একসময় তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর পুলিশ কর্মকর্তাদের একজন। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ পদে থেকে পরিচালনা করেছেন পুলিশ, র্যাব ও ঢাকা মহানগর পুলিশ। সরকারের নিরাপত্তা নীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে ছিল তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা। সেই বেনজীর আহমেদই এখন দুর্নীতি, অর্থপাচার, অবৈধ সম্পদ অর্জন, জমি দখল এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক মামলার আসামি।
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার বিপুল সম্পদ, প্রভাব খাটিয়ে জমি দখল এবং পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ প্রকাশিত হচ্ছিল। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা অবস্থায় এসব অভিযোগ কখনও আনুষ্ঠানিক তদন্তের মুখ দেখেনি।
পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ২০২৪ সালের ১৮ এপ্রিল। সেদিন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বেনজীর আহমেদের সম্পদ অনুসন্ধানে একটি বিশেষ অনুসন্ধান দল গঠন করে। এরপর মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই তিনি দেশ ছাড়েন।
যেভাবে দেশ ছাড়েন
দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পর ২০২৪ সালের ৪ মে রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দুবাইয়ের উদ্দেশে দেশ ত্যাগ করেন বেনজীর আহমেদ।
বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সহযোগিতায় তিনি দ্রুত ও নির্বিঘ্নে ইমিগ্রেশনসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। রাত ১১টা ৪০ মিনিটে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তিনি ঢাকা ছাড়েন। এরপর প্রায় দুই বছর তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করেন।
দুবাইয়ে গ্রেফতার
দুদকের মামলায় আদালতের নির্দেশে ইন্টারপোলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি প্রক্রিয়া শুরু হয়। চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আদালত বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন।
অবশেষে গত ১২ জুন দুবাইয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। রবিবার (১৪ জুন) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জাতীয় সংসদে বেনজীর আহমেদের গ্রেফতারের বিষয়টি অবহিত করেন। বাংলাদেশ পুলিশের একাধিক সূত্র এবং দুদক কর্মকর্তারাও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তবে গ্রেফতার মানেই দ্রুত দেশে প্রত্যাবর্তন নয়। এখন শুরু হবে প্রত্যর্পণ, আইনি যাচাই এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার জটিল অধ্যায়।
কত সম্পদের অভিযোগ
দুদকের মামলার নথি অনুযায়ী বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মোট প্রায় ৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদ ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেন।
তার স্ত্রী জীশান মীর্জা ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ১৬ কোটি ১ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন।
বড় মেয়ে ফারিহা রিশতা বিনতে বেনজীর ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ছোট মেয়ে তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীর ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন দুদকের মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
দুদকের অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, গুলশানে ৪টি ফ্ল্যাট, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব, ১৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার, ৩টি বিও হিসাব এবং ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র রয়েছে বেনজীর আহমেদের নামে। দুদকের আবেদনের পর আদালতের নির্দেশে এসব সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।
দুদকের তদন্তে আরও উঠে আসে, বেনজীর আহমেদ প্রায় ১১ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিলেও সেই অর্থ কোথায় বিনিয়োগ হয়েছে তার কোনো গ্রহণযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। দুদক কর্মকর্তাদের ধারণা, সেই অর্থ তিনি দেশের বাইরে পাচার করেছেন।
কত মামলা
বর্তমানে বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে দুদকের অন্তত চারটি বড় মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলায় অবৈধ সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন, অর্থপাচার এবং অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
এছাড়া তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগসহ আরও কয়েকটি গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলায় বেনজীর আহমেদকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—শাপলা চত্বর অভিযান মামলা।
২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনি অভিযুক্ত। ওই সময় তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার ছিলেন।
র্যাবের টিএফআই সেলে গুম ও গোপন আটক সংক্রান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাতেও তাকে আসামি করা হয়েছে। এ মামলায় কয়েকজন সাবেক সেনা কর্মকর্তাও অভিযুক্ত। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।
বিতর্কিত পাসপোর্ট কাণ্ড
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আরেকটি আলোচিত অভিযোগ হলো সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় নিজেকে বেসরকারি চাকরিজীবী হিসেবে দেখিয়ে পাসপোর্ট গ্রহণ। ২০১৬ সালে তিনি র্যাবের মহাপরিচালক থাকা অবস্থায় পাসপোর্ট নবায়নের আবেদন করেন।
পাসপোর্ট অধিদফতর প্রথমে আপত্তি জানায় এবং র্যাব সদর দফতরে ব্যাখ্যা চায়। পরে র্যাব সদর দফতর থেকে বিশেষ অনুরোধ জানানো হলে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তাকে নতুন পাসপোর্ট দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, তার বাসায় গিয়ে ছবি ও আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করা হয়েছিল।
রিসোর্ট, জমি ও সংখ্যালঘুদের অভিযোগ
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ। স্থানীয়দের অভিযোগ, তার প্রভাবের কারণে অনেক ভূমি মালিক, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা জমি বিক্রি করতে বাধ্য হন।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৈরাগীটোল এলাকায় ৬০০ বিঘারও বেশি জমির ওপর গড়ে ওঠে সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক। পরে আদালতের নির্দেশে রিসোর্টসহ বিভিন্ন স্থাপনা জব্দ করা হয় এবং জেলা প্রশাসন এর নিয়ন্ত্রণ নেয়।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জেও তার পরিবারের মালিকানায় থাকা একটি বিলাসবহুল স্থাপনা নিয়ে তদন্ত হয়।
কে এই বেনজীর আহমেদ
১৯৮৮ ব্যাচের বিসিএস (পুলিশ) কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশ পুলিশের সবচেয়ে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের একজন। তিনি ডিএমপি কমিশনার, র্যাব মহাপরিচালক (২০১৫–২০২০) এবং পুলিশ মহাপরিদর্শক বা আইজিপি (২০২০–২০২২) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অবসরের পরও তিনি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সুবিধা ভোগ করেন। তার জন্য গাড়িসহ সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্য, সশস্ত্র দেহরক্ষী এবং বাসভবনে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা
২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ র্যাব এবং এর কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন বেনজীর আহমেদ।
অভিযোগ ছিল, র্যাবের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় বাহিনীটির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
দেশে ফেরানো কি সহজ হবে
অনেকের ধারণা, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি হলেই আসামিকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা যায়। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়।
ইন্টারপোলের নিজস্ব কোনো গ্রেফতারকারী বাহিনী নেই। তারা কেবল সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সতর্ক করে এবং তথ্য আদান-প্রদানে সহায়তা করে।
এরপর সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, আদালতের অনুমোদন, প্রত্যর্পণ চুক্তি এবং কূটনৈতিক আলোচনার ওপর নির্ভর করে আসামিকে দেশে ফেরানো হয়।
বাংলাদেশ অতীতে রাজন হত্যা মামলার আসামি কামরুল ইসলাম, সাত খুন মামলার নুর হোসেন, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামি বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদসহ কয়েকজনকে বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।
আবার পি কে হালদার কিংবা আরাভ খানের মতো আলোচিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ আইনি জটিলতা প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলেছে।
এখন কী হবে
দুবাইয়ে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া নতুন মোড় নিয়েছে। তবে বাংলাদেশের ইতিহাস বলছে, বিদেশে গ্রেফতার হওয়া আর দেশে ফিরিয়ে আনা—দুটি ভিন্ন বিষয়।
তবু একসময় রাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাধর পুলিশ কর্মকর্তাদের একজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থপাচার ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক গ্রেফতার—এ ঘটনা বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।









