X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

সুন্দরবনে দস্যু হওয়ার নেপথ্য কারণ ‘ভিলেজ পলিটিক্স’

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২১, ০১:১০

সুন্দরবনের বিশাল এলাকা জুড়ে যেসব দস্যু বাহিনী গড়ে উঠেছিল সেগুলোর বেশিরভাগ সদস্যই ‘ভিলেজ পলিটিক্সে’র শিকার হয়ে এই পথে নাম লিখিয়েছিলেন। সুন্দরবন সংলগ্ন দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের কারও বিরুদ্ধে মামলা হলেই তারা নিরাপদ আত্মগোপনের জন্য চলে যেতেন বনে। এরপর দস্যু বাহিনীতে যোগ দিয়ে আর্থিক সুবিধা নিয়ে ও আধিপত্য বিস্তার করে চলতেন। এভাবে একটি মামলা থেকে বাঁচতে গিয়ে একাধিক মামলায় জড়িয়ে যায় তাদের নাম। ফলে আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা হতো না। শতাধিক মামলা কাঁধে নিয়ে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) কাছে আত্মসমর্পণ করা একাধিক দস্যুর মুখে এসব ঘটনা জানা গেছে।

স্বাভাবিক জীবনে ফেরা ব্যক্তিরা বলছেন, মামলাই দস্যু জীবনের অন্ধকার পথে নিয়ে গিয়েছিল তাদের। আত্মসমর্পণ করার পরও মামলাগুলোর কারণেই তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তারা দ্রুত মামলাগুলো নিষ্পত্তির তাগিদ দিয়েছেন।

অবশ্য র‌্যাবের কর্মকর্তাদের দাবি, দস্যু বাহিনী থেকে আত্মসমর্পণ করা ব্যক্তিদের মামলাগুলো নিয়ে কাজ করছেন তারা। মামলাগুলোর কোনও কোনোটা ইতোমধ্যে নিষ্পত্তিও হয়ে গেছে। খুন-ধর্ষণ ছাড়া বাকি কার বিরুদ্ধে কত মামলা আছে তা যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করে নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলছে।

সাতক্ষীরা কালিগঞ্জের বাসিন্দা সাবেক জলদস্যু ইউনুস আলী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ২০০৫-২০০৬ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তার চাচা আকবর আলী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। নির্বাচনের দিন একটি মারামারির মামলায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। পুলিশের হাতে ধরা খেয়ে জেল খাটতে হয়েছে তাকে। জামিনে বেরিয়ে আসতে বিক্রি করতে হয় সহায়-সম্পত্তির সবটুকুই। এরপর ভিলেজ পলিটিক্সের কারণে একটি খুনের মামলায় জড়িয়ে ফেরারী জীবন শুরু হয় তার। এরপরই তিনি পা বাড়ান সুন্দরবনের দস্যু বাহিনীর অন্ধকার জীবনে।

ইউনুস আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এলাকার মামলা থেকে বাঁচতির জন্যই দস্যু বাহিনীতে যোগ দিছিলাম। একদিন বাকি (নোয়া মিয়া) ফোন করি কইলো, আমাগো সঙ্গে আয়া পরো। পরে তার সঙ্গে যোগ দিলাম। কুনোদিন ভাবি নাই যে, আবার এলাকায় ফিরা যাইতে পারবো। এলাকায় ফিরছি, তবে মামলাগুলা নিষ্পত্তি হয়্যা গেলে একটু গুছাইয়া-গাছাইয়া থাকতে পারি।’

সুন্দরবনের ভয়ঙ্কর দস্যু বাহিনীদের মধ্যে অন্যতম ছিল জাহাঙ্গীর বাহিনী। দলটির প্রধান বাগেরহাটের রামপালের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর শিকারী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ২০০১ সাল থেকে তিনি রাজনীতি করতেন। এলাকায় রাজনীতি করতে গিয়ে ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত একাধিক মামলার আসামি হয়েছেন লোকটি। সেই মামলায় ফেরারী জীবন পার করতে করতেই সুন্দরবনের ভেতরে চলে যান তিনি। একপর্যায়ে নিজেই গড়ে তোলেন একটি বাহিনী। নিজের নামে তার সেই বাহিনীর নাম ছিল জাহাঙ্গীর বাহিনী।

২০১৬ সালে আত্মসমর্পণ করা জাহাঙ্গীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মামলায় ফেরারী হওয়ার কারণে জঙ্গলে ঢুকি পড়ছিলাম। তারপর আর বাড়াইতি পারি নাই। অস্ত্র নিয়ে নিয়মিত ডাকাতি করতাম। টাকা-পয়সা অনেক কামাইছি, কিন্তু জীবনটা তো জীবন ছিল না। বউ-বাচ্চাদের দেখতে পারি না। এলাকায় আসলেই ধরা পড়ার ভয় ছিল। এখন ঢাকায় অটোরিকশা চালাইয়া বউ-বাচ্চা নিয়া একসঙ্গে থাকি।’

সুন্দরবনের দস্যুদের নিয়ে একদশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করে আসা সাংবাদিক মোহসীন-উল হাকিমের বিশ্লেষণে, ‘দস্যুদের বেশিরভাগই কোনও না কোনও মামলায় ফেরারী হয়ে জঙ্গলে ঢুকেছিল। কেউ হয়তো সামান্য তাস খেলতে গিয়েও মামলার শিকার হয়েছে। এরপর কারাগারে যাওয়ার ভয়ে জঙ্গলে চলে গেছে। সেখানে দস্যুদের দলে যোগ দিয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে পুরোদস্তুর দস্যু হয়ে গেছে।’

মোহসীন-উল হাকিম যোগ করেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় মাছের ঘের দখল, স্থানীয় রাজনীতি বা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে কোন্দল বা সুদের বিপরীতে বন্ধক দেওয়া চেকের মামলা খেয়ে ফেরারী হয়েছেন। যারাই ফেরারী হয়েছেন তারাই দস্যু দলে যোগ দিয়েছেন। কেউ কেউ অবশ্য দস্যুদের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে করতেই একপর্যায়ে দস্যু বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন।’

জাহাঙ্গীর বাহিনী (ছবি: মোহসীন-উল হাকিম)

মাসে কোটি টাকা আয় করলেও এখন তারা নিঃস্ব
সুন্দরবনের প্রায় সব দস্যু দল আগে প্রতি মাসে কমবেশি কোটি টাকা আয় করতো। আত্মসমর্পণ করা ৩২টি বাহিনীর প্রতিটিরই ডাকাতি ও অপহরণ করে মাসে গড়ে কোটি টাকা আয় ছিল। কিন্তু কোনও দল এই অর্থ জমাতে পারেনি। বাহিনীর সদস্যদের থাকা-খাওয়ার অর্থ জোগাতেই বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হতো। বিভিন্ন এলাকা থেকে বাজার মূল্যের চেয়ে চড়া দামে তাদের কিনতে হতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যদ্রব্য। একইসঙ্গে সেগুলো নানান কৌশলে নিজেদের ডেরায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হতো। এসব করতে গিয়ে খরচ হয়ে যেত আয়ের একটি অংশ। আর ডাকাতি করা অর্থের বড় একটি অংশের ভাগ নিতো স্থানীয় রাজনীতিবিদ বা প্রভাবশালী ব্যক্তি ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আত্মসমর্পণ করা সাবেক এক দস্যুনেতার কথায়, ‘এমন কেউ নাই যে আমাগো টাকা নেয় নাই। থানা পুলিশ থিকা শুরু কইরা স্থানীয় নেতারা সবাইরে টাকা দিতে হইতো। টাকা না দিলি পরে বাড়ির লোকজনরে ডিস্টার্ব করতো। টাকা-পয়সা দিয়া এগুলো ক্লিয়ার রাখতি হতো।’

র‌্যাবের একজন কর্মকর্তার ভাষ্য, এটা সত্যি– দস্যু বাহিনীদেরও বিভিন্ন ঘাটে টাকা-পয়সা দিতে হতো। যে ৩২৮ জন আত্মসমর্পণ করেছে তাদের বেশিরভাগই খুবই দরিদ্র। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হচ্ছে। আত্মসমর্পণের সময় একলাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। দস্যুমুক্ত সুন্দরবনের তৃতীয় বর্ষ উপলক্ষেও তাদের কাউকে কাউকে মুদি দোকান, ঘর, নৌকা এবং জাল দেওয়া হয়েছে। এই পুনর্বাসন কর্মসূচি চলমান থাকবে।’

র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করা সুন্দরবনের দস্যুরা

মামলা নিষ্পত্তিই এখন প্রধান চাওয়া
দস্যু বাহিনী থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিরা বলছেন, তারা অন্ধকার পথ ছেড়ে দিলেও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। কারণ মামলার হাজিরা দিতে দিতেই তাদের আয়ের বড় একটি অংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। তাদের দাবি, আত্মসমর্পণের পর তিন বছর অতিক্রান্ত হলেও একটি মামলাও নিষ্পত্তি করা হয়নি। বরং অনেকেই নতুন করে হয়রানির শিকার হচ্ছেন

জাহাঙ্গীর বাহিনীর প্রধান জাহাঙ্গীর জানান, তার বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা রয়েছে। সম্প্রতি তার বাসায় পাঁচবার পুলিশ গিয়েছিল। এ কারণে হয়রানির শিকার হচ্ছেন তিনি।

ইউনুস আলী নামে আরেক সাবেক দস্যু জানিয়েছেন, তাকে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ থানার একজন এসআই অকারণে ধরে নিয়ে মামলা দিয়েছে। তিনি বিষয়টি নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক বরাবর অভিযোগ দিয়েছেন। এছাড়া সম্প্রতি সবুজ নামে একজন সাবেক দস্যুর বিরুদ্ধে বনবিভাগ একটি মামলা করেছে।

দস্যুমুক্ত সুন্দরবনের তৃতীয় বর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল এবং র‌্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন অবশ্য উল্লেখ করেছেন, মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। খুন-ধর্ষণের মামলা ছাড়া বাকি মামলাগুলো পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করা হবে।

তবে যাদের মাধ্যমে দস্যু বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে সেই র‌্যাব সদর দফতরে আত্মসমর্পণ করা দস্যুদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই।

র‌্যাবের একজন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, র‌্যাবের পরিচালককে (তদন্ত) এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

সুন্দরবন থেকে ঢাকায় ফিরে যোগাযোগ করা হলে র‌্যাবের পরিচালক (তদন্ত) অতিরিক্ত ডিআইজি সৈয়দ মো. রেজাউল হায়দার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আত্মসমপর্ণ করা জলদস্যুদের মামলাগুলো নিয়ে কাজ চলছে।’

সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করার নেপথ্য কারিগর সাংবাদিক মোহসীন-উল হাকিমের পরামর্শ, ‘আত্মসমর্পণ করা ব্যক্তিদের পুনর্বাসনে সব ধরনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করে পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে সহায়তা করা প্রয়োজন। তা না হলে পুরো প্রক্রিয়া ভেস্তে যেতে পারে।’

/জেএইচ/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
থানা হাজতে নারীকে ধর্ষণ, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক কারাগারে
থানা হাজতে নারীকে ধর্ষণ, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক কারাগারে
মাদকবিরোধী অভিযানের খবর শুনে পালাতে গিয়ে সাবেক চেয়ারম্যানের মৃত্যু
মাদকবিরোধী অভিযানের খবর শুনে পালাতে গিয়ে সাবেক চেয়ারম্যানের মৃত্যু
ভাড়া নিয়ে বিতর্কে রিকশাচালকের আঘাতে পুলিশসহ আহত ৪
ভাড়া নিয়ে বিতর্কে রিকশাচালকের আঘাতে পুলিশসহ আহত ৪
১০ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন ৫৫ শতাংশ, স্বাস্থ্য সেবায় বাস্তবায়ন ৩৯ শতাংশ
১০ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন ৫৫ শতাংশ, স্বাস্থ্য সেবায় বাস্তবায়ন ৩৯ শতাংশ
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত