি তৈরি করেছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদফতর। সংস্থাটির প্রোগ্রামারদের একটি দল এটি তৈরি করেছে। সফটওয়্যারের কারিগরি দিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদফতরের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও তথ্য ইনপুট দেওয়া হচ্ছে অধিদফতর থেকেই।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদফতরের সিস্টেমস ম্যানেজার মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সুরক্ষা’ তৈরি ও কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদফতরের মাধ্যমে হচ্ছে। তবে টিকা দেওয়া, টিকার সার্টিফিকেট সংক্রান্ত তথ্যের ইনপুটসহ যাবতীয় কাজ অধিদফতরের লোকজন করে।

টিকার সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘সফটওয়্যার তো আর চোখে দেখে না কে টিকা নিলো কে নিলো না। টিকা কার্ড স্ক্যান করে কিংবা ম্যানুয়ালি টিকা দেওয়ার তথ্য সিস্টেমে দেওয়া হয়। দু’দফায় তথ্য ইনপুট সিস্টেমে দিলে সার্টিফিকেট জেনারেট হয়। সেখানে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অনুমোদিত জনবল ইনপুট দিতে পারেন। এর বাইরে কারও পক্ষে সুরক্ষায় ইনপুট দেওয়া সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার ফোন করেও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

ফোনে যোগাযোগ করা হলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক ও ভ্যাকসিন ডেপ্লয়মেন্ট কমিটির সদস্য সচিব ডা. মো. শামসুল হক কথা বলতে রাজি হননি।

 

‘সুরক্ষা’য় লগইন করতে পারেন কারা?

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদফতরের প্রোগ্রামারদের একটি দল নিজস্ব উদ্যোগে ‘সুরক্ষা’ তৈরি করেছে। আর স্বাস্থ্য অধিদফতর সফটওয়্যারটি টিকা দেওয়াসহ সংশ্লিষ্ট কাজে ব্যবহার করছে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদফতরের সিস্টেমস ম্যানেজার মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, টিকা দেওয়া, টিকার সার্টিফিকেট সংক্রান্ত তথ্যের ইনপুটসহ যাবতীয় কাজ স্বাস্থ্য অধিদফতরের লোকজন করেন। টিকা কার্ড স্ক্যান করে কিংবা ম্যানুয়ালি টিকা দেওয়ার তথ্য সিস্টেমে দেওয়া হয়। দুই দফায় তথ্য ইনপুট সিস্টেমে দিলে সার্টিফিকেট জেনারেট হয়। সেখানে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অনুমোদিত জনবল ইনপুট দিতে পারেন। এর বাইরে কারও পক্ষে সুরক্ষায় ইনপুট দেওয়া সম্ভব নয়।

/ইউআই/এফএ/এমওএফ/
সর্বশেষ খবর
সড়কে লাশ হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী
সড়কে লাশ হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত থেকে আহত অবস্থায় এক যুবককে উদ্ধার
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত থেকে আহত অবস্থায় এক যুবককে উদ্ধার
রংপুরে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশের মঞ্চ ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ
রংপুরে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশের মঞ্চ ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ
নিজের বিয়েতে নাচতে হবে কিয়ারাকে, এটাই রীতি!
নিজের বিয়েতে নাচতে হবে কিয়ারাকে, এটাই রীতি!
সর্বাধিক পঠিত
যা থাকছে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে
যা থাকছে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে
‘বারবার বলেছি আর মারিস না’
‘বারবার বলেছি আর মারিস না’
যুক্তরাষ্ট্রে উড়ছে চীনের গোয়েন্দা বেলুন, প্রস্তুত এফ-২২ যুদ্ধবিমান
যুক্তরাষ্ট্রে উড়ছে চীনের গোয়েন্দা বেলুন, প্রস্তুত এফ-২২ যুদ্ধবিমান
৫০০ ছাত্রীর মধ্যে নিজেকে একা দেখে জ্ঞান হারালো ছাত্র
৫০০ ছাত্রীর মধ্যে নিজেকে একা দেখে জ্ঞান হারালো ছাত্র
৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি, ৮ ঘণ্টা পর মিললো লাশ
৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি, ৮ ঘণ্টা পর মিললো লাশ